২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু, টিকা পাবে ৩৪ লাখ শিশু

এর আগে টিকা দিলেও হামে মৃত্যু থামেনি।

হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু, টিকা পাবে ৩৪ লাখ শিশু

রাজধানীর কড়াইলের টিএনটি খেলার মাঠে দেশব্যাপী হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির সূচনা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Sep 2026, 01:11 PM

Updated : 26 Sep 2026, 02:05 PM

হামের প্রকোপ মোকাবিলায় দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর কড়াইলের টিএনটি খেলার মাঠে টিকাদান কর্মসূচির সূচনা করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এ কর্মসূচির আওতায় বাদ পড়া ২৪ লাখসহ মোট ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

তিনি বলেন, “আমরা নতুনভাবে আজকে ৩৪ লাখ বাচ্চাকে টার্গেট করেছি। এর মধ্যে ১০ লাখ নতুন করে ছয় মাস বয়সে পৌঁছানো শিশু, বাকি ২৪ লাখ আমাদের আগে বাদ পড়া শিশু।

“৩৪ লাখ বাচ্চাকে আমরা এই ক্যাচ-আপ প্রোগ্রামে আওতাভুক্ত করেছি দেশব্যাপী।”

হামে মৃত্যু ঠেকাতে এর আগে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও প্রকোপ কমেনি।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৮৩ জনের। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে ১০১ জনের।

অপরদিকে হাম নিয়ে হাসপাতালে রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ২৪৮ জনে।

এর প্রেক্ষিতে সরকার আবার হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

শনিবার ‘দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬’ উদ্বোধন করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল থেকে তিন ধাপে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি জোরদার করা হয়। এর আওতায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। পরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে একই বয়সসীমায় ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুকে পাওয়া যায়। দুই কর্মসূচির ৪০ লাখের ব্যবধান ঘোচাতে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করতে ‘মপ-আপ’ কর্মসূচি নেওয়া হয়।

“ঈদুল আজহার পরের দিন থেকে আমরা আরও ১৪ লাখ বাচ্চাকে খুঁজে খুঁজে এনে নতুনভাবে টিকাদান করেছি,” বলেন তিনি।

এরপরও হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনতে আবার কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলেছেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন।

ক্যাম্পেইনের জন্য ইউনিসেফের কাছ থেকে ৪০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়া গেছে তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় টিকা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ১০ লাখ টিকা সংরক্ষিত রাখা হবে এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসব টিকা দেওয়া অব্যাহত থাকবে।

কর্মজীবী মায়েদের সুবিধার জন্য ছুটির দিনেও এবং সন্ধ্যার পর টিকাদানের ব্যবস্থা থাকবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আপনারা জনগণকে একটু সচেতন করবেন, যাতে নিকটস্থ ক্যাম্পে গিয়ে টিকাদান কর্মসূচিটা সফল করেন এবং বাচ্চাদেরকে টিকা দেওয়ান।”

ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি গিলিয়ান মেলসপ বলেন, “প্রায় ১ হাজার জীবন হারিয়ে গেছে। প্রতিটি শিশুকে টিকাদানের আওতায় রাখার গুরুত্বের এটি একটি মর্মান্তিক স্মারক।”

হামের টিকাদানের বিশেষ এই কর্মসূচিতে সহায়তা করতে ইউনিসেফের অগ্রিম তহবিলের মাধ্যমে গত ১০ সেপ্টেম্বর ৪৩ লাখ ডোজ হাম-রুবেলা টিকা দেশে এসেছে বলেও জানান সংস্থার প্রতিনিধি মেলসপ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচওর ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নরওয়াল বলেন, বাংলাদেশে হাম-রুবেলার সংক্রমণ এখনও চলছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি এবং টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

‘র‌্যাপিড কনভেনিয়েন্স মনিটরিংয়েও (আরসিএম)’ টিকাদানের ‘কাভারেজে’ অসমতা দেখা গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাদ পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতেই নতুন করে ‘ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ শুরু করা হয়েছে।

টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি রাজেশ।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আ ন ম বজলুর রশিদ দাবি করেন, আগের দুই দফার হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার ১০০ শতাংশের বেশি শিশুর কাছে পৌঁছানো হয়েছে।

তবে টিকা দেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় লাগে তুলে ধরে তিনি বলেন, এ অবস্থায় তৃতীয় পর্যায়ে বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

“আমরা আশা করছি, ৩৪ লাখ শিশুর কাছেই আমরা যাব,” বলেন বজলুর রশিদ।

আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং বাংলাদেশকে হাম ও রুবেলামুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হবে।”

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন-ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রথম ধাপে ডিএনসিসি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়েছে। একটি শিশুও যাতে টিকার বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্যে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপেও এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ‘ইনটেনসিফাইড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ নামের এই বিশেষ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে।

সেদিন সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এপ্রিলে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি (১০৯ দশমিক ৪ শতাংশ) শিশুকে টিকার আওতায় আনা হলেও প্রকোপ কমেনি। কারণ, এখন যারা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই টিকাবিহীন।

এদিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ইপিআই ও প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে যাচ্ছে ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফসহ একাধিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে আগামী ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর মাঠপর্যায়ে এ নজরদারি কার্যক্রম চলবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত দল আটটি বিভাগের নির্বাচিত জেলা, উপজেলা ও টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শন করবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) ফোয়ারা তাসনিম।