আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনার আহ্বান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের
পুলিশের নন ক্যাডার সদস্যদের এ সংগঠন বলছে, অপরাধ দমনে পুলিশের ‘দৃঢ় অবস্থান’ বোঝাতে আইজিপি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি অপরাধ দমনে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান বোঝাতে ব্যবহার করেছেন বলে মনে করে পুলিশের নন ক্যাডার সদস্যদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
মঙ্গলবার অ্যাসোসিয়েশনের ফেইসবুক পেইজে এক বিবৃতিতে সংগঠনের এ অবস্থান তুলে ধরা হয়। এর আগে পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আইজিপির বক্তব্যকে ‘সময়োপযোগী আহ্বান’ বলে মন্তব্য করে।
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলুর সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, আইজিপির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া’ এবং পুলিশের আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরা।
“তিনি অপরাধ দমনে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তার বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা বা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার বক্তব্য হিসেবে ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
সোমবার রাজধানীর চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, “আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেইটা করব।”
পুলিশের সমালোচনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমরা (পুলিশ) যদি লাঠিপেটা করি, বলবেন আমরা ফ্যাসিস্ট পুলিশ। আর আমরা যদি নীরবে থাকি, তাহলে বলবেন দুর্বল পুলিশ। আমাকে তো কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। এমপাওয়ার করতে হবে।”
আইজিপির বক্তব্যের পর পুলিশ সদর দপ্তরও ব্যাখ্যা দেয়। সেখানে বলা হয়, তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে শাস্তি দেওয়ার কথা বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি; অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
পুলিশের ওপর হামলার পরিসংখ্যান
পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায়ই সন্ত্রাসী ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের হামলার মুখে পড়তে হয়।
সংগঠনটির দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন আহত হয়েছেন।
“এসব ঘটনা দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকি ও প্রতিকূলতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে,” বলা হয় বিবৃতিতে।
সম্প্রতি গোপালগঞ্জের বেদগ্রাম খেয়াঘাট এলাকায় একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়। ওই ঘটনায় তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
এ ছাড়া গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে হাতকড়াসহ এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ওই ঘটনায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এসব পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের জীবন রক্ষা এবং সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।”
পুলিশ সদস্যরা এসব ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করে সংযম দেখিয়েছেন বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যরা বারবার হামলার শিকার হলে তাদের নিরাপত্তা ও মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে পুলিশের ‘আত্মরক্ষার অধিকার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার’ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আত্মরক্ষার অধিকার ও আইনের শাসনে জোর
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আত্মরক্ষার অধিকার যে স্বীকৃত, সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
এ প্রসঙ্গে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০৬ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১২৭ ও ১২৮ ধারা এবং পুলিশ প্রবিধানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নির্দেশনার কথা বিবৃতিতে তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
দণ্ডবিধির ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায় ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার এবং এর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইজিপির বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
বিবৃতিতে বলা হয়, “কোনো মন্তব্যের বিচ্ছিন্ন অংশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে প্রকৃত বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।”
পুলিশ ও গণমাধ্যম উভয়ই ‘জনস্বার্থে কাজ করে’ মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, “পুলিশ অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর গণমাধ্যম জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়। তাই একে অপরের পেশাগত দায়িত্ব ও বাস্তবতা বোঝা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও দায়িত্ব পালনের ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার পাশাপাশি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও ‘অপরিহার্য’ বলে মনে করে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
বিবৃতির শেষাংশে আইজিপির বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটির নেতারা বলেন, “পুলিশ ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক সহযোগিতা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
