মন্ত্রী-এমপি ও চামচাদের কারণে হাজার কোটি টাকা বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ কৃষক
আত্মসাৎ, অবৈধ ইনকাম শব্দগুলোর ইদানিং অনেক বেশি বদনাম হয়ে গেছে। তাই, প্রকাশ্যে সবাই মিলেমিশে সহজভাবে উপার্জনকে আয় বলাই বাঞ্চনীয়।
অন্যান্য বছরের মত এবারও মধ্য মার্চ থেকে কৃষক গম মাড়াই শুরু করেছে। সার, ডিজেল সহ অন্যান্য ধারদেনা পরিশোধের জন্য কৃষকরা গম কাটতে না কাটতেই বিক্রিও শুরু করেছে। অবশ্য প্রতিবছরই সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছে গম ক্রয়ের ঘোষণা। কোন কোন বছর খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে এপ্রিল আবার কোন কোন বছর মে মাসে সরকারিভাবে গম ক্রয়ের প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়। চলতি বছর এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে গম সংগ্রহের প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়নি।
অবশ্য খুব শীঘ্রই অর্থাৎ যখন কৃষকের বাড়িতে কোন গম থাকবেনা তখন সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে গম কেনা হবে বলে প্রজ্ঞাপন জারি হবে। অবশ্য এ প্রক্রিয়াটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের একটা ঐতিহ্য।
গত বছরের হিসাব অনুযায়ী সরকার বরিশাল, চট্রগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগ থেকে যথাক্রমে ২৭০৯ মে. টন, ১১৩৯ মে. টন, ২৫৬৭৫ মে. টন, ২২০১৩ মে. টন, ৫২৯৫৬ মে. টন, ৪৫১৭৪ মে. টন এবং ৩৩৪ মে. টন অর্থাৎ মোট ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ি, প্রতি কেজি গমের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৮ টাকা। সরকারিভাবে ক্রয়কৃত এই গমের মূল্য কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে জমা হয়। সরকারের কাছে গম বিক্রি করতে হলে কৃষি বিভাগ থেকে কৃষক পরিচয় পত্র ও অনুমোদিত কৃষক হতে হয়।
মার্চ মাস থেকেই সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে গম না কিনলেও অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলো ভালো। তবে, এখানেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। বিষয়টি মোটেই গোপন নয়। কারণ, কোন কৃষকের কাছ থেকে সরকার গম কিনবেন, তা নির্ধারন করে দেবার কাজটি করেন কৃষি বিভাগ, মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেয়র, রাজনৈতিক নেতা, চামচা সহ প্রায় সকল দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। আর এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ যাননা সাংবাদিকদের সংগঠন প্রেস ক্লাবও।
বিষয়টি মনে হয় একটু খোলাসা করা দরকার। ২০১৬ এর আগে সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গম কিনছে বলে দাবি করে, খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ রাম, সাম, যদু, মধু ইত্যাদি হাজার হাজার নামের তালিকা প্রস্তুত করে সরবরাহকৃত গমের পরিমাণ ও সরকারি ধার্য্যকৃত মূল্য লিখে তা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হতো। কিছু কিছু পাবলিক, কিছু সাংবাদিক সরেজমিন প্রতিবেদন করে দেশবাসীকে জানান যে, যাদের নামের তালিকা করা হয়েছে, আসলে ওই নামের কেউ খাদ্যগুদামে গম সরবরাহ করছে না। যারা সরবরাহ করছে, তারা অধিকাংশই ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা, চামচা সহ অন্যান্যরা।
কেন এরা গম সরবরাহ করছে, বিষয়টি একটু পরেই আসছি। তার আগে কিছু তথ্য জানা দরকার।
এভাবে গম সংগ্রহের বিষয়টিতে সরকারের মনে হয়েছে যে, এ প্রক্রিয়াতে বদনাম হচ্ছে। তাই ২০১৬ সাল থেকে প্রকৃত কৃষকের নাম, পরিচয়পত্র জমা নিয়ে গম কিনে টাকা কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে জমা করা হয়। এই প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতার সবটাই নিহিত থাকলেও ঘটনা অন্য জায়গায়।
২০১৬ সালে যা হয়েছে : যথারীতি এপ্রিল মাস থেকে খাদ্য গুদামগুলোতে সরাসরি প্রকৃত কৃষকের নাম ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে গম কেনা শুরু হলো। চললো পুরো মে মাস জুড়ে। গম কাটার পরপরই ধার দেনা শোধ এবং প্রয়োজনের কারণে কৃষক গম বাজারে বিক্রি করে দেয়। এপ্রিল বা মে মাসে কৃষকের ঘরে কোন গম মজুদ থাকেনা। বিষয়টি সবার জানা। মন্ত্রী, এমপি, সহ রাজনৈতিক নেতা, চামচা, বিভিন্ন সংগঠন, প্রেসক্লাব, সরকারি আমলা কে কত টন গম খাদ্যগুদামে সরবরাহ করবে তার তালিকা আগেই হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৬ সালে বাধ সাধলো প্রকৃত কৃষকের নাম, কৃষক কার্ড এবং ব্যাংক একাউন্ট লাগবে। গম ক্রয়ের টাকা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক একাউন্টেই জমা হবে। এই ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছে গিয়ে কাউকে ২শ টাকা থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত দিয়ে, কৃষকের কৃষি কার্ড ও ব্যাংকের চেক সংগ্রহ করা হয়। অবশ্য সংগ্রহের এই কাজটি রাজনৈতিক নেতা, চামচা ও ব্যবসায়িরাই করেন। সরকারের নিয়ম পালনের কারনে সঠিক কৃষকের নাম পরিচয় দিয়েই গম ক্রয় করেন সরকার। যেখানে আইনগতভাবে কোন ফাঁকফোকর নাই।
কেন ফড়িয়ারা এমন কাজ করেন: মার্চ মাসে যখন গম কাটা শুরু হয়, তখন থেকেই ব্যবসায়িরা কৃষকদের কাছ থেকে খোলা বাজারে গম কিনতে শুরু করেন। চলতি বছরে সরকার এখনো গম কেনার প্রজ্ঞাপন জারী করেননি, এমনকি দামও নির্ধারণ করে দেননি। তবে ২০১৬ সালে সরকার প্রতি কেজি গমের দাম ২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মার্চ এবং এপ্রিল মাসে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতিবস্তা (৮০ কেজি) গম এক হাজার একশ ৫০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার দুইশত টাকা পর্যন্ত কিনেন। সে অনুযায়ি প্রতি কেজি গম কৃষকরা ১৪ দশমিক ৩৭ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হন। অর্থাৎ সরকার গম কিনবেন ২৮ টাকা দরে। কিন্তু কৃষকরা গম বিক্রি করছেন ১৪ দশমিক ৩৭ টাকা দরে। এতে করে প্রতি কেজি গমে কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে ১৩ দশমিক ৬৩ টাকা!
কৃষক প্রতি কেজিতে যে টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেই ১৩ দশমিক ৬৩ টাকা কয়েকটি ধাপে অভিনব পদ্ধতিতে আয় করেন, মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, রাজনৈতিক দলের সভাপতি সমপাদক থেকে শুরু করে পাতি নেতা, বিভিন্ন সংগঠন, প্রেসক্লাব, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
আয়ের পদ্ধতি: গুরুত্ব অনুযায়ী নামের বিপরীতে সরবরাহের পরিমাণ ও তালিকা প্রণয়ন করা হয়। সেই পরিমাণ উল্লেখিত তালিকা প্রতি মেট্রিক টন (১০০০ কেজি) সর্বনিম্ন ৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যবসায়িদের কাছে বিক্রি করে দেন। এতে করে কোন চাষাবাদ না করেই বা কোন বিনিয়োগ ছাড়াই তালিকাভুক্তরা প্রতিকেজি গম থেকে ৪ টাকা থেকে ৬ টাকা আয় করেন। যে কৃষকের কাছ থেকে কৃষি কার্ড ও ব্যাংকের চেক নেওয়া হয়, সেই কৃষককে ২শ থেকে ৫শ টাকা দেওয়া হয়। যে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারী কৃষকের নাম, ঠিকানা ও ব্যাংক একাউন্ট অনুমোদন করবেন, তিনি টন প্রতি ৫শ থেকে ১ হাজার নেন। তারপরে ব্যবসায়ী সাহেব যখন খাদ্যগুদামে গম নিয়ে যান, সেখানে খাদ্য কর্মকর্তাকে প্রতি টনে ১ হাজার টাকা নগদ প্রদান করেন। অতঃপর তালিকাভুক্ত কৃষকের নামে বিল তৈরী করে ব্যবসায়ী সাহেব ব্যাংকে বিল জমা দিয়ে টাকা তুলেন। ব্যবসায়ী সাহেব সব খরচ বা অন্যান্যদের আয় করিয়ে দিয়ে নিজে প্রতি কেজি গমে কমপক্ষে ৪ টাকা থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত আয় করেন!
সারা দেশের হিসাব: ২০১৬ সালে সরকার দেশের ৭ টি বিভাগ থেকে মোট এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন গম ক্রয় করেন। সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ওই বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি গম উৎপাদন হয়। অর্থাৎ সারা দেশে ১৫ লাখ মেট্রিকটন গম উৎপাদন হয়।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি কেজি ২৮ টাকা হিসাবে ১৫ লাখ মেট্রিক টন গমের দাম কৃষকরা ৪ হাজার ২শ কোটি টাকা পাবার কথা থাকলেও, কৃষকরা ১৪ দশমিক ৩৭ টাকা হিসেবে ২ হাজার ১শ ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা পাচ্ছেন। অর্থাৎ কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন প্রায় ২ হাজার ৪৫ কোটি টাকা।
মজার বিষয় হলো, একজন কৃষক এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে গম চাষ করতে, বীজ বাবদ ৯শ টাকা, চাষ বাবদ ৭০০ টাকা, সার ও কীটনাশক বাবদ ৩ হাজার টাকা, সেচ বাবদ ৪শ টাকা, পরিবহন বাবদ ৩শ টাকা, গম কাটা ও মাড়াই করা বাবদ ১ হাজার ১শ টাকা খরচ করেন। অর্থাৎ প্রতি বিঘাতে মোট ৬ হাজার ১শ টাকা খরচ করেন। এতে প্রতি বিঘায় সর্বোচ্চ পরিমান গম উৎপাদন হয় ১৪ মন। কৃষক এই ১৪ মনের দাম পান ৮ হাজার ৫০ টাকা থেকে ৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় কৃষকের লাভ হয় সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা। তবে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি বা রোগ বালাই হলে প্রত্যেককেই লোকসান গুনতে হয়।
হিসাবের ক্ষেত্রে মজার ব্যাপার হলো, কৃষকের ভাগ্য ভালো হলে প্রতি কেজিতে কৃষকের লাভ হয় সর্বোচ্চ ৪ টাকা, অন্যদিকে উপর থেকে শুরু করে খাদ্য গুদামের হেলপার পর্যন্ত প্রতি কেজিতে আয় করে ১৩ দশমিক ৬৩ টাকা!
২০১৭ সালের জন্য মজার খবর হলো, ওপর থেকে শুরু করে নীচ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২শ কোটি টাকা আয়ের আশায় ইতোমধ্যে ক্যালকুলেটরের বোতাম চাপাচাপি শুরু হয়ে গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা আগাম নাম ও পরিমাণের তালিকা কিনে ফেলেছেন!
