সমুদ্রপথে ইতালিগামীরা কেবল ভুক্তভোগী নয়, দায়ীও: রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রো
“আমাদেরকে এই বার্তা দিতে হবে, ‘আপনি কেবল ভুক্তভোগী নন, আপনি যেটা করছেন, তার জন্য দায়ী হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন’।”
বৈধ পথ বাদ দিয়ে যারা দালালকে লাখ লাখ টাকা দিয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপের পথ ধরে, তারা কেবল ‘ভুক্তভোগী’ নয়, বরং দোষী বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো।
সোমবার ঢাকায় এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমি গণমাধ্যমে দেখেছি, আপনারা এসব মানুষদের জন্য ভুক্তভোগী শব্দটা ব্যবহার করেন। আমি মনে করি, তারা ভুক্তভোগী হয়েছে, অনেক বাজে বিষয়ের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর––লিবিয়া, নির্যাতন, সমুদ্রপথে যাত্রা এবং কেউ কেউ মারা যায়, প্রভৃতি।
“নিশ্চিতভাবে তারা ভুক্তভোগী হয়েছে। কিন্তু শুরুতে যখন তারা অবৈধ দালালকে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে অর্থ দিয়েছে, তখন তারা ভুক্তভোগী নয়, নিজেদের ভবিতব্যের জন্য দায়ী। সুতরাং আমাদেরকে এই বার্তা দিতে হবে, ‘আপনি কেবল ভুক্তভোগী নন, আপনি যেটা করছেন, তার জন্য দায়ী হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন’।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘সম্পর্ক শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে ভবিষ্যতের খোঁজ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেন ইতালির রাষ্ট্রদূত।
অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার জন্য ১৫ হাজার ইউরো (প্রায় ২১ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ করার খবর গণমাধ্যমে দেখার কথা তুলে ধরে ওই অর্থ দেশে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “ইতালি বা অন্য কোনো দেশে অবৈধপথে যাওয়ার চেয়ে আপনারা এই অর্থ বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে খরচ করুন।
“আপনারা হয়ত জেনে থাকবেন, কিছু মানুষ অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য ১৫ হাজার ইউরো খরচ করেন। আমি মনে করি, আপনি এই ১৫ হাজার ইউরো দিয়ে বাংলাদেশের যে গ্রামে থাকেন, সেখানে ভালো কিছু করতে পারবেন। দোকান বা এ ধরনের অর্থনৈতিক উদ্যোগে খরচ বা অন্য কোনো বিনিয়োগ করে আপনি বাংলাদেশে ভালো জীবনযাপন করতে পারবেন।”
বাংলাদেশের সরকারি কাগজপত্র অনেক সময় ‘ভুয়া’ প্রমাণিত হওয়ার কথা তুলে ধরে এক্ষেত্রে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেন ইতালির রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, “যখন কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী আসেন, তার প্রত্যাশা থাকে যে, কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা কাগজপত্র সঠিক হবে। তাকে এটা সত্য না মিথ্যা, সে বিষয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”
ভুয়া কাগজপত্র পাওয়া গেলে সেটা দেশের ‘সুনামের জন্য ভালো নয়’ মন্তব্য করে আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, “কোনো একটি সরকারি কাগজ সঠিক হতে পারে, কিন্তু সেটায় এমন কিছু বলা থাকতে পারে, যা মিথ্যা। আমাদের এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেক পুরনো। আমাদের কনস্যুলার অফিসে অনেক বিবাহ সনদ, জন্ম সনদ, তালাকের সনদ আসে।
“অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সনদটা যথাযথ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করেছে। কিন্তু তারা এমন কথা বলছে, যা সত্য নয়।”
ইতালির নিজের স্বার্থেই ‘বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, কেবল ২০২৫ সালে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশ থেকে ইতালির উপকূলে গেছেন। বৈশ্বিকভাবে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
“সংখ্যাটা এখন ১৮ হাজারের বেশি। কেননা প্রত্যেক দিন লিবিয়া থেকে নৌকা যাচ্ছে ইতালিতে, যাতে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। এবং তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করছেন। তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের যোগ্য নন, তবুও আবেদন করছেন। কেননা এটাই থাকার একমাত্র উপায়।”
রাষ্ট্রদূত বলেন, “অবশ্যই আমরা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিয়ে ভাবি। কেননা যদি এই দেশ ব্যর্থ হয়, তাহলে আপনি ভাবতে পারেন কত লোক এই পথ ধরবে?
“আপনারা যেটা করছেন, আমরা সেটাতে আসলেই সমর্থন করি। আপনারা পালাবদল, আধুনিকায়ন এবং সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতালি সব ধরনের উদ্যোগকে সমর্থন জানাচ্ছে। আমরা মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সরকার এবং ফেব্রুয়ারির অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে সমর্থন জানাই।”
আলোচনা অনুষ্ঠানে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা রোজানা রশিদ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইউরোপের দুই অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোশাররফ হোসেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএস মহাপরিচালক, মেজর জেনারেল ইফতেখার আনিস।
