০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

পুনর্বাসন ছাড়া মিটফোর্ডে হরিজন পল্লী খালি করা ‘সংবিধান লঙ্ঘন’: ১০৮ নাগরিকের বিবৃতি

“বিকল্প আবাসন ও স্থায়ী পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়াই অমানবিকভাবে প্রান্তিক পরিবারগুলোকে বলপূর্বক গৃহহীন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে,” বলা হয়েছে বিবৃতিতে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Oct 2026, 07:07 PM

Updated : 02 Oct 2026, 07:12 PM

বাসিন্দাদের পুনর্বাসন না করে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবনের কথা বলে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের ভেতরে মিনিয়ালস কোয়ার্টার (সুইপার কলোনি) খালি করার আদেশের প্রতিবাদ ‍জানিয়েছেন শিক্ষক ও অধিকারকর্মীসহ দেশের ১০৮ নাগরিক।

শুক্রবার এক প্রতিবাদলিপিতে তারা বলেছেন, “নোটিসে উচ্ছেদ কারণ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কথা বলা হলেও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেই। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে ৬০টি পরিবার মানবিক সংকটে পড়বে।

“হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের বসবাসের বিষয়টি স্বীকার করে আসায় এ কোয়ার্টারই তাদের একমাত্র স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া তাদের গ্রাম, বিকল্প বাড়ি বা জমি নেই। অথচ তাদের বিকল্প আবাসন ও স্থায়ী পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ছাড়াই অমানবিকভাবে প্রান্তিক পরিবারগুলোকে বলপূর্বক গৃহহীন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”

এই ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশের সংবিধান, সুপ্রিম কোর্টের নজির এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার ‘সম্পূর্ণ পরিপন্থি’, বলা হয়েছে বিবৃতিতে।

গত ৩০ জুলাই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ের এক নোটিসে বলা হয়, “কলোনির ভবনগুলো অপসারণের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ভবন অপসারণের টেন্ডার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে ভবন খালি করার জন্য পত্র জারি করা হয়েছে।

“তার আগে ২১ জুলাই হরিজন সম্প্রদায়ের পুনর্বাসনের আবেদন করে বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ। কিন্তু হাসপাতালে প্রাঙ্গণে পুনর্বাসনের কোনো খালি জায়গা না থাকায় আপাতত পুনর্বাসনের সুযোগ নেই।”

নোটিসে ৩০ আগস্টের মধ্যে কোয়ার্টার খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ সকল মৌলিক ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভবন অপসারণ কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হয়।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নোটিশ পাওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই, আমাদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষ দুর্ব্যবহার করে।

“যারা উচ্ছেদ চালানোর জন্য টেন্ডার নিয়েছিল, তাদের লোকজন প্রতিদিন ওখানে গিয়ে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষে থেকেও সরিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করছেন। ফলে তারা আতঙ্কের মধ্যে দিনযাপন করছে। তাই আমরা প্রতিবাদ জানালাম।”

তিনি বলেন, “প্রায় ৫০টি পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কের মধ্যে আছে। এটা অমানবিক। দ্রুত এই বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”

মিনিয়ালস কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঘর খালি করার জন্য যারা টেন্ডার পেয়েছে, তাদের লোকজন প্রতিদিন এসে দমক দিয়ে বলেন, আপনার এখনো ঘর কেন খালি করেন নাই, আপনাদের চলে যেতে হবে। কারেন্টের লাইন কেটে দেবে, পানির লাইন বন্ধ করে দেবে, ঘরভেঙে দেবে।

“আমরা বলি, আমাদের ঘর ভেঙে দেবেন কেন, আমাদের তো জায়গা নেই, আমরা কোথায়া যাব?”

উচ্ছেদ আদেশের প্রতিবাদে নাগরিকদের বিবৃতিতে বলা হয়, “১৮৫৮ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্য ও তাদের পরিবার মিনিয়ালস কোয়ার্টারে বসবাস করছেন। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। এখানে ৬০ পরিবারের বসবাস। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী আছেন ৪২ জন।

“…​সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা এই অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।”

বিবৃতিতে দুটি দাবি তুলে ধরেন নাগরিকরা।

প্রথমত, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে উচ্ছেদ নোটিশ কার্যকর স্থগিত করতে হবে। স্থায়ী ও উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ বা ভবন অপসারণ কার্যক্রম চালানো যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ও বাস করা হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই কার্যক্রমে স্থানীয় হরিজন প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবাদলিপিতে স্বাক্ষর করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা নিত্রা, কাজলী সেহরীন ইসলাম, মোশাহিদা সুলতানা, আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, লেখক ও গবেষক পাভেলসহ অনেকে।