বিজয়ের আনন্দ দিনে ইতিহাসেও চোখ
সন্তানকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা এক মায়ের উপলব্ধি: “এমন একটা জাদুঘরের খুব প্রয়োজন ছিল।”
বিজয় দিবসের বিকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে স্বামী ও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছিলেন মৌ ঘোষ। তার ইচ্ছা, দেশের ইতিহাসটা ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পাক তার ছেলে।
বেসরকারি এই চাকরিজীবী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছেলের জন্যই মূলত এখানে এসেছি। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে জানানোটা জরুরি। কারণ ওরা শুধু বইয়ে পড়ছে, ওদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা কম।”
বিজয়ের মাসে আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বিজয় উৎসব শুরু হয়েছে ৯ ডিসেম্বর। আট দিনের এ উৎসবে সাংস্কৃতিক আয়োজন দেখতে অনেকই ভিড় করেছেন।
তবে ১৬ ডিসেম্বর যারা এসেছেন, তাদের অনেকেই মন ছিল যুদ্ধদিনের ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নানা বয়সী মানুষের পদচারণা ছিল দিনভর।
কেউ এসেছেন জাতীয় পতাকা হাতে, কেউ আবার পতাকায় মোড়া পোশাক গায়ে জড়িয়ে এসেছেন। বিজয় দিবসে বিনামূল্যে দর্শনার্থীরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে দেখার সুযোগ ছিল।
১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচার একটি ভাড়া ভবনে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা। পরে তা স্থানান্তর করা হয় আগারগাঁওয়ের বর্তমান ঠিকানায়। বর্তমানে জাদুঘরের সংগ্রহশালায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ১৫ হাজারের বেশি স্মারক।
জাদুঘরের কাছেই শেরেবাংলা নগরে সালাউদ্দিন আহমেদের বাসা। তিনি দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে জাদুঘরে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প জানাতে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে। এমন একটা জাদুঘরের খুব প্রয়োজন ছিল। এখন তো ইতিহাস বিকৃত হয়ে যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বড় একটা ভূমিকা পালন করছে। বাচ্চাদের গ্যালারি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছি, ওরাও ইতিহাস জানতে পারছে।”
সালাউদ্দিন আহমেদের মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা আহমেদ সিনথিয়াকে দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আলোকচিত্র ও পত্রিকার কাটিং মনোযোগ দিয়ে দেখতে।
ফারিহা বললো, “মুক্তিযুদ্ধের অনেক ছবি দেখলাম। তখনকার পেপারের নিউজ দেখলাম। বই পড়া ছাড়া তো আমরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার তেমন জায়গা পাইনি। এখানে আজকে অনেক কিছু দেখে খুব ভালো লাগছে।”
চিত্রশিল্পী রাসেল রানার বাসা দূরে হওয়ায় আগে কখনও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা হয়নি। চিত্র প্রদর্শনী দেখতে এসে জাদুঘরের গ্যালারিগুলোও ঘুরে দেখেছেন তিনি।
“আমি যতটুকু ঘুরে দেখলাম, এখানে অনেক তথ্য আছে। তারপরও মানুষের সামনে আরো ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। জাদুঘরকে আরও তথ্য সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের আমাদের যুদ্ধদিনের গল্প শোনানোর জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা যেতে পারে।”শেরেবাংলা নগরের হাজেরা খাতুন হিফজুল কুরআন মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মারজিয়া আক্তার মিম তার বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন জাদুঘরে।
“আমাদের বাসা পাশেই। আর এর আগে এখানে এলেও পুরাটা জাদুঘর ঘুরে দেখা হয়নি, তাই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে আজকে এলাম। ঘুরে ঘুরে জাদুঘর দেখছি, ছবি তুলছি।”
বিজয়ের দিনে আলোকচিত্রী সৈয়দ লতিফ হোসেনও এসেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।
তিনি বললেন, “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে এই জাদুঘরের অনেক প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, জাদুঘরটা হতে অনেক বছর লেগে গেছে। এতদিনে ইতিহাস অনেক বিকৃত হয়ে গেছে। অনেক প্রমাণ ধ্বংস হয়ে গেছে।”
নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে আরও তৎপরতা প্রয়োজন মন্তব্য করে সৈয়দ লতিফ বলেন, “বাইরে অনেক ভুল তথ্য প্রচার হচ্ছে, এই জাদুঘরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্যটা জানতে পারছে।
“মুক্তিযুদ্ধে যেসব আলোকচিত্রীরা ছবি তুলেছেন, তাদের ছবিগুলো সংগ্রহ করে সরকারের উচিত বই বের করা। তাহলে আরও অনেক ইতিহাস নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে।”
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মত রাজধানীর অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রেও বিজয় উদযাপন করেছে হাজারো মানুষ। আগারগাঁওয়ের বিমান বাহিনী জাদুঘরে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়।
লালবাগ থেকে দুই ছেলেকে জাদুঘরে নিয়ে আসা আফজাল হোসেন জানান, ঘোরাঘুরির ফাঁকে বাচ্চাদের ঐতিহাসিক কিছু স্মারক দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
“এখন ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে বাচ্চাদের এত ব্যস্ততা যে বের হতে পারে না। আজকের দিনটা ওরা ঘুরে বেড়াতে চাইছে। এখানে তো বিমানবাহিনীর কিছু সংগ্রহ আছে, ওরা সেগুলো দেখলো। ভালোই লাগছে।”
জাদুঘরে আসা মিরপুরের রূপনগর হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন জানায়, সকাল থেকেই মায়ের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছে। দুপুরে এসেছে বিমান বাহিনী জাদুঘরে।
“জাদুঘর ঘুরে দেখলাম, অন্যরকম লেগেছে। মা যুদ্ধের সময়ের বিমান দেখাবে বলেছিল। সেটা দেখলাম।”
