২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

ভোটে এআই দিয়ে অপপ্রচার, ‘সরাসরি কনটেন্ট সরাতে পারে না’ সরকার

আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, অসৎ উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে বিভ্রান্তিমূলক, মানহানিকর বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ।

ভোটে এআই দিয়ে অপপ্রচার, ‘সরাসরি কনটেন্ট সরাতে পারে না’ সরকার
ছবি: এআই

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Jan 2026, 10:10 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:36 PM

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার চালানো হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় বানানো কনটেন্ট দিয়েও। 

‘সাধারণ ভোটারের’ অবয়বে বানানো কোনো কোনো কনটেন্টে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট চাওয়ার পাশাপাশি চলছে নানা অপপ্রচারও।

তবে এ ধরনের কনটেন্ট ‘সরাসরি সরিয়ে ফেলার’ ক্ষমতা সরকারের নেই বলে ভাষ্য ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের। 

তথ্য যাচাইকারী প্ল্যাটফর্ম— ‘ডিসমিসল্যাব’ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

এতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব এআই কনটেন্টে শুধু ভোটের আহ্বানই নয়, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও নেতাদের নিয়ে নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্যও করা হচ্ছে। অনেক ব্যবহারকারী এসব কনটেন্টকে ‘বাস্তব মানুষ’ ভেবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, যা বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে ডিসমিসল্যাব। 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী, অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, মানহানিকর বা বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন বলা হয়, এআই দিয়ে বানানো কনটেন্ট ছড়ানোর একটি ফেইসবুক পেইজ হলো ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’। 

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদন তৈরির সময় পেইজটির ‘ফলোয়ার’ ছিল ৯০ হাজারের বেশি। 

ফেইসবুকের ‘পেইজ ট্রান্সপারেন্সি’ ফিচার অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সাতজন ‘অ্যাডমিন’ এটি পরিচালনা করছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পেইজ থেকে জয়পুরহাট-১ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারমূলক একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়, যেটি এআই দিয়ে বানানো।

প্রথম ভিডিওটি পোস্ট করা হয় ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর। ভিডিওগুলোতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের অবয়বে তৈরি চরিত্রকে ‘দাঁড়ি পাল্লা’ মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।  

ডিসমিসল্যাবের দাবি, এসব ভিডিওতে ‘ডিপফেকের’ একাধিক লক্ষণ স্পষ্ট। যেমন ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে কথার অসামঞ্জস্য, চোখের পলক না ফেলা, বিকৃত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পেছনের পোস্টারে অর্থহীন বাংলা লেখা। 

তথ্য যাচাইয়ের প্ল্যাটফর্মটি বলছে, গুগলের এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল ‘সিন্থআইডি’ ও অন্যান্য শনাক্তকারী টুল ব্যবহার করেও দেখা গেছে, ভিডিওগুলো এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, একই পেইজ থেকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বিরুদ্ধে কটূক্তিমূলক ও ভুয়া দাবি তুলে ধরেও এআই ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, যেগুলো মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে। 

নির্বাচনের সময় এআই দিয়ে তৈরি মানবসদৃশ কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ভোটারদের বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে ডিসমিসল্যাব তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে দিয়েছে। 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এআই যে একটা ‘মাথাব্যাথা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেই আশঙ্কা নির্বাচন কমিশনের শুরু থেকেই ছিল।

গত ২১ অক্টোবর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) এক সেমিনারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, “এআইয়ের অপব্যবহার এখন বৈশ্বিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এর অপব্যবহার রোধে সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নিতে চাই।”

এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে আসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের তরফেও। 

গত বছরের জুলাইয়ে আচরণ বিধিমালার খসড়ার বিষয়ে অংশীজনদের পরামর্শ ও মতামত নিতে গিয়ে এ উদ্বেগের বিষয়টি নজরে আসে ইসির। 

ওই সময়  নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “এআই ব্যবহারের প্রসঙ্গটি প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে না থাকলেও এর অপব্যবহার রোধসহ বেশ কিছু প্রস্তাব দল ও নাগরিকদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি। এসব বিষয় আমরা পর্যালোচনা করছি “

পরে অবশ্য আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারসংক্রান্ত নিয়ম-কানুনে এআইয়ের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়। 

বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট কিংবা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রচার চালাতে পারবেন। তবে প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে। 

অসৎ উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, চেহারা বিকৃত করা, বানোয়াট নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য তৈরি ও প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার এবং নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ভাষা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ইসির।

এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা নিয়মিত বিভিন্ন রিপোর্ট সংগ্রহ করছি এবং সেগুলো বিটিআরসির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করছি। তবে রিপোর্ট করলেই যে সব কনটেন্ট টেকডাউন হয়, তা নয়। 

“বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওগুলো কোন কনটেন্ট, কোন ট্যাগে পড়বে, তা প্ল্যাটফর্ম নিজেই নির্ধারণ করে। অনেক সময় এসব ভিডিও ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ বা ‘স্যাটায়ার’ ক্যাটাগরিতে পড়ে, সেক্ষেত্রে আমাদের টেকডাউনের সরাসরি কোনো সক্ষমতা নেই। আমরা কেবল মেটার কাছে অনুরোধ জানাতে পারি।”

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আরও বলেন, “সব মিলিয়ে বলা যায়, এসব বিষয়ে সরকারের চেষ্টা রয়েছে, কিন্তু সরকারের নিজস্ব টেকডাউন সক্ষমতা নেই। এখানে সরকারকে প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করতেই হয়।”

নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অঙ্গীকারনামা অনুযায়ী আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় সেল খুলেছে নির্বাচন কমিশন। 

ইসির জনসংযোগ শাখার পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অপপ্রচার-সংক্রান্ত অভিযোগ বা তথ্য টেলিফোনের মাধ্যমে সম্বনয় সেলে জানাতে পারবেন সাধারণ নাগরিকরা।  

সমন্বয় সেলে যোগাযোগের টেলিফোন নম্বরগুলো হলো— ০২৫৫০০৭৪৭০, ০২০৫০০৭৪৭১, ০২৫৫০০৭৪৭২, ০২৫৫০০৭৪৭৪ এবং ০২৫৫০০৭৫০৬।

আরও পড়ুন

ভোটে এআইয়ের অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা চাইলেন সিইসি

ভোটে এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ, 'বিশেষজ্ঞ দল' গঠনের পরামর্শ