শীতের কাঁপনে গরম কাপড় কেনার ধুম
পৌষের দ্বিতীয় ভাগে এসে ক্রেতা সমাগম বাড়ায় খুশি শীতের পোশাকের বিক্রেতারা।
রাজধানীর ফুটপাতের দোকানগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের বাজার হিসেবেই পরিচিত। তবে এই শীতে সেখানে মধ্যবিত্তের ভিড় বেড়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই শীত জেঁকে বসায় গরম কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে, আর বিক্রি বাড়ায় খুশি বিক্রেতারা।
বৃহস্পতিবার মিরপুর-২ নম্বর থেকে ১০ নম্বর গোলচক্কর এলাকার ফুটপাতজুড়ে বসা শীতের কাপড়ের দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, সব দোকানের সামনেই ক্রেতার আনাগোনা।
হুডি, এয়ারপ্রুফ ও ডেনিমের জ্যাকেট, কোট, বাচ্চাদের শেরপা, সোয়েটার, হাত মোজা, পা মোজা, কানটুপি, ট্রাউজার, নারীদের কার্ডিগান, লং কোট, উলের চাদরের বাহারি পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা।
তারা জানালেন, কিছু দিন আগেও ব্যবসা জমত সন্ধ্যার পর, এখন শীত বাড়ায় বিকাল থেকেই দোকানে ক্রেতার ভিড় বাড়ছে। দুপুরের পর থেকেই তাই তাদের ব্যস্ত হতে হচ্ছে দোকান সাজাতে।
মিরপুর এলাকার মতোই ফুটপাতে গরম কাপড়ের ব্যবসা জমে উঠেছে রাজধানীর নিউ মার্কেট, খিলক্ষেত, এয়ারপোর্ট, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায়।
প্রবাস ফেরত মো.বজলুর রহমান সপরিবারে এসেছেন মিরপুর-১০ নম্বরে। দুই ছেলের জন্যে জ্যাকেট কিনতে চান। তিন বছরের তাইসিউর রহমান তাসিনের জন্য জ্যাকেট নিলেন ৪০০ টাকায়। বড় ছেলে তামজিদুর রহমানের জন্যেও নিলেন একটা, দাম পড়ল ৬০০ টাকা।
বজলুর বললেন, “হাজার টাকায় দুই ছেলের শীতের পোশাক হয়ে গেল। শো রুমে ঢুকলে তিন-চার হাজার টাকা চলে যেত। কাপড়ের মানে কিন্তু খুব বেশি তফাৎ নেই। মধ্যবিত্তের জন্য ফুটপাতই ভালো।”
‘গার্মেন্টস লট’ আর গুলিস্তান থেকে এসব কাপড় সংগ্রহ করেন বিক্রেতা ফারুক হোসেন। এই সপ্তাহে বিক্রি বেশ ভালো। ফারুকের কাছে প্রশ্ন ছিল মুনাফা নিয়ে। চওড়া হাসি দিয়ে বললেন, “লাভ ছাড়া তো আর ব্যবসা নাই। ১০০-১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৭০০-৮০০ টাকার পোশাক আমার কাছে আছে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত সবাই কিনতে আসে। আমাদের সীমিত লাভ, সেল বেশি ৫০ টাকা লাভ হলেও মাল ছেড়ে দেই।”
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. শাহজাহান পছন্দসই হুডি খুঁজতে খুঁজতে বললেন, “ফুটপাত হোক আর যাই হোক পোশাকটা পছন্দ হচ্ছে কি না, সেটাই বড় কথা। এখানে যদি আমি হাজার টাকার মধ্যে ভালো একটা গরম কাপড় পাই, তাহলে বড় দোকানে গিয়ে দুই-তিন হাজার টাকা কেন খরচ করব।”
শিশুদের শীতের কাপড়ের সেট আর নারীদের নানা বাহারি পোশাক নিয়ে ফুটপাতে দোকান সাজিয়েছেন ফারহানা ইফতি। তার দোকানে শিশুদের পোশাক মিলছে ৫০ থেকে শুরু করে ১২০০ টাকার মধ্যে, আর নারীদের নানা পোশাকের দাম পড়ছে ৪০০ থেকে শুরু করে ১৬০০ টাকায়।
এই নারী বিক্রেতা বলেন, “ঢাকায় এর আগে শীত ঢুকে নাই, এবারের শীতে পোশাকের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফুটপাতে তো আর বাকি চলে না, যা নিচ্ছে নগদ; তাই প্রফিট মার্জিন ভালো থাকছে।”
নারীদের কার্ডিগান, লং সুয়েটার বিক্রেতা সাকিবুল হাসান বাবুও মোটামুটি খুশি। তার দোকানে ৪০০-৬০০ টাকায় মিলছে এসব শীতের পোশাক। মখমলের সোয়েটার খুঁজছিলেন বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে থাকা সোহানা ইসলাম সুমি। তার মতে, শিক্ষার্থীদের জন্য অল্প টাকায় পোশাক কেনার জন্য এসব দোকান বেশ ভালো জায়গা।
চাহিদা বেড়েছে কানটুপি আর মোজারও। মিরপুর-১০ নম্বরের ফুটপাতে মো. রাকিবের দোকানে তাই শুধু এসব পণ্যেরই পসরা। রাকিব বললেন, “শীতে আমার বিক্রি ভালোই বাড়ছে। হাজারে দুইশর মতো লাভ থাকছে। একেকটা টুপি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি করছি, হাত মোজা ৬০-২০০ টাকা আর পায়ের খাটো ও লম্বা মোজা বিক্রি করছি ৩০ টাকা থেকে ৬০ টাকায়।”
তরুণ-তরুণীদের মধ্যে চাহিদা আছে ডেনিমের (জিন্স) জ্যাকেটেরও। বিক্রেতা মনির হোসেনের দোকানে দেখা মিললো এমন দুই তরুণের। মিরপুরের ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী রাজিউল ইসলাম শামীম আর সৈকত বিশ্বাস জানালেন, বিপণী বিতান থেকে সবসময় শিক্ষার্থীদের জন্য পোশাক কেনা কঠিন। চলনসই মানের পোশাক অল্প দামে এসব ফুটপাতের দোকানেও পাওয়া যায়। আজ তারা ফুলহাতা টিশার্ট আর ডেনিমের জ্যাকেট নিয়েছেন। দাম নিয়েও খুশি তারা।
বিক্রেতা মনির হোসেন জানালেন, ৮০০ থেকে ১৪০০ এর মধ্যেই এসব জ্যাকেট পাওয়া যাচ্ছে। মূলত বিভিন্ন গার্মেন্টস থেকে ‘এক্সপোর্ট কোয়ালিটি’র এসব জ্যাকেট সংগ্রহ করেন। বিক্রি বেশি হওয়ায় লাভও হচ্ছে তার।
তবে আশানুরূপ বিক্রি নেই মো. ওয়াদুদের। তার ভাষায়, “এইটা তো লাস্টের শীত। বেশিদিন থাকব না। মানুষ কোনোরকম চিইপ্পা থাইকা সহ্য কইরা নিতেছে, কিনতেছে কম।”
রাজধানীর অন্যতম ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র নিউ মার্কেটেও চলছে কেনাবেচা। সেখানে হাঁক ছেড়ে, সুর তুলে ফুটপাতে শীতের পোশাক বিক্রিতে ব্যস্ত বিক্রেতারা। ক্রেতারা এসে বেছে বেছে নিজের চাহিদামতো পোশাক বের করে গায়ে চাপিয়ে দেখছেন, চলছে দরদাম।
ভ্যান গাড়িতে একদামে হুডি ও সোয়েটার বিক্রি করছেন জুয়েল রানা। তিনি বললেন, “মানুষ মার্কেটে একদামে কিনলেও এখানে দামদর করে। তাই একদম সীমিত লাভ রেখে একটা দাম ঠিক করে একদামে বিক্রি করছি। ক্রেতা ভালই পাচ্ছি। শীত পড়ায় বিক্রি তুলনামূক বেশি, শীতের শুরুতে এত ক্রেতা ছিল না।”
নিউ মার্কেটে ছেলের জন্য হুডি কিনতে আসা গৃহিণী আইরিন সুলতানা বলেন, “মার্কেটের চাইতে এখানেই ভালো। দামে কম পাওয়া যায়। অনেক হিসাব করে চলা লাগে। আয় যেহেতু সীমিত তাই এসব দোকানই ভরসা। ছেলের জন্য কাপড় খুঁজছি, পছন্দ হলে কিনে নেব।”
ছোট ভাইয়ের জন্য গরম কাপড় কিনতে আসা আরেক গৃহিনী জুঁই আক্তার বললেন, “আমরা অনেকেই মনে করি ফুটপাত থেকে কেনা যাবে না। কিন্তু একটু খুঁজে দেখে কিনলে ফুটপাত থেকেই আপনারা খুব ভালো মানের পোশাক রিজনেবল প্রাইসে কিনতে পারবেন।”
