০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

রাজপথে বাঁচার আকুতি: তিন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় রাব্বী হত্যাকাণ্ড

প্রত্যক্ষদর্শী নিরাপত্তাকর্মীদের ভাষ্য, রাব্বীকে আহত অবস্থায় দৌড়ে আসতে দেখলেও ভয় ও আতঙ্কে তারা কাছে যাননি।

রাজপথে বাঁচার আকুতি: তিন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় রাব্বী হত্যাকাণ্ড
১১ সেপ্টেম্বর ভোরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় স্বপ্ন সুপার শপের কাছে খুন হন রাব্বী।

বিডিনিউজ২৪

মামুন খান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Sep 2026, 11:51 PM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

ফজরের নামাজের পর সড়ক তখন প্রায় ফাঁকা। বুকে হাত দিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে এসে ‘আমারে বাঁচান’ বলে আকুতি জানিয়েছিলেন নাঈম ওরফে রাব্বী। 

প্রায় ১০০ গজ যাওয়ার পর বিদ্যুতের খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান তিনি। এরপর সড়কেই নিথর হয়ে পড়েন ২৬ বছর বয়সী ওই যুবক।

শুক্রবার ভোরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় স্বপ্ন সুপার শপের সামনে এ দৃশ্য দেখেন সেখানে দায়িত্বে থাকা কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী। 

তাদের ভাষ্য, রাব্বীকে আহত অবস্থায় দৌড়ে আসতে দেখলেও ভয় ও আতঙ্কে তারা কাছে যাননি। পরে নামাজ শেষে বেরিয়ে আসা কয়েকজন পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে তার মরদেহ উদ্ধার করে।

রাব্বী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বোন আছমা বেগম রোববার যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মো. রাজু (২৮), আজম খান পাপ্পু (২৭) ও ফারুক (২৮)-এর নাম উল্লেখ করে আরও ৭-৮ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

সেদিন বিকেলে মামলার এজাহার আদালতে পৌঁছালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক তা গ্রহণ করেন। 

বিচারক আগামী ৮ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে যাত্রাবাড়ী থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন জানিয়েছেন।

মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানার এসআই মোহাম্মদ আমীর হোসেনকে।

যোগাযোগ করা হলে আমীর হোসেন বলেন, “রাব্বী নামে এক যুবক হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। শুনেছি, আমাকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, “তদন্তের স্বার্থে যতটুকু প্রয়োজন জানানো হবে। সবেমাত্র তদন্তভার পেয়েছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাব। আসামি গ্রেপ্তার হলে খুনের কারণ জানা যাবে।”

‘আমারে বাঁচান’ বলে দৌড়

ঘটনার তিন দিন আগে স্বপ্ন সুপার শপের নিরাপত্তার দায়িত্বে যোগ দিয়েছিলেন শুক্কুর গাজী। শুক্রবার ভোরে তিনিও দায়িত্বে ছিলেন।

শুক্কুর বলেন, “আমরা ডিউটিতে ছিলাম। দেখি একটা ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। বুক হাত দিয়ে চেপে ধরা। আমরা ভাবছি, অনেকে শয়তানি করে, সেও শয়তানি করছে। বলে, আমারে বাঁচান, আমারে বাঁচান, বাঁচান। পরে বিদ্যুতের খাম্বার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। বুক থেকে তখন হাত সরে যায়। পরে দেখি রক্ত। ভয়ে আমরা ধরিনি। ধরলে আবার কী না কী হয়।”

ছুরিকাঘাতের ঘটনা স্বপ্ন সুপার শপের সামনে ঘটেনি বলে জানান তিনি।

শুক্কুর বলেন, “এখানে এরকম কিছু ঘটলে তো আমরা এগিয়ে যেতাম। সকালে জানতে পারি, ১০০ গজের মত দূরে তাকে বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। সে বাঁচার জন্য হয়ত দৌড় দেয়। তার আশপাশে বা সঙ্গে কাউকে দেখিনি।”

বৃহস্পতিবার রাতে দায়িত্বে যোগ দেওয়া আরেক নিরাপত্তাকর্মী জাহিদুল ইসলামও সেদিন রাব্বীকে আহত অবস্থায় দৌড়ে আসতে দেখেছেন।

তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগে স্বপ্ন সুপার শপের এসির লাইন চুরি হয়। ম্যানেজার স্যার আমাদের বলেছেন, ডিউটিতে থাকাকালে চারপাশটা ঘুরে দেখতে। আমরা দোকানের পেছন থেকে সামনে আসি। দেখি একজন বুকে হাত দিয়ে দৌড়ে আসছে। বলছে, আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান, বাঁচান। পরে সে পড়ে যায়। দেখি বুক থেকে রক্ত ঝরছে।”

জাহিদুল বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, কোনো না কোনো বিপদে পড়ি। এজন্য আর কাছে যাইনি। কয়েকজন মুসল্লি নামাজ পড়ে ফেরার পথে তাকে দেখতে পায়। পুলিশে ফোন দেয়। পরে পুলিশ আসে। কেউ কিন্তু ভয়ে তাকে ধরেনি। যা করার পরে পুলিশ এসে করেছে।”

পাশের আরেক ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রমিজ উদ্দিনও ভোরে রাব্বীকে দৌড়াতে দেখেছিলেন।

তিনি বলেন, “বৃহস্পতিবার রাতে স্বপ্ন সুপার শপ বিল্ডিংয়ের চারতলায় ধোয়ামোছার কাজ করছিলাম। রাত ৩টার সময় কাজ শেষ হয়। এরপর নিজের জায়গায় এসে বসে থাকি। ফজরের আজান দিলে নামাজে যাই। নামাজ শেষ করে ফিরে আসি। 

“গেট খুলব, তখন একটা ছেলে দৌড়ে যায়। এরকম অনেকে দৌড়ে যায়। এজন্য আর তেমন গুরুত্ব দিইনি। একটু ঘুমিয়ে পড়ি। সাড়ে ৬টার দিকে উঠি। পরে জানতে পারি, একটা ছেলে খুন হয়েছে।”

মামলায় যা বলা হয়েছে

মামলার এজাহারে আছমা বেগম বলেছেন, তার ভাই রাব্বী স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া এলাকার গোবিন্দপুরে থাকতেন। বাবার সঙ্গে যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তে ব্যবসার কাজ করতেন।

এজাহারে বলা হয়েছে, রাব্বীর সঙ্গে আসামিদের বিরোধ চলছিল। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাব্বী আড়তে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন। সকাল ৫টার দিকে কাজলার ছনটেক বাঁশপট্টি ১ নম্বর গলিতে পৌঁছালে রাজু, পাপ্পু ও ফারুকসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাকে দাঁড় করান। 

একপর্যায়ে তারা রাব্বীকে মারধর করেন এবং রাজু তার বুকে ছুরিকাঘাত করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, ছুরিকাঘাতে রাব্বী মাটিতে পড়ে যান। তার ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রাব্বীর মৃত্যু হয়।

নাঈম ওরফে রাব্বী।

নাঈম ওরফে রাব্বী।

বিচারের দাবি

মামলার বাদী আছমা বেগম বলেন, “আমার ভাইকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। মামলা করেছি। আশা করছি, পুলিশ দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করবে।”

আসামিদের সঙ্গে রাব্বীর পূর্বপরিচয় ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আসামিরা পূর্বপরিচিত ছিল কি না জানি না। পুলিশ এখন সেটা বের করবে। আমার জানা মতে, ওই এলাকায় (কাজলা) তার পরিচিত কেউ নাই। ও ছোট থেকে শনিরআখড়া এলাকায় বড় হয়েছে।”

আছমার ভাষ্য, আড়তে কাজে যাওয়ার জন্যই সেদিন ভোরে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন রাব্বী। 

তাহলে তিনি কাজলা এলাকায় কীভাবে গেলেন—এ প্রশ্নে আছমা বলেন, “ছনটেক বাঁশপট্টি এলাকা থেকে আসামিরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। না হলে হয়ত ফোন করে নেয়।”

দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রাব্বী ছিলেন সবার ছোট। প্রায় দেড় বছর আগে তার বিয়ে হয়। রাব্বী ও সোনিয়া দম্পতির একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।

আছমা বলেন, “ওর ওয়াইফের বয়স ১৫/১৬ বছর। মেয়েটাকে বিধবা বানালো। সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। যারা আমার ভাইকে হত্যা করেছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”

রাব্বী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না দাবি করে আছমা বলেন, “যারা মার্ডার করছে তারা গুজব ছড়াচ্ছে। হয়ত তাদের গোপন কিছু দেখে ফেলেছিল, এজন্য আমার ভাইকে খুন করেছে। ওরা মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত। এর সাথে আরও অনেকে জড়িত।”

হাতে কাটা দাগ কীসের

রাব্বী মারা যাওয়ার পর তার হাতে কাটা দাগ দেখা গিয়েছিল বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। 

এ বিষয়ে আছমা বলেন, প্রায় ৭-৮ বছর আগে এলাকায় একটি মেয়ের সঙ্গে রাব্বীর সম্পর্কের বিষয়টি পরিবার জানতে পারে। পরে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও মেয়েটির মা তাকে পড়াশোনা শেষ করার কথা বলেন।

আছমার ভাষ্য, ওই সময় রাব্বী বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে নিজের হাতে ‘পোচ’ মেরেছিলেন।

তিনি বলেন, “যারা আমার ভাইকে নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে, আসলে তারাই মাদকের সাথে জড়িত। আমরা আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।”

যা বললেন প্রধান আসামির মা

মামলার প্রধান আসামি রাজুর মা মোসাম্মৎ নাজনীনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। 

নাজনীনের দাবি, মাসখানেক আগে শনিরআখড়া এলাকায় রাব্বী এবং রাসেল নামে একজন এ মামলার আসামি ফারুককে আটক করে মারধর করেছিলেন। পরে ফারুকের স্ত্রীর কাছে ফোন করে টাকা চাওয়া হয় এবং টাকা দেওয়ার পর ফারুককে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নাজনীনের ভাষ্য, গত শুক্রবার ভোরে রাব্বীকে ছুরি মারার ঘটনার পর ফারুক তাকে ফোন করেন এবং রাব্বীকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন।

তিনি বলেন, “ফারুক আমাকে মা বলে ডাকে। বলে, মা ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাও। আমি বাসা থেকে বের হই। রাজুর বাবা আমাকে বলে, দাঁড়াও আমি দেখে আসি। উনি এসে দেখেন ছেলেটা প্রায় যায় যায়। পরে ফিরে গিয়ে বলে, গিয়ে আর কিছু করার নাই। পরে তো মারাই গেল।”

রাজুর তিন বছরের একটি সন্তান রয়েছে জানিয়ে নাজনীন বলেন, “ও তো মরছেই, আরও কয়েকজনকে মাইর‌্যা গেছে। রাজুর বাচ্চাটা সারাদিন বাবা বাবা করে।”

তবে কেন রাব্বীকে হত্যা করা হল, ঠিক কী নিয়ে রাব্বীর সঙ্গে রাজু ও ফারুকদের বিরোধ ছিল, সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি নাজনীন।