২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবিধানের প্রস্তাবনায় পরিবর্তন এলে ‘গণভোট’, সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকের পর বললেন সালাহউদ্দিন

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেও গণভোটের সুরক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাব বিএনপি দিয়েছিল, বলেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Sep 2026, 10:25 PM

Updated : 27 Sep 2026, 10:25 PM

সংবিধানের প্রস্তাবনায় পরিবর্তন এলে তা নিয়ে ‘গণভোট হতে পারে’ বলেছেন সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।

তার মতে, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ গণভোটের সুরক্ষায় থাকা অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এলে সংসদে সংশোধনী পাসের পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটে যেতে হবে।

রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠকের পর সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন।

সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে যুক্ত করে যতটা সম্ভব ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।

তাদের মতামত শোনার পর সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিরোধী দল এলে তাদের স্বাগত জানানো হবে। কমিটি ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করছে; এর ভিত্তিতে আগামী জানুয়ারিতে সংসদ বিল উত্থাপন করার ব্যাপারে তারা আশাবাদী।

এর আগে কমিটি জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক ও জোটের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রথম বৈঠকে কমিটি তাদের কর্মপরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছে।

বৈঠকের পর কমিটির সভাপতি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সম্পাদকদের অনেকে বিরোধী দলের সদস্যদের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, কমিটির পক্ষ থেকেও সংসদ অধিবেশন চলাকালে বিরোধী দলকে বারবার যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকেও আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল আলোচনায় এলে তাদের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হবে তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, গ্রহণযোগ্য বিষয়গুলো সবার মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে। আলোচনার বাইরে কারো লিখিত প্রস্তাব থাকলে তা কমিটিতে পাঠাতে বলা হয়েছে।

গেল ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও বিশেষ কমিটিতে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো নাম প্রস্তাব করেনি।

সংসদে তারা বলেছেন, কমিটির ধারণাগত ভিত্তিই তারা গ্রহণ করেন না; তাই এতে সদস্য দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না।

প্রস্তাবনায় পরিবর্তন এলে গণভোট

গণভোটের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাধারণভাবে এটি দুই ধরনের হতে পারে। একটি আইনের বিষয়ে, অন্যটি সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে।

তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। আদালতের রায়ের পর সেই বিধান পুনর্বহাল হয়েছে।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ গণভোটের সুরক্ষায় থাকা অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এলে সংসদে সংশোধনী পাসের পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটে যেতে হবে।”

এবার প্রস্তাবনায় পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে, বলেন তিনি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেও গণভোটের সুরক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাব বিএনপি দিয়েছিল বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কোনো সংসদ ওই বিধান পরিবর্তন করতে চাইলে যেন গণভোট বাধ্যতামূলক হয়, সেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

জানুয়ারিতে বিলের আশা

সংবিধান সংশোধনের পরবর্তী ধাপ ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। এর ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিল আসবে।

তার আশা, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনেই বিলটি উত্থাপন করা সম্ভব হবে।

কমিটির সভাপতি বলেন, বিল সংসদে ওঠার পর এর ওপর আলোচনা হবে। সংশোধনী প্রস্তাব থাকলে সেগুলোও আলোচনা ও ভোটের মধ্য দিয়ে যাবে।

সংবিধানের যেসব অংশ পরিবর্তনে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব বিষয়ে সংশোধনী সংসদে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোট হবে, বলেন তিনি।

অগ্রাধিকার জুলাই জাতীয় সনদ

সংবিধান সংশোধনে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার নাকি জুলাই জাতীয় সনদ অগ্রাধিকার পাবে, এমন প্রশ্নে কমিটির সভাপতি বলেন, অগ্রাধিকার থাকবে জুলাই জাতীয় সনদে। তবে নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি ম্যান্ডেট পেয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আসেনি বা শেষ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রয়োজন হলে সেগুলোও সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় আনা হবে।”

তিনি বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের মধ্যে যেগুলো সংবিধানে যুক্ত করা দরকার বলে কমিটি মনে করবে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রস্তাব রেখে গণভোট হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হওয়া গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় আসে।

ক্ষমতার ভারসাম্য, উচ্চকক্ষ

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না রেখে রাষ্ট্রপতি, সংসদ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব দেন কয়েকজন সম্পাদক। প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলের প্রধানের পদ আলাদা করা যায় কি না, সেই বিষয়ও আলোচনায় আসে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও প্রেস কাউন্সিলের নিয়োগ পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষ নিয়েও মত দেন সম্পাদকরা।

কেউ কেউ বলেন, উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব পুরোপুরি নিম্নকক্ষের অনুপাত অনুযায়ী হলে ভিন্ন মতের প্রতিফলনের সুযোগ কমে যাবে। আবার উচ্চকক্ষকে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি আসে।

ন্যায়পাল, সংসদীয় কমিটি ও ৭০ অনুচ্ছেদ

সংবিধানে ন্যায়পালের বিধান থাকলেও তা কার্যকর না হওয়ায় বিষয়টি বৈঠকে ওঠে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাবও দেন সাংবাদিক প্রতিনিধিরা।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধানে যেসব পরিবর্তন দরকার, সেগুলোর সঙ্গে তারা একমত হয়েছেন। সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে আসনের অনুপাতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও বলেন তিনি।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করার বিষয়ও আলোচনায় আসে। কিছু বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হয়।

সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি বলেন, বর্তমান বিধান অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের পদ হারানোর সুযোগ রয়েছে। ‘ফ্রি ভোট’ চালু করতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তন করতে হবে।

শিক্ষা, নারী ও গণমাধ্যম

সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষার বিষয়ে আরও স্পষ্টতা আনার প্রস্তাব দেন বৈঠকে উপস্থিত একজন সম্পাদক।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং রাজনৈতিক দলগুলো থেকে আরও বেশি নারীকে সরাসরি নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাব দেন।

জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরাসরি আসনে নারীদের মনোনয়ন ধাপে ধাপে বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরাসরি আসনে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ও বৈঠকে আসে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ থেকে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিষয় সংবিধানে যুক্ত করার প্রস্তাব তোলা হয়।

কমিটির সভাপতি বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিধান রয়েছে। তবে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোনো প্রস্তাবের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হলে তা লিখিতভাবে কমিটিকে দেওয়া যেতে পারে।

যারা ছিলেন বৈঠকে

বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা ও মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ, তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ও টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক আবদুল হাই সিদ্দিক, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।