ছিনতাইকালে শিক্ষক নিহত: গ্রেপ্তার ২, র্যাবের উদ্ধার বাইকের রং, মডেল নিয়ে প্রশ্ন
“আলোর প্রতিফলন বা গতির কারণে রংয়ের বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই,” বলেন চারুকলার এক শিক্ষক।
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীদের টানে অটোরিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা নিহতের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তবে র্যাবের উদ্ধার মোটরসাইকেল ও ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা মোটরসাইকেল এক কিনা তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
এ বিষয়ে জানাতে র্যাব-২ এর ডাকা রোববারের সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তারের একজন উদ্ধার দেখানো মোটরসাইকেলের রঙ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিৎকার করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে নিজেকে নির্দোষও দাবি করেন।
তার বক্তব্যের সূত্র ধরে উদ্ধার দেখানো বাইকের ছবির সঙ্গে ছিনতাইয়ের সময়কার সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যাওয়া মোটরসাইকেলের ছবি তুলনা করলে দেখা যায়, দুটোর রং দুই রকম। এমনকি দুটো মোটরসাইকেলের মডেলও দুই রকম বলে জানাচ্ছেন বাইকাররা। তারা বলছেন, এর একটি ইয়ামাহা, আরেকটি সুজুকি।
সংবাদ সম্মেলনে পনি গাজীকে ছিনতাইয়ের ঘটনার মূল ‘সন্দেহভাজন ছিনতাইকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্য দেন র্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান। গ্রেপ্তার অপর ব্যক্তি সেড্রিক পনি গাজীর সহযোগী বলে তুলে ধরেন তিনি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় র্যাব-২ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরেন।
শনিবার ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে নিহত হন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন।
চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকা এসেছিলেন তিনি। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ টান দেয়। এতে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নিলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
একদিন পর রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকা থেকে দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে র্যাব কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে এ ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা ‘ইয়ামাহা আর১৫’ মডেলের মোটরসাইকেল উদ্ধারের তথ্য দেন। এটির মালিককেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার কথা বলেন তারা।
তবে র্যাবের জব্দ করা মোটরসাইকেলটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ছিনতাইয়ের সময় ধারণ করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, সেটি নীল রঙের। আর র্যাবের উদ্ধার দেখানো যে মোটরসাইকেলের ছবি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া হয় সেটি রুপালি ও কালো রঙের।
র্যাব-২ অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের শনাক্ত করা হয়। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাবের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিব। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
রাকিবের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নয়মুল বলেন, রাকিবের এলাকার বড় ভাই পনি। বিভিন্ন সময় হুমকি-ধামকি দিয়ে তার কাছ থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে যেতেন পনি। গত ২৬ অগাস্ট থেকে শনিবার বিকাল পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি পনি এর কাছেই ছিল বলেও রাকিব দাবি করেছেন।
তিনি বলছেন, ঘটনার দিনও মোটরসাইকেলটি পনি’র কাছে ছিল। নিহত রনজিলা পারভিনের স্বামী আব্দুল মতিনও উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি দেখে সেটিই ছিনতাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়া সিসি ক্যামেরার ফুটেজের দেখা চালকের দৈহিক গঠনের সঙ্গে পনি’র মিল থাকার দাবিও করা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। স্থানীয় ১৫ জন পুলিশের ‘সোর্সকে’ ভিডিও দেখিয়েও তারা পনিকে শনাক্তের দাবি করেছেন র্যাব-২ এ অধিনায়ক।
তৃতীয় যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, ঘটনার সময় রাত আড়াইটা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত পনি ও সেড্রিকের মোবাইল নম্বর ওই এলাকার আশপাশে অবস্থান করছিল।
“এর বাইরে এই মুহূর্তে আমাদের কাছে আর কোনো তথ্য নেই।”
র্যাবের দাবি, পনি গাজী একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত।
তার বিরুদ্ধে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হাতিরঝিল, আদাবর ও কাফরুল থানায় মাদকের তিনটি মামলা; ভাটারা, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, বাড্ডা ও শাহজাহানপুর থানায় চুরি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ছয়টি মামলা রয়েছে।
এছাড়া আদাবর, খিলগাঁও ও কামরাঙ্গীরচর থানায় চুরি ও সিঁদেল চুরির তিনটি এবং চাঁদপুর মডেল থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির একটি মামলা রয়েছে। পনি এর আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন। তবে সর্বশেষ কবে তিনি জামিনে বেরিয়েছেন, সেই তথ্য এখনও না পাওয়ার কথা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা নয়মুল বলেন, তবে সেড্রিকের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলের মালিক রাকিব বলেছেন, ঘটনার সময় পনি’র পেছনে সেড্রিক বসেছিলেন।
মোটরসাইকেলে রং নিয়ে প্রশ্ন
ব্রিফিং শেষে র্যাব-২ সদর দপ্তরের সামনে গ্রেপ্তার দুজনকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। তখন পনি গাজী চিৎকার করে বলেন, তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাকে জোর করে ধরে আনা হয়েছে।
একপর্যায়ে তিনি নিজের মোটরসাইকেলের রঙের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, তার বাইক রুপালি ও কালো রংয়ের হলেও ছিনতাইয়ের সময় যে বাইক দেখা গেছে সেটির রং নীল। বিষয়টি সাংবাদিকদের তদন্ত করে দেখার অনুরোধও করেন তিনি। এরপর র্যাব সদস্যরা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন।
মোটরসাইকেলের রঙের অমিল বিষয়ক প্রশ্নে র্যাবের অধিনায়ক নয়মুল হাসানও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকার কথা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন।
তার দাবি, তিনি বাইকটি নিহত শিক্ষিকার স্বামীকে দেখিয়েছেন৷ তার স্বামী বলেছেন, ‘হুবহু এই বাইকটাই ছিল’।
মোটরসাইকেলের বিষয়ে জানতে চাইলে নিহত শিক্ষিকার স্বামী আবদুল মতিন বলেন, “যখন ঘটনা ঘটেছে তখন রোগীকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন মোটরসাইকেলের রং কী, কেমন মোটরসাইকেল ছিল তা খেয়াল করিনি। কোন রংয়ের মোটরসাইকেল ছিল তা তখন মার্ক করতে পারিনি।
“এমন কোনো কাজ নেই যা প্রশাসন চেষ্টা করলে পারবে না। আমি চাই সুষ্ঠু তদন্ত করে যারা অপরাধ করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
র্যাব কর্মকর্তা নয়মুল বলেন, মামলায় আসামি অজ্ঞাত। তাই পনি ও সেড্রিককে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“সন্দেহভাজন থেকেই ধীরে ধীরে জিনিসটা ডেভেলপ করবে। আরও স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব।”
এর আগে শনিবার ছিনতাইয়ের ঘটনার দুটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
এসব ভিডিওতে দেখা যায়, নীল রঙের একটি মোটরসাইকেলে দুজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়কে ঘোরাফেরা করছেন। অন্যদিকে র্যাবের সরবরাহ করা উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের ছবিতে সেটি রুপালি ও কালো রঙের দেখা যাচ্ছে।
রাতের বেলা আলোর কারণে বাইক দুটির রংয়ে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে কিনা- জানতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দীপ্তি দত্তের সঙ্গে।
তাকে র্যাবের উদ্ধার দেখানো মোটরসাইকেলের ছবি এবং ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা মোটরসাইকেলের দুটি সিসিটিভি ভিডিও পাঠানো হয়।
ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে দীপ্তি দত্ত বলেন, ভিডিওতে রাস্তার পাশে গ্রামীণফোনের লোগোযুক্ত একটি ডিজিটাল এলইডি ব্যানার দেখা যাচ্ছে। খালি চোখে ব্যানারটির যে রং দেখা যায়, ভিডিওতেও সেটি প্রায় একই রকম রয়েছে।
তার ভাষ্য, একইভাবে ভিডিওতে থাকা লাল ইটের গেইটটির রংয়ের বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সড়কের বিভিন্ন স্থাপনা এবং দুই মোটরসাইকেল আরোহীর পোশাকের রংও ভিডিওজুড়ে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
যে কারণে তার ভাষায়, “আলোর প্রতিফলন বা গতির কারণে রংয়ের বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ নেই।”
মডেল কি একই?
র্যাবের উদ্ধার করা ও ভিডিওতে দেখতে পাওয়া বাইক দুটির মডেলের বিষয়ে মোটরসাইকেল বিষয়ক কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিকু আমির বলছেন, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে সেটা ‘সুজুকি জিক্সার এসএফ ২০২০’ মডেলের একটি মোটরসাইকেল। অপরদিকে র্যাব যেটি উদ্ধার করেছে সেটি ‘ইয়ামাহা আর১৫’ মডেলের। দুটো আলাদা মোটরসাইকেল।
মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছিনতাইয়ে ব্যবহার হওয়া সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেলটি কালো বা নেভি ব্লু রংয়ের হতে পারে।
আর উদ্ধার করা ইয়ামাহা মোটরসাইকেলটির সামনের বডি কিটের অনেকটাই সাদা (পার্ল) রঙের।
একজন বাইকার বলেন, অপরদিকে পেছন দিক থেকে সিসিটিভির যে ভিডিও দেখা যায় তাতে বোঝা যাচ্ছে এটি সুজুকি জিক্সার। কারণ জিক্সার মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার পাইপটিতে দুটো ফুটো রয়েছে আর এটি চকচকে ধাতব (ক্রোম) আবরণে মোড়ানো। ইয়ামাহায় সাইলেন্সারটি সম্পূর্ণ অন্যরকম।
পরে রং ও মডেলের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে র্যাব কর্মকর্তা নয়মুল হাসানের দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন:
