০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

এক কিশোরের তৈরি ম্রো বর্ণমালা এখন গুগল প্লে স্টোরে

বর্ণমালা তৈরি হওয়ার পর থেকে নিজেদের ভাষা ব্যবহারে চল রয়েছে ম্রোদের।

এক কিশোরের তৈরি ম্রো বর্ণমালা এখন গুগল প্লে স্টোরে
‘দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট’ নামে ম্রো ভাষায় পরিচালিত ব্লগের প্রচ্ছদের ছবি।

উসিথোয়াই মারমা

বান্দরবান প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Feb 2026, 10:13 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:59 PM

আশি দশকে এক ম্রো কিশোরের হাতে যে ভাষার অক্ষরের জন্ম, সেই ভাষা এখন ঠাঁই পেয়েছে গুগল প্লে স্টোরে, কম্পিউটারের কি-বোর্ডে।

এই ভাষার বর্ণমালাতেই এখন রীতিমত বই ছাপা হচ্ছে। বিভিন্ন সাময়িকীতে গল্প-প্রবন্ধ লেখা যাচ্ছে। এমনকি পাড়া-গ্রামে এক সাধারণ জুমচাষিও নিজের এই মাতৃভাষায় লিখতে পারছেন। পোস্ট দেওয়া যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। নিজের মাতৃভাষায় লেখা যাচ্ছে মনের মত করে। 

কয়েক বছর আগেও এই ভাষায় কাগজে-কলমে লেখা যেত মাত্র। প্রচলিত ছিল কেবল মৌখিক ভাষা হিসেবে। এখন ডিজিটাল জগতে স্থান করে নিয়েছে সেই ভাষা। 

ভাষা বিশেষজ্ঞরা বলে আসছিলেন, পৃথিবীতে প্রতিদিন একটি করে ভাষার মৃত্যু হচ্ছে। সেখানে ম্রো ভাষার টিকে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এমনকি এই বর্ণমালাতেই চর্চা হচ্ছে দুই দেশের ম্রো জনগোষ্ঠীর ভাষার। 

যে ম্রো কিশোরের হাতে এই ভাষার বর্ণমালা জন্ম; তিনি হলেন বান্দরবান সদর উপজেলা টংকাবতি ইউনিয়নে চিম্বুক পাহাড়ে ক্রামাদি পাড়ার বাসিন্দা মেনলে ম্রো। তার নামে হয়েছে ক্রামাদি পাড়ার নামও। অনেকে তাকে ‘ক্রামাদি মেনলে’ নামেও ডাকেন।

ইয়াংঙান ম্রোর লেখায় ম্রো ভাষায় একটি ব্যাকরণের বই।

ইয়াংঙান ম্রোর লেখায় ম্রো ভাষায় একটি ব্যাকরণের বই।

ম্রো ভাষা এখন গুগল প্লে স্টোরে

কয়েক বছর আগে আদিবাসীদের বিপন্নপ্রায় কয়েকটি ভাষাকে গুগল প্লে স্টোরে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয় সরকারের আইসিটি বিভাগ। এ কাজে যুক্ত ছিলেন ফ্রেন্ডস অব এনডেঞ্জার এথনিক ল্যাগুয়েজ (ফিল) সংস্থার ভাষা প্রযুক্তিবিদ সমর এন সরেন। তিনি কয়েক বছর ধরে দেশে বিপন্নপ্রায় ভাষা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ যাচ্ছেন। এর আগে তাদের উদ্যোগে খেয়াং ভাষার বর্ণমালাকেও কম্পিউটারে যুক্ত করেছিলেন তারা।

সমর এম সরেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ২০২৩ সালে আদিবাসীদের কয়েকটি ভাষা কম্পিউটার কি-বোর্ডে এবং গুগল প্লে স্টোরে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয় সরকারের আইসিটি বিভাগ। প্রথমে চারটি ভাষা চাকমা, মারমা, ম্রো ও সাঁওতালি ভাষা যুক্ত করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও দুটি ভাষা মাহালি ও মাল্টো ভাষাকে ভাষা প্রযুক্তিতে যুক্ত করা হয়। তার মধ্যে মাহালি ও মাল্টো বিপন্ন ভাষার তালিকায় রয়েছে।

“আমি এসব ভাষার কি-বোর্ড ডেভেলপমেন্টের লে-আউট কাজে যুক্ত ছিলাম। তিন বছর কাজ করার পর চলতি বছর গুগল প্লে-স্টোরে ১৬ জানুয়ারি অবমুক্ত করা হয়। সেখানে ‘ইউবোর্ড’ নামে রয়েছে। এখন থেকে যে কেউ গুগল প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করে এ ছয়টি ভাষায় লিখতে পারবে। যার ফলে সহজে নিজের ভাষার চর্চা বাড়বে। এসব কাজে কমিউনিটি এনগেইজমেন্টও দরকার। ভবিষ্যতেও আরও বিভিন্ন কমিউনিটি থেকে সহযোগিতা পেলে ভাষা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা যাবে।”

ইয়াংঙান ম্রোর লেখায় ম্রো ভাষায় সাত বীর শ্রেষ্ঠ বইয়ের প্রচ্ছদ।

ইয়াংঙান ম্রোর লেখায় ম্রো ভাষায় সাত বীর শ্রেষ্ঠ বইয়ের প্রচ্ছদ।

ম্রো ভাষার বর্ণমালা নিয়ে গুগল প্লে স্টোরে ‘কেইমেন’ নামে আরেকটা অ্যাপস রয়েছে। যেটা ২০১০ বা ২০১৩ সালের দিকে একজন বিদেশি নাগরিক তৈরি করেছিলেন। ‘ইউবোর্ড’ অ্যাপস তৈরি হবার আগে কেইমেন অ্যাপস ডাউনলোড করে ম্রো ভাষা লেখা হত বলে জানান কম্পিউটার রাইটার ও লামা উপজেলার পোপা মৌজার হেডম্যান যোহন ম্রো। 

তিনি বলেন, “আমি নিজেই এখনও কেইমেন অ্যাপসটা ব্যবহার করি। কম্পিউটারে যাবতীয় লেখা, বই ছাপা ও চিঠিপত্র সবকিছুতে কেইমেন ফন্ট ব্যবহার করা হয়। আমার কাছে এটাই সুবিধাজনক মনে হচ্ছে। তবে ফন্টগুলো আরও ডেভেলপ করতে হবে। ২০০৮ সালের দিকে ইউএনডিপির মাল্টি ল্যাংগুয়েজ প্রকল্পে কাজ করার সময় ম্রো ভাষার বর্ণমালা শিখেছি। এখন নিজের মত করে ভালভাবে লিখতে ও পড়তে পারি।

ম্রো বর্ণমালা ও সংখ্যা।

ম্রো বর্ণমালা ও সংখ্যা।

“এমনকি আমি নিজেই ‘দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট’ নামে একটা ব্লগ ম্রো ভাষা দিয়ে চালাই। কোভিড মহামারীর পর এটা খুলেছি। যেখানে আমাদের ম্রো সমাজ ব্যবস্থা, জীবনাচার ও শিক্ষা-সংস্কৃতি বিষয় নিয়ে লেখা ছাপা হয়। যাতে আমাদের ভাষা চর্চা হয়। যারা লিখতে ও পড়তে জানে তারাও সেখানে লিখতে পারে। ছাপা বইয়ের পাশাপাশি অনলাইনেও নিজের ভাষা ছড়িয়ে দিতে এই উদ্যোগটা নিয়েছি।’’

বান্দরবান শহরের উজানি পাড়ায় যোহন ম্রোর কম্পিউটার দোকান রয়েছে। ম্রো ভাষায় লেখা ছাপানোর জন্য বিভিন্ন এলাকার লোকজন আসে। এতে তার মাতৃভাষা ভাষা চর্চা আরও সুবিধা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ম্রোদের ক্রামা ধর্ম সম্পর্কিত ম্রো ভাষায় একটা বিজ্ঞপ্তি।

ম্রোদের ক্রামা ধর্ম সম্পর্কিত ম্রো ভাষায় একটা বিজ্ঞপ্তি।

যেভাবে তৈরি হল ম্রো ভাষার বর্ণমালা

আশির দশকের আগে পর্যন্ত ম্রো ভাষার কোনো বর্ণমালা ছিল না। কেবল মৌখিকভাবে যোগাযোগের একটা ভাষা ছিল মাত্র। ১৯৮২ সালে ক্রামাদি মেনলে নামে এক ম্রো কিশোর এ ভাষার বর্ণমালা প্রবর্তন করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। যখন বর্ণমালা তৈরি করেন তখন তিনি বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়ন এলাকায় ম্রো আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা কেবল এই পর্যন্ত। পরে স্বেছায় স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

বর্ণমালা প্রবর্তন করার পর মেনলে ম্রো নিজেও চিম্বুক পাহাড় এলাকা ও ম্রো অধ্যুষিত অন্যান্য পাড়ায় স্কুল তৈরি করে ম্রো বর্ণমালা শেখাতেন। তখন পাড়ায় পাড়ায় ‘ম্রো ভাষা শিক্ষা কমিটি’ থাকত। এখন কমিটিগুলো কোথাও সক্রিয়, কোথাও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। বর্ণমালা প্রবর্তনের দুই বছর পর ১৯৮৪ সালে ১৯ বছর বয়সে বর্তমানে চিম্বকু পাহাড়ে ক্রামাদি পাড়া থেকে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হন মেনলে ম্রো। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো খোঁজ মেলেনি তার। বর্ণমালা প্রবর্তন করার আগে তিনি ‘ক্রামা ধর্ম’ নামে ম্রোদের একটা নিজস্ব ধর্মও প্রবর্তন করেন। তৈরি করা হয় এই ‘ক্রামা ধর্মের’ সামাজিক রীতিনীতিও। এ ধর্ম প্রবর্তন করার আগে ম্রোদের সবাই প্রকৃতি পূজারী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। ম্রোদের বিশ্বাস, তাদের মাঝে কোনো একদিন আবার ফিরে আসবেন এই মেনলে ম্রো।

ক্রামা ধর্ম ও ম্রো ভাষার বর্ণমালা প্রচার-প্রসারের জন্য তখনকার সময় পাঁচজন শিষ্য তৈরি করে যান মেনলে ম্রো। পরে ওই পাঁচজন ম্রো শিষ্যই নিজেদের মত করে ম্রো ভাষার বর্ণমালা শেখানোর ব্যবস্থা করেন। এখন বিভিন্ন দুর্গম পাড়া-গ্রামে অনেকেই ম্রো ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারেন। এমনকি মিয়ানমারে রাখাইন ও শাইন রাজ্যের ম্রোরা পর্যন্ত এই মেনলে ম্রোর প্রবর্তন করা বর্ণমালাতেই ম্রো ভাষা চর্চা করে থাকেন। কারণ এর আগে সেখানকার ম্রোদেরও কোনো নিজস্ব বর্ণমালা ছিল না। চিম্বুক পাহাড়ে এক কিশোর মেনলে ম্রোর তৈরি করা বর্ণমালাতেই ভাষা চর্চা করে থাকেন তারা।

ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াঙান ম্রো বলেন, ম্রো বর্ণমালা মোট ৩১টি স্বরবর্ণ রয়েছে। মিয়ানমারে বসবাসরত ম্রোরা বাংলাদেশে ম্রোদের হরফটাই ব্যবহার করে থাকে। তারা এখানে বেড়াতে আসলে আমাদের বইগুলো বেশি নিয়ে যায়। বিশেষ করে গান ও গল্পের বই এবং সামাজিক ও ক্রামা ধর্মীয় রীতিনীতি সম্পর্কিত বই কিনে নিয়ে যায় তারা।”

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

ম্রো ভাষাতেও ফেইসবুক পোস্ট

বর্ণমালা তৈরি হওয়ার পর থেকে নিজেদের ভাষা ব্যবহারে চল রয়েছে ম্রোদের। কারও আমন্ত্রণপত্র, চিঠিপত্র, সামাজিক নির্দেশনা ও পাড়ার নাম ম্রো ভাষায় লেখা হত। এমনকি বইপুস্তক ও ছোট ছোট পুস্তিকাও ছাপা হত ম্রো ভাষায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু ম্রো ভাষায় গুগল অ্যাপস তৈরি হওয়ার পর থেকে এখন নিজেদের ভাষায় ফেইসবুকে নিয়মিত পোস্ট করে থাকেন অনেকেই। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম শিক্ষিত ম্রোদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হচ্ছে। তেমন একজন নারী মেলকম ম্রো। পেশায় তিনি উন্নয়নকর্মী। তার ফেইসবুক আইডি থেকে ম্রো ভাষায় নিয়মিত লেখালেখি করে যাচ্ছেন তিনি।

এ বিষয়ে মেলকম ম্রো বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি ম্রো ভাষার বর্ণমালা শিখেছি। আমি যে স্কুলে পড়েছি সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট (কেএসআই) থেকে একজন ম্রো ভাষার শিক্ষক এসে পড়াতেন। দুপুরের পর কখনও এক ঘণ্টা, কখনও দুই ঘণ্টা করে ম্রো ভাষার বর্ণমালা শেখাতেন। পরে কেএসআই থেকেও একবার নয়, দুইবার কোর্স নিয়েছি। সে কারণে নিজের মাতৃভাষায় লিখতে পারি, পড়তে পারি। তবে ফেইসবুকে নিজেদের মধ্যে ম্রো ভাষায় চ্যাট করার সুযোগ এখনও কম।

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

“যারা ম্রো ভাষায় লিখতে পারে তাদের অনেকের সঙ্গে চ্যাট করা হয়। তবে বেশিক্ষণ করা যায় না। অনেকেই এখনও ভাল করে ম্রো ভাষা লিখতে পারে না। তারা যেটুকু পারে ওইটুকু চ্যাট পর্যন্ত করা হয়। আমাদের ভাষায় নিয়মিত চর্চা করা দরকার। এগুলো নিয়মিত করতে পারলে নিজের ভাষায় লেখার দক্ষতা আরও বাড়বে। নিজের ভাষায় লিখে প্রকাশ করা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে।”

গুগল প্লে স্টোরে ম্রো ভাষা যুক্ত হওয়াকে যুগান্তকারী ঘটনা বলে মনে করেন মেলকম ম্রো। তিনি বলেন, গুগল প্লে স্টোরে আগে ‘কেইমেন’ নামে একটা অ্যাপস ছিল। আমরা ওটা ডাউনলোড করে ম্রো ভাষা লিখতাম। কিন্তু সবগুলো ঠিকভাবে লেখা যাচ্ছিল না। এখনও ‘ইউবোর্ড’ অ্যাপসের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে লেখা যাচ্ছে। এটা আমাদের ম্রো কমিউনিটির জন্য একটা যুগান্তকরাী ঘটনা। আশা করি, এখন থেকে আমাদের ভাষা চর্চা আরও বাড়বে।

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্টাডিজ বিভাগের নারী শিক্ষার্থী ফেকরু ম্রো বলেন, “আমারও ছোট থাকতে ম্রো ভাষার বর্ণমালা শেখার সুযোগ হয়েছে। এখনও ভাল করে লিখতে পারি এবং পড়তেও পারি। ২০১৮ সালে থানচিতে তিন মাসের কোর্স করার সুযোগ হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালে কেএসআই থেকেও কোর্স করেছি। নিজের ভাষায় ফেইসবুকে পোস্ট করি। তবে নিয়মিতভাবে করা হয়ে উঠে না।”

বাংলা ও ম্রো ভাষায় দীর্ঘদিন লেখালেখি করে আসছেন লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো। এই পর্যন্ত তার ম্রো ভাষায় ২১টি, রেংমিটচ্য ভাষায় ২টি এবং বাংলা ভাষায় ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। ফেইসবুকেও ম্রো ভাষায় লেখালেখি করে থাকেন তিনি। 

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

ম্রো ভাষায় ফেইসবুকের পোস্ট

ইয়াংঙান ম্রো বলেন, অ্যাপস বের হওয়ার আগে ম্রো ভাষায় মোবাইলে লেখালেখি করার সুযোগ ছিল না। ম্রোদের মধ্যে যারা বাংলা পারে না তারা এখন খুব সহজে নিজের ভাষায় লেখালেখি করার সুযোগ পাচ্ছে। অ্যাপস ব্যবহার করে ম্রো ভাষায় ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে তারা। মোবাইল নম্বর সেইভ করছে। ম্রো ভাষা দিয়ে সংখ্যা হিসাব করছে। একে অপরের সঙ্গে চ্যাট করছে। এ সবকিছু একটা ভাষা চর্চা ও ভাষা রক্ষার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।”

‘দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট’ নামে ম্রো ভাষায় পরিচালিত ব্লগের লেখা।

‘দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট’ নামে ম্রো ভাষায় পরিচালিত ব্লগের লেখা।

নিজেদের উদ্যোগে বর্ণমালা শিক্ষা

ম্রোদের বিভিন্ন পাড়ায় নিজেদের উদ্যোগে বর্ণমালা শেখার উদ্যোগ রয়েছে। সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে বই বের করে শিশু শিক্ষার্থীদের এসব শেখানো হয় বলে জানান বান্দরবান সদর উপজেলার টংকবতি ইউনিয়নের বাগান পাড়ার বাসিন্দা ঙানসিং ম্রো। তিনি নিজেও ম্রো ভাষার প্রশিক্ষক। পেশায় বাগানচাষী। ১৯ ফেব্রুয়ারি বান্দরবান শহরে একটা ম্রো কম্পিউটার দোকানে এসেছেন ম্রো ভাষায় একটা লেখা তদারকি করতে। 

ম্রো বর্ণমালা কিভাবে শেখা হয়েছে জানতে চাইলে ঙানসিং ম্রো বলেন, মেনলে ম্রো বর্ণমালা প্রবর্তন করার পর ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে ম্রো বর্ণমালা রপ্ত করে নিয়েছি। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাচ্চাদের শেখাই। সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ম্রো ভাষায় লেখালেখি করে থাকি। এসব করে ম্রো ভাষার বর্ণমালা ভাল করে শেখা হয়ে যায়। এখন বিভিন্ন এলাকায় গেলে সবাইকে ম্রো ভাষার বর্ণমালা শিখতে উৎসাহিত করি।

তখন তার হাতে ছিল ম্রো ভাষার একটি বই। বইটি ভাল মানের ছাপানো। লেখার সঙ্গে রয়েছে নানারকম ছবিও। 

‘দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট’ নামে ম্রো ভাষায় পরিচালিত ব্লগের লেখা।

‘দ্য ম্রোচা ডট ব্লগ স্পট’ নামে ম্রো ভাষায় পরিচালিত ব্লগের লেখা।

ঙানসিং ম্রো বইটির পরিচিতি তুলে ধরে বলেন, এটি একটি ম্রো ভাষায় গণিতের বই। একসময় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে একটি এনজিও ম্রো ভাষা নিয়ে কাজ করেছিল। ছেলেমেয়েদের পড়ানো হত। এখন এসব বই সংশোধন করে ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৪০ পৃষ্ঠার বইটি ছাপানোর খরচ পড়েছে ১৩৫ টাকা করে। প্রথম ধাপে ৪০০ কপি ছাপানো হয়েছে। ‘রিয়ুং খিতি লোপক্রম থুম’ নামে একটা ভাষা শেখার সংগঠন আছে। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে বিতরণ করা হবে।

ম্রো ভাষায় গণিতের বই।

ম্রো ভাষায় গণিতের বই।

কেএসআইতে ম্রো ভাষা কোর্স

ম্রো ভাষা শিক্ষা কোর্স সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিউিটের (কেএসআই) পরিচালক নুক্রাচিং মারমা বলেন, কেএসআইয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন ভাষার শিক্ষা কোর্স চালু রয়েছে। তার মধ্যে ম্রোদের দুই মাসের একটা কোর্স করানো হয়। এক ব্যাচে ৩০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী থাকে। তবে প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই বেশি থাকে। ম্রো ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স গত বছর শেষ হয়েছে। খুব শিগগির আবারও চালু করা হবে।