জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দৃশ্যত ‘জিম্মিদশায় আবদ্ধ’: টিআইবি
১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর উপলক্ষ্যে এই বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাবে আইনি-প্রাতিষ্ঠানিক-আমলাতান্ত্রিক ইকোসিস্টেমের একচ্ছত্র দখল চর্চার হাতবদলের ফলে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দৃশ্যত জিম্মিদশায় আবদ্ধ বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থান তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। ১৭ অক্টোবর জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর উপলক্ষ্যে এই বিবৃতি দিয়েছে টিআইবি।
টিআইবি মনে করে, রক্তস্নাত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ একটি জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা তথা রাষ্ট্রসংস্কারের যে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক দুষ্টচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল নিয়ে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। অবসান ঘটে শেখ হাসিনার সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এরপর অন্তবর্র্তীকালীন সরকার দেশের হাল ধরার পর সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। পরে সংস্কারের আওতা বাড়িয়ে আরও ৫টি কমিশন গঠন করা হয়।
পাঁচটি কমিশনের ১৬৬ টি সুপারিশ রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পাঠানোর পর ৩৩টি দলের সঙ্গে ৭২টি বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ওই পর্ব শেষে ঐকমত্য ও ভিন্নমতযোগে ৮৬টি সুপারিশ রেখে প্রণয়ন হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় গত বছরের ১৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন; যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
এর ওপর ভিত্তি করেই ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একইদিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে। ভোটে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি।
বিবৃতিতে টিআইবির ভাষ্য, “৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রসংস্কার এজেন্ডা ও জুলাই সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষের শক্তি হওয়া স্বত্ত্বেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করার মত ‘অশুভ অবস্থানের’ মাধ্যমে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এখন সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রসংস্কার ক্ষমতাসীন জোটের একচ্ছত্র ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।”
বিবৃতিতে বিরোধী দলেরও সমালোচনা করে টিআইবি বলেছে, “বিরোধী জোট জনস্বার্থে রাষ্ট্রসংস্কারে সহায়ক ভূমিকার পথ ছেড়ে দলীয় রাজনৈতিক ফায়দার রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলো ও আমলাতন্ত্র শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় এমনটা ঘটেছে।”
অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশই আইনে পরিণত করলেও যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, তার সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, “যেসব অধ্যাদেশ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ছিল, তা রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক শক্তির যোগসাজশে জুলাই আন্দোলনের মূল অভীষ্ট, একটি জবাবদিহি ও দায়বদ্ধ সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
“অন্যদিকে কর্তৃত্ববাদ পতনের বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রধান রাজনৈতিক দলের দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণে ‘এবার আমাদের পালা’র লাগামহীন হাতবদল রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে।”
বিবৃতিতে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “জুলাই সনদ মূলত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলসহ বিগত সময়ের অর্জিত বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখেই প্রণীত হয়েছে এবং সরকারি দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্য স্বত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে তখন ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চার মোহে সরকারি দল যেমন অভিজ্ঞতার বিপরীতমুখী পথ ধরেছে তেমনই বিরোধী জোটও মূলত দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে।”
