২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

এজাহারে-সুরতহালে গরমিল ও লেবু মিয়া দুদু মিয়াদের বিশ্বাসের চিড়

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক

Published : 25 May 2017, 10:45 AM

Updated : 23 Jun 2022, 11:17 PM

মানুষের বিশ্বাসে আঘাত দেয়া নাকি ঠিক না। কিন্তু লেবু মিয়া আর দুদু মিয়াদের বিশ্বাসে আঘাত না দিয়ে থাকতে পারলাম না। গত ২৩ মে, ২০১৭ অতি ভোরে এ দুই ভদ্রলোকের একজন আমার ঢাকার সরকারি বাসায় এসে হাজির। তাদের বিশ্বাস, আমি একটু নজর দিলেই তাদের কাজটা শতভাগ সম্পন্ন হয়। তারা যেমন তাদের মাতৃহত্যার বিচার পায় তেমনি ফিরে পায় তাদের কাছ থেকে জবর দখল করে নেয়া জায়গা-জমিও। কিন্তু এ বিষয়ে আমার যে করার তেমন কিছু নেই সেটা তারা বুঝতে চাইল না।

ঘটনা অতি সাধারণ। ২০১২ সালের মার্চ মাসের পাঁচ তারিখে সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপক্ষ তাদের বাস্তুভিটায় অবৈধ জনতায় দলবদ্ধ হয়ে এসে হামলা চালায়। এতে তার বৃদ্ধ মা মরিয়ম বিবি নিহত হন। তারা নিজেরাও আহত হন। প্রতিপক্ষ তাদের জমিজমা দখল করে নেয়। এ নিয়ে মামলা হয় মিঠাপুকুর থানায়। [ মিঠাপুকুর থানার মামলা নং১৪(৩)/১২)/ রংপুর সেসন্স-৪৯৬/১৩]

মিঠাপুকুর থানার এসআই ফারুকুল এসে তাদের মৃত মায়ের সুরুতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। সুরুতহাল প্রতিবেদনে মামলার বাদী লেবু মিয়াসহ অনেকেই টিপসই দেন, কেউ কেউ দসতখত করেন। সুরুত হাল প্রতিবেদনে বলা হয় মৃতা মরিয়ম বিবির বাম চোখের ভ্রুর উপর কাটা চিহ্ন, চোখের নিচের হাড় ভাঙ্গা, মাথার পিছনে আঘাত। আর ডান দিকের গালে একটি কালসিটে দাগ আছে। ময়না তদন্তের প্রতিবেদনেও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা তাই লিখেন। আর মৃত্যুর কারণ হিসেবে আঘাতের ধাক্কা ও রক্তক্ষরণের (Due to Shock and Hemorrhage) কথাই উল্লেখ করেন। কিন্তু সুরুতহাল প্রতিবেদন তৈরির ঠিক পনের মিনিট পূর্বে অন্যতম ভিকটিম ও বাদী লেবু মিয়া থানায় যে এজাহার দাখিল করেন তাতে বলা হয় যে মৃত ভিকটিমের ডান চোখের উপর কাটার দাগ। আসামীরা ধারাল অস্ত্র (বেকি) ও ছুরি দিয়ে মৃতা মরিয়ম বিবির ডান চোখের উপর, ডান বুকে ও মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করেছে।

এজাহারের গর্ভে বর্ণিত ভিকটিমের শরীরের ক্ষতের স্থান হল ডান চোখের উপর আর প্রকৃত জখম হল বাম চোখের উপর। এই অসঙ্গতি নিয়ে মামলার তদন্ত চলতে থাকে। এসআই ফারুক প্রশিক্ষণে গেলে অন্য একজন এসআই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। দুই মাস পর ফারুক ফিরে এলে তাকেই তদন্তভার পুনরায় অর্পণ করা হয়। তিনি আরো দু এক মাস পরে মামলার অভিযোগপত্র দেন। মামলা চলে যায় বিচারে। বিচারের রায় হয় চলতি বছর, ২০১৭  এর ৭ই মার্চ। রংপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজের এক নম্বর আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে আসামীদের বেকসুর খালাস দেন। কিন্তু কেন?

অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম ও প্রধানতম কারণ ছিল মামলার এজাহারে বর্ণিত ভিকটিমের শরীরের আঘাতের স্থানের সাথে (ডান চোখের উপর) সুরুতহাল ও ময়না তদন্তে বর্ণিত আঘাতের স্থানের (বাম চোখের উপর) গরমিল।

আমি মামলার এজাহারসহ তদন্তকর্মের অনুলিপির সাথে আদালতের রায়ের কপি মিলিয়ে মিলিয়ে পড়লাম। বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত নিপুনভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ ও উপস্থাপিত আলামত বিশ্লেষণ করে তার সিদ্ধান্ত টেনেছেন। কিন্তু আশ্চর্যান্বিত হলাম এই ভেবে যে, যে পুলিশ কর্মকর্তা বাদীকে এজাহার লিখতে সহায়তা করেছেন, সেই কর্মকর্তাই সুরুতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। আরো বিস্ময়কর হল সেই পুলিশ অফিসারই পুরো মামলাটি তদন্ত করেছেন। কিন্তু এজাহার গ্রহণ থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত কোন পর্যায়েই ভিকটিমের শরীরের আঘাতের স্থান সংক্রান্ত গরমিলের সুরাহা করেননি। তার নিজের তৈরি সুরুৎহাল যেখানে বলছে মৃতার বাম চোখের উপর আঘাত তখনও তিনি এজাহারে বর্ণিত ডান চোখের উপরই ভর করে আছেন এবং অভিযোগ পত্রেও ডান চোখের উপর আঘাতের কথাই লিখে গেছেন। তার অভিযোগপত্রের স্বপক্ষে সাক্ষীদের জবানবন্দীতেও (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা) একই ভাষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। মামলার তদন্ত ও বিচারিক পর্যায়ে সাক্ষীদের জবানবন্দীর নানা অসঙ্গতির মধ্যে প্রধানতম অসঙ্গতি ভিকটিমের চোখের আঘাতের ডান-বামের পাল্লায় পড়েই 'ডাউট অব বেনিফিটের' পুরো অংশই চলে গেছে আসামীদের পক্ষে। তাই তারা বেকসুর খালাস।

আমি প্রায় দেড় বছর দেশের বাইরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত থেকে দেশে ফিরতেই বাদীপক্ষের বিশ্বাসে আঘাত দেয়ার কারণ হয়ে পড়লাম। বাদী পক্ষ বিশ্বাস করত, আমি এ মামলায় হস্তক্ষেপ করলে আসামীরা অন্তত আপীলে সাজা পাবে। কিন্তু মামলার প্রাপ্ত রেকর্ড পত্রের সাথে রায়ের কপি পাঠ করে আসামীদের শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাসের পরিবর্তে বাদীকে আপীলে না যাবারই পরামর্শ দিলাম।

লেবু মিয়া-দুদু মিয়ার মামলাটি রুজু, সুরুতহাল তৈরি, তদন্ত ইত্যাদি নিয়ে কতটুকু অদক্ষতা প্রদর্শিত হয়েছে তা বলা মুসকিল। কারণ আমার দৃষ্টিতে যেটাকে আমি অদক্ষতা বলছি আদালতের দৃষ্টিতে তাকে অদক্ষতা বলা হয়নি। মামলার তদন্ত, আলাতম সংগ্রহ ও সাক্ষীদের উপস্থাপনসহ অন্যান্য কোন ক্ষেত্রেই পুলিশের কোন গাফিলতি সম্পর্কি কোন মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ মামলার রায়ে নেই।

তবে তদন্ত কর্মকর্তার বাইরেও থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত, থানার অফিসার-ইন-চার্জ, সার্কেল এএসপি, অতিরিক্ত এসপি বা এসপি, কোর্ট ইন্সপেক্টর সর্বোপরি সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত বিজ্ঞ পিপি/এপিপিদের ভূমিকাও যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণে সহায়ক ছিল না, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। বাদী আপীল করতে চাইলে বিজ্ঞ পিপি তাতে সাড়া দেননি। তাই বাদী নিজ খরচে আপীল করার চেষ্টা করে। হাই কোর্টের একজন এ্যাভভোকেট মামলার নথিপত্র নিয়ে এক সপ্তাহ পরে তা বাদীকে ফেরত দিয়ে আপীল মুভ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

বিচারে কাঙ্খিত ফলাফল না পাওয়ার বেদনায় মর্মাহত লেবু মিয়া-দুদু মিয়ার বিশ্বাস, জগতের সবাই তাদের প্রতারণা করেছে। তাদের মৃতা মা মরিয়ম বিবির আঘাত অবশ্যই ডান চোখের উপর। এজাহারে তারা ঠিকই লিখেছিলেন। সাক্ষেও তারা একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু পুলিশ ও ডাক্তার ম্যানেজড হয়ে ওটা ডানের পরিবর্তে বাম দিকে লিখে দিয়েছে। তার দাবী টাকার জোরে সব হয়। তারা গরীব বলেই ন্যায় বিচার পেলেন না। আর আসামীরা এতটাই প্রভাবশালী বা অর্থশালী যে তাদের ভয়ে কোন উকিল মামলাটি আপিলের জন্যও গ্রহণ করছেন না।

আমি ইতোমধ্যেই আমার পেশাগত, আইনগত ও বুদ্ধিগত সীমাবদ্ধতার খবর জানিয়ে  তাদের বিশ্বাস ভঙ্গের কারণ হয়েছি। এখন কি কারণে তারা ন্যায় বিচার পাচ্ছেন না সেটা ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার উপর তাদের বিশ্বাসকে আরো এক ডিগ্রি নিচে নামাতে চাইলাম না। সকালে নাস্তা খাইয়ে তাদের বিদায় করলাম। (২৪ মে, ২০১৭; ঢাকা)।