ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণার প্রস্তাব, পরে সরল প্রসিকিউশন
সালমান রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দেন ওই সাক্ষী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া এক সাক্ষীকে জেরার সময় বৈরী ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। পরে সেই প্রস্তাব থেকে সরে আসে তারা।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে আল আমিন নামের ওই সাক্ষীর জেরা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সরাসরি বিধান না থাকলেও ওই সাক্ষীকে জেরার একপর্যায়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম মৌখিকভাবে বৈরী (হোস্টাইল) ঘোষণার কথা বললে আদালত লিখিত আবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
তবে বিকেলে প্রসিকিউশন জানায়, তারা সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করবে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো আবেদনও আদালতে দাখিল করবে না।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “না, সাক্ষী বৈরী হবে না। এটা মিজান ভাই না বুঝেই বলেছেন। আমরা কোনো আবেদন দিচ্ছি না। ২৫ তারিখে আমাদের নতুন সাক্ষী আসবে।”
আরেক প্রসিকিউটর মার্জিনা রায়হান মদিনাও একই তথ্য দিয়ে বলেন, “মিজানুল ইসলাম বিষয়টি না বুঝে বলে ফেলেছেন। ওপেন কোর্টেও প্রসিকিউশন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে কোনো দরখাস্ত দেবে না। এই সাক্ষীর মধ্যে বৈরী হওয়ার মত কিছু আমি দেখিনি।"
মদিনা বলেন, প্রসিকিউশন থেকে ‘হোস্টাইল’ শব্দটি উচ্চারণের পর ডিফেন্স আপত্তি জানালে ট্রাইব্যুনাল কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা হয়।
সাধারণভাবে বৈরী সাক্ষী বলতে এমন সাক্ষীকে বোঝায়, যিনি যে পক্ষ তাকে আদালতে হাজির করেছে, সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সেই পক্ষের অবস্থানের বিপরীতে বক্তব্য দেন। অর্থাৎ ওই পক্ষের প্রতি বৈরী আচরণ করেন। সাধারণত ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বৈরী আচরণ করলে বা প্রসিকিউশনের বিপক্ষে বক্তব্য দিলে, প্রসিকিউশন তাকে জেরা করার সুযোগ পায়। এরপর আসামি পক্ষও তাকে পুনরায় জেরা করতে পারে।
‘ট্রাইব্যুনাল আইনে বৈরী ঘোষণার বিধান নেই’
প্রসিকিউশনের ওই উদ্যোগের আইনি ভিত্তি প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে সাক্ষীকে ‘হোস্টাইল’ বা বৈরী ঘোষণার কোনো প্রত্যক্ষ বিধান বা আইনি সুযোগ নেই।”
তার মতে, ট্রাইব্যুনালে মৌখিকভাবে কোনো সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণার দাবি আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ আইনি নীতি অনুযায়ী কোনো সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করতে হলে জবানবন্দি গ্রহণের সময়ই আবেদন করতে হয়। জেরার শেষ পর্যায়ে এসে এ ধরনের আবেদন করার কোনো সুযোগ নেই।
ট্রাইব্যুনাল আইনে ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ প্রণয়নের ক্ষমতা থাকলেও বৈরী সাক্ষী সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট বিধি এখনো প্রণয়ন না করার তথ্য দিয়ে দুলু বলেন, "এ ধরনের বিধান কার্যকর করতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট রুল প্রণয়ন করে তা সরকারের কাছে পাঠাতে হবে এবং সরকারি গেজেটের মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে।"
তিনি বলেন, “সাধারণ ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য আইনের অধীনে কোনো সাক্ষী বৈরী আচরণ করলে প্রসিকিউশন তাকে জেরা করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাধারণ সাক্ষ্য আইন সরাসরি প্রযোজ্য নয়।”
যে প্রসঙ্গের পর বৈরী ঘোষণার প্রস্তাব আসে
আদালতে সালমান রহমানের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় জেরার সময় সাক্ষীর কাছে জানতে চান–তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া বক্তব্য এবং আদালতে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে মিল রয়েছে কি না?
জবাবে সাক্ষী আল আমিন বলেন, “আগে আমি সঠিকভাবে কথা বলতে পারি নাই, আজকে মন খুলে কথা বলতে পারছি।”
আইনজীবী পলাশ বলেন, “ওই প্রশ্নের পরপরই প্রসিকিউশন থেকে সাক্ষীকে হোস্টাইল ঘোষণার মৌখিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। আদালত লিখিত আবেদন দাখিল করতে বলেছিল। তবে ডিফেন্স পক্ষ ওই সাক্ষীর জেরা সম্পন্ন করেছে।"
আইসিটি আইনে সুনির্দিষ্টভাবে এই সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণার ব্যাপার নেই বলে তুলে ধরেন এই আইনজীবী।
সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণার বিষয়টিকে ট্রাইব্যুনালের ‘প্রথম ঘটনা’ তুলে ধরে আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জেরা শেষের দিকে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছে এই সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করার জন্য তারা একটি আবেদন জমা দেবে। এ বিষয়ে আগামী ২৫ অগাস্ট শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। এরপর সাক্ষীপর্ব হবে।”
বৈরী ঘোষণার প্রস্তাব কেন করা হল- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “সেটা দরখাস্তে বোঝা যাবে।”
মনসুরুল হক বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এসে যখন তাদের সমর্থন না করে অন্যরকম সাক্ষ্য দেয়, তখন তাকে বৈরী ঘোষণা করা যায়। আইওর কাছে একরকম বলেছে, আর এখানে এসে আরেক রকম বলেছে।”
আসামি আনিসুল হকের আইনজীবী শাহরিয়ার কবির বিপ্লব বলেন, “জেরা প্রায় শেষ পর্যায়ে আসার পর কোনো সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণার দাবি প্রচলিত নিয়মের বাইরে। সাক্ষীর বক্তব্য প্রসিকিউশনের পক্ষে না যাওয়ায় এমন দাবি তোলা হয়েছে।”
এর আগে সাক্ষী আল আমিন জবানবন্দিতে দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন। ১৮ জুলাই রাতে মিরপুর ১০ নম্বর এভিনিউ-১ এলাকায় পপুলার ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের সামনে আন্দোলনের সময় ৮ থেকে ১০ জন পুলিশ তাদের ওপর রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছোড়ে।
ওই সময় তিন থেকে চারজন সাদা পোশাকের লোককেও পুলিশের মধ্যে দেখতে পাওয়ার কথা বলেন আল আমিন।
তিনি বলেন, ওই সময় সিয়াম সর্দার নামে একজনের চোখে গুলি লাগে, যেটি ওই ব্যক্তির মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে তার মাথার এসে লাগে। এতে তার চোখে আঘাত লাগে এবং তিনি মাটিতে পড়ে যান।
জ্ঞান ফেরার পর নিজের শরীর ও টি-শার্টে সিয়াম সর্দারের মাথার মগজ লেগে থাকতে দেখেন বলে জবানবন্দিতে তুলে ধরেন আল আমিন।
পরে সিয়াম সর্দারকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিন ১৯ জুলাই আবার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "ওই সময় ঝুটপট্টির আসিফ, পারভেজ, রুবেলসহ আরও অনেকে নিহত হয়েছেন–এমন খবর তার কাছে আসতে থাকে।"
ওইদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের একটি মোটরসাইকেলের মিছিল থেকে গুলি করা হয় এবং অনেকেই গুলিবিদ্ধ হন বলেও জবানবন্দিতে দাবি করেন তিনি।
৫ অগাস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি কল রেকর্ডে সালমান রহমান ও আনিসুল হকের কথোপকথন শুনেছেন বলেও জবানবন্দিতে বলেন আলামিন।
তার দাবি, ওই কথোপকথনে কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদের শেষ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
গত ১২ জানুয়ারি সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
তাদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেওয়াসহ পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে গণঅভ্যুত্থানকারীদের দমনে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে উসকানি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এখন এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা চলছে।
