আন্দোলনরতদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড: উপদেষ্টা দায় দিলেন শিক্ষক নেতাদের
“এ ধরনের একটা পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায় তাদের, যারা এ ধরনের একটা অযৌক্তিক আন্দোলনের ডাক দিয়ে শিক্ষকদের মিছিমিছি বিভ্রান্ত করে নিয়ে এসেছে।”
দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দাবিতে আন্দোলনে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেডে অসুস্থ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা আক্তারে মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে তার পরিবারকে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।
তবে শিক্ষকদের ওই আন্দোলনকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেছেন, আন্দোলনরতদের ওপর পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান প্রয়োগ এবং লাঠিচার্জের ‘দায়’ শিক্ষক নেতাদের।
মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, “যিনি মারা গেলেন, তার জন্য আমরা দুঃখিত, তিনি আমাদের পরিবারের একজন সদস্য এবং আমরা তার পরিবারের সদস্যদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করব।”
গত রোববার রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফাতেমা আক্তার।
দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দাবিতে গত ৮ নভেম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেডে তিন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে শিক্ষক নেতাদের ভাষ্য।
ফাতেমা আক্তার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ৫ নম্বর ঝিনাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন।
গত ৮ নভেম্বর শহীদ মিনারে তিন দাবিতে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষকরা। সেদিন বিকালে তারা ‘কলম বিরতি কর্মসূচি’ পালনে মিছিল নিয়ে শাহাবাগের দিকে এগিয়ে যাওয়া চেষ্টা করলে শাহবাগ থানার সামনে তাদের আটকে দেয় পুলিশ।
পরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান, লাঠি চার্জ, কাঁদুনে গ্যাসে শিক্ষকদের কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়। এ সময় দেড় শতাধিক শিক্ষক আহত হওয়ার পাশাপাশি ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মঙ্গলবার বিকালে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে নতুন চালু হওয়া ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন-ডিপিএডের পাইলটিং শুরুর বার্তা দিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে এসে ওই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।
উত্তরে শিক্ষকদের আন্দোলন কর্মসূচির প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, “তাদের কথা ছিল তারা শহীদ মিনারে আন্দোলন করবে, কিন্তু তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার ওইদিকে যাওয়ার চেষ্টা করল। এ ধরনের একটা পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায় তাদের, যারা এ ধরনের একটা অযৌক্তিক আন্দোলনের ডাক দিয়ে শিক্ষকদের মিছিমিছি বিভ্রান্ত করে নিয়ে এসেছে।
“আমরা শিক্ষকদের স্বার্থে বরাবরই কাজ করার চেষ্টা করছি। সেটা যারা খোঁজ নেন তারা জানেন। এজন্য শিক্ষকদের প্রতিনিধি অন্য নয়াটা সংগঠন তারা কিন্তু ওই আন্দোলনে যোগ দেন নাই।”
ত্রয়োদশ গ্রেডে বেতন পাওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন একাদশ গ্রেডে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে অধ্যাপক বিধান রঞ্জন বলেন, “সহকারী শিক্ষকরা যারা ১৩তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন তারা যেন এগারোতম গ্রেডে বেতন পান সেজন্য আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে লিখেছি, উনারা রেফার করেছেন বেতন কমিশনে।
“আমরা কেবিনেট ডিভিশনে তদবির করেছি, যেন উনারা আমাদের ফেভারে বলেন, উপদেষ্টাদের তদবির করছি যেন ফেভারে বলেন, আমি নিজে বেতন কমিশনে গিয়েছি, আমি গিয়ে উনাদের কনভিন্স করার চেষ্টা করছি।”
উপদেষ্টা বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠনগুলোর মধ্যে নয়টা সংগঠন আমাদের এখানে মিটিং করেছে, মিটিং কনভিন্সড হয়েছে যে আমরা তাদের ফেভারে এবং তাদের হয়েই কাজ করছি। ফলে তারা আন্দোলনে যায় নাই। ভুঁইফোড় চারটা সংগঠন তারা একটা অযৌক্তিক দাবি (দশম গ্রেডে বেতন) নিয়ে আন্দোলন করছে।”
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করার দাবির কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “যেখানে প্রধান শিক্ষকের দশম গ্রেড এখনও আমরা ফয়সালা করতে পারি নাই, প্রক্রিয়া চলতেসে, অনেক লম্বা প্রক্রিয়া, আমরা করব শিগগিরই; সেইখানে তারা (সহকারী শিক্ষকরা) দশম গ্রেড দাবি করতেসেন।
“এটা কি গভার্নমেন্টের একটা সিস্টেমে সম্ভব? আমি মনে করি, যারা এ আন্দোলনটা করেছেন তারা শিক্ষকদের ভুল বুঝিয়েছেন এবং তারা শিক্ষকদের এখানে এনে হেনস্তার শিকার করেছে।”
আদালত ৪৫ জন প্রধান শিক্ষকের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করার আদেশ দিলেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘আন্তরিক হয়ে’ সব প্রধান শিক্ষকের বেতন দশম গ্রেডে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “বিগত সরকার ২০১৪ সালে ঘোষণা করেছিল, তারা (প্রধান শিক্ষকরা) দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিজীবী, এটা করাতে কি হয়েছে? তৃতীয় শ্রেণির চাকরিজীবী হিসাবে তারা যে সুবিধাগুলো পেতেন, সেগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো গ্রেডও তাদের দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে, আমরা বলেছি আইনজীবীদের আমরা তাদের ফেভার… আমরা মনে করি শিক্ষকদের এটা পাওয়া উচিত।
“যখন কোর্ট রায় দিল, আমি তখন আমাদের কেবিনেটকে কনভিন্স করসি, আমাদের সব শিক্ষকের জন্য এটা চালু করা প্রয়োজন। কোর্টের রায়ে এটা উল্লেখ নাই যে ৪৫ জন মামলা করেছিলেন তারাই পেতেন, অন্যদের কথা উল্লেখ নাই। ফলে কেবিনেট অনুমোদন করেছে আমরা সব প্রধান শিক্ষককেই দশম গ্রেড দিচ্ছি। আর শিক্ষক সংখ্যা কম নয় সাড়ে ৬৫ হাজারের ওপরে।”
সংগীত শিক্ষকের পদ বাতিল নিয়ে উপদেষ্টার ভাষ্য
ভবিষ্যতে ‘বৃহৎ পরিসরে চালু করতেই’ সরকার সংগীত শিক্ষকের পদ বাতিল করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।
শিশুর বিকাশে সংগীত ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে’ মন্তব্য করে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, পরবর্তী সরকার সংগীত শিক্ষকের পদ সৃষ্টির বিষয়ে “তাগিদ বোধ করবে।”
সংগীত শিক্ষকের পদ বাতিল নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, আমরা আরও বৃহৎ পরিসরে এটা চালু করতে চাই।
“এর মানে হচ্ছে এই যে, সরকার নীতিগতভাবে এটাকে সমর্থন করছে। সরকার নীতিগতভাবে এটাকে সমর্থন করছে। সরকারে যেভাবে নীতিগতভাবে এটাকে সমর্থন করছে, আমিও মনে করি সংগীত খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
অন্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেই ‘বৃহৎ পরিসরে’ সংগীত শিক্ষকের পদ সৃষ্টি উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না–সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের টার্মতো বেশি না, আমাদের টার্মে হয়তো এত বড় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ হয়তো হবে না।
“আমার ধারণা এ বিষয়গুলোতে মানুষের মধ্যে একটা বোধ তৈরি হয়েছে, যে না এটা একটা প্রয়োজনীয় বিষয়। নিসন্দেহে পরবর্তী গভার্নর্মেন্ট যারা আসবেন, তারা এ বিষয়টায় তাগিদ বোধ করবেন।”
যারা সংগীত চর্চা করে, তাদের গাণিতিক দক্ষতা ভালো হয় মন্তব্য করে উপদেষ্টা বলেন, “শিক্ষার উদ্দেশ্য শিশুর সামগ্রিক বিকাশ। মানুষ হিসাবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, তার আবেগবোধের বিকাশ, তার রুচিবোধের বিকাশ এ বিষয়গুলো গঠন করাতে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেজন্য দেখেন কি তুরস্ক, কি মালেয়শিয়া, কি ইন্দোনেশিয়া সবখানেই এ ব্যবস্থা আছে।
“আমরা যদি আমাদের পুরনো সভ্যতার দিকে তাকাই, রোমান সভ্যতা বলেন, চৈনিক সভ্যতা বলেন, সবখানেই ছাত্রদের শিক্ষা অনুষঙ্গ ছিল সংগীত। তাই সংগীতকে আমাদের বড় স্পেয়ারে দেখা দরকার।”
শিশুরা সংগীত চর্চা করলে সবাই যে সংগীত শিল্পী হয়ে যাবে না– সে কথা তুলে তিনি বলেন, “কিন্তু তার (শিশুর) আবেগগত ডেভেলপমেন্ট, তার ব্রেইনের ডেভেলপমেন্টে এটা (সংগীত চর্চা) একটা পজেটিভ রোল রাখবে। ফলে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে এটা সহায়ক হয়ে উঠবে।”
গত ২৮ অগাস্ট জারি করা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন নিয়োগ বিধিমালায় সংগীত ও শরীরচর্চা বিষয়ের সহকারী শিক্ষকের দুইটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো সংগীত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদটি সৃষ্টি নিয়ে সমালোচনা শুরু করে।
গত ২ নভেম্বর বিধিমালাটি সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন সংগীত ও শরীরচর্চা বিষয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ দুটি বিধিমালা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পদ দুটি বাতিলের পর তা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
পরে গত ৪ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, “সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ২৫০০ ক্লাস্টারে সমসংখ্যক শরীর চর্চা শিক্ষক ও সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সম্প্রতি সচিব কমিটির সুপারিশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
“সচিব কমিটি মনে করে, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল। এত অল্প সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে কার্যকর কোনো সুফল বয়ে আনবে না এবং এতে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে। সারাদেশে ৬৫ হাজার ৫ শত ৬৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশেই প্রস্তাবিত নিয়োগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। ক্লাস্টার ভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হলে একই শিক্ষককে ২০টির অধিক বিদ্যালয়ে যুগপৎভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর ফলে তার পক্ষে কর্মঘণ্টা ম্যানেজ করা সম্ভব হবে না বলে সচিব কমিটি মনে করে।”
পরবর্তীতে অর্থের সংস্থান-সাপেক্ষে সব স্কুলে ‘এরকম নতুন বিষয়ের শিক্ষকের পদ সৃজন’ এবং ‘সেসব পদে নিয়োগের’ বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে সচিব কমিটি অভিমত ব্যক্ত করেছে বলেও বিবৃতিতে তুলে ধরে অন্তর্বর্তী সরকার।
