সুপ্রিম কোর্টে কমছে মামলা জট
এবছর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাই কোর্ট বিভাগে এ বছর মামলাজট কমতে শুরু করেছে।
গণসংযোগ শাখার তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলা ছিল ৭ লাখ ৮০০টি। ৩১ অগাস্ট শেষে তা কমে নেমেছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩০টিতে।
আট মাসে নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে ৮৩ হাজার ৭৪৬টি। এর বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৮ হাজার ৭৩২টি মামলা।
চলতি বছরের শুরুতে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ৪১ হাজার ৫৫১টি। প্রথম আট মাসে নতুন ৯ হাজার ১৩৯টি মামলা দায়েরের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি।
৩১ আগস্ট শেষে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫৪টিতে।
১৩২ কর্মদিবসে আপিল বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয় বলে জানিয়েছে গণসংযোগ শাখা।
আপিল বিভাগে ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ৬ হাজার ৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হলেও চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি মামলা।
এদিকে বছরের শুরুতে হাই কোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। প্রথম আট মাসে ৭৪ হাজার ৬০৭টি নতুন মামলা দায়েরের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি।
৩১ অগাস্ট শেষে হাই কোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা দাড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৬টিতে।
প্রথম আট মাসে হাই কোর্টে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা, যা পুরো ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলার চেয়ে ৩১ হাজার ৮৪০টি বেশি।
মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব না হলেও গত ছয় মাসে সুপ্রিম কোর্টে মামলা নিষ্পত্তিতে বেশ অগ্রগতি হয়েছে।”
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করায় অনেক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী গত জুনে নারী ও শিশু নির্যাতন সংশ্লিষ্ট বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ গঠন করেন। এই বেঞ্চ গঠনের পর এ পর্যন্ত ২২টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
বিচারকদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিন্নতা থাকলেও সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিশেষ বেঞ্চ গঠন মামলা জট কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
তবে মামলা জট স্থায়ীভাবে কমাতে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা বন্ধ, আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসা এবং পারিবারিক ও সম্পত্তির বিরোধে বিরোধপূর্ণ সম্পদের মোট মূল্যের একটি অংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আইনি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন রুহুল কুদ্দুস কাজল।
মোট মূল্যের একটি অংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের প্রস্তাব
অ্যাটর্নি জেনারেল মনে করেন, সর্বোচ্চ আদালতে ‘গুটিকয়েক অর্থবিত্তশালীর’ পারিবারিক ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের মামলা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে অন্তরায়।
স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব বা ভাই-বোনের সম্পত্তির বিরোধ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন মামলা চলার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এ ধরনের মামলায় বিরোধপূর্ণ সম্পদের মোট মূল্যের একটি অংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আইনি কাঠামো তৈরি করা উচিত। এতে করে তাদের মধ্যে আপস করার মনোভাব তৈরি হবে।”
দেওয়ানি মামলার জট কমাতে আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসা বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (মিডিয়েশন) চালুর ওপর জোর দেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
পাশাপাশি গ্রাম আদালতের এখতিয়ার বাড়িয়ে ছোটখাট মামলাগুলো সেখানে নিষ্পত্তির পরামর্শ তার।
ভিত্তিহীন মামলা ও ঢালাও আসামি
মামলা জটের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে মন্তব্য করে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন বা মিথ্যা আবেদন আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে এবং রাষ্ট্রপতির তফসিলের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে করা একটি রিটের কথা বলেন। এ ছাড়া আদ্-দীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল সংক্রান্ত কয়েকটি রিট মামলার কথাও বলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, “সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে মিথ্যা, গুজবনির্ভর বা তথ্য-প্রমাণহীন আবেদনের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়।”
এ ধরনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফৌজদারি মামলায় প্রকৃত অপরাধীর পরিবর্তে একসঙ্গে অনেককে আসামি করার প্রবণতা বন্ধ করার ওপরও জোর দেন অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল।
তিনি বলেন, “একটি ঘটনায় অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হলে তাদের জামিন, বিচার ও সাজা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বাড়ে। এতে আদালতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।”
অপরাধের সঙ্গে যার সম্পৃক্ততা রয়েছে, কেবল তাকেই আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ছোটখাট অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো আসামি নির্ধারিত সাজা ভোগ করে থাকলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
দ্রুত বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
দ্রুত বিচার পাওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার মন্তব্য করে করে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “এই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগ বা চেম্বার আদালতে মামলা বিলম্বিত করা বা অযথা সময় নেওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।”
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর থেকে বিচার বিভাগে রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেই।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘বিচ্যুতি’ হলে প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে তিনিই প্রথম প্রতিবাদ করবেন বলেও ভাষ্য অ্যাটর্নি জেনারেলের।
