০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

স্লিপার বাস: মালিকরা বলছে অনুমোদন আছে, বিআরটিএ বলছে নেই

এ বিষয়ক এক রিট আবেদনের শুনানিতে হাই কোর্ট বলেছে, অনুমোদনহীন বা আইনবহির্ভূত চলা বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধা নেই।

বিডিনিউজ২৪

গোলাম মর্তুজা ও ইমরান নাফিস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 10 Sep 2026, 01:14 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:25 PM

মহাসড়কে স্লিপার বাস নির্বিঘ্নে চলাচলের অনুমতি চেয়ে মালিকপক্ষের করা আবেদনে সাড়া দেয়নি হাই কোর্ট। তবে বাস মালিকরা অনুমোদন পাওয়া ‘স্লিপার বাস’ চলাচলে বাধা দেখছেন না। আর বিআরটিএ বলছে, কোনো ধরনের স্লিপার বাসের অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

বুধবার এ বিষয়ক এক রিট আবদেনের শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট বলেছে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন এবং ২০২২ সালের সড়ক পরিবহন বিধিমালা মেনে বিআরটিএর অনুমোদন পাওয়া বাসগুলোই কেবল রাস্তায় চলতে পারবে। অনুমোদনহীন বা আইনবহির্ভূত চলা বাসের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কোনো বাধা নেই।

এতে করে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ভ্রাম্যমাণ আদালত বা অন্য কোনো কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের চলমান বাস ডাম্পিং, জব্দ কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত রাখতে যে নির্দেশনা চেয়েছিল তাতে আদালতের সায় পায়নি।

এদিন আদালতের এমন আদেশের পর স্লিপার বাসগুলো রাস্তায় চলবে কী না- এমন প্রশ্ন সামনে আসে।

স্লিপার বাস মালিকরা দাবি করছেন, দেশের সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিআরটিএ নিজেই তাদের এসব বাস চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে। হাই কোর্ট যেহেতু অনুমোদন পাওয়া বাস চালাতে বাধা না থাকার কথা বলেছে, সেক্ষেত্রে এগুলো রাস্তায় চালানোতে বাধা দেখছেন না তারা। বুধবার রাতেও আগের মত অনুমোদিত স্লিপার বাস চালাচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, “গাড়ি কেন চালাব না। আমরাতো বৈধ। আমরাতো বিআরটিএ থেকে অনুমোদিত। আবার যেগুলো অনুমোদনবিহীন গাড়ি আমরাতো সবসময় সেটার বিপক্ষে। যে গাড়িগুলোর রেজিস্ট্রেশনের টাকা বিআরটিএ জমা নেয়নি, ফিটনেসের টাকা জমা নেয়নি সেগুলোরও বিপক্ষে আমাদের অবস্থান।

“যেগুলোর রুট পারমিট আছে, বিআটিএ ফিটনেস দিয়েছে সেগুলো কেন বন্ধ হবে।”

তবে বিআরটিএর আইনজীবী রাফিউল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি নেই। প্রচলিত আইনেও এ ধরনের বাস পরিচালনার অনুমোদনের কথা বলা হয়নি। ফলে কেউ স্লিপার বাস পরিচালনা করলে তা অবৈধ হবে।”

সড়কে চলাচলকারী বেশির ভাগ স্লিপার বাসের সরেজমিন তথ্য বলছে, একতলা বাসের অনুমোদন নিয়ে সেটির ওপর দোতলা বাসের আদলে ওপর-নিচ করে বিছানা বসিয়ে স্লিপার বাস বানানো হয়েছে। আসনের ওপর বিছানা বসানো এসব বাসের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছিল।

সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএও বলে আসছে, তারা কোনো স্লিপার বাসের অনুমোদন দিচ্ছে না। একের পর এক দুর্ঘটনার পর চলতি বছর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। সর্বশেষ গত ২৯ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার’ বাসগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

অপরদিকে স্লিপার বাস মালিকদের দাবি, খোদ বিআরটিএ তাদের বাসগুলোর অনুমোদন দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা দুই-তিনটি বাসকে ডাবল ডেকার বা দোতলা বলা যায়। বাকি স্লিপার বাসগুলো উচ্চতায় সাধারণ বাসের মতই। এ খাতে এর মধ্যেই হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বাস বন্ধ করলে মালিকরা পথে বসবেন।

বিআরটিএর আইনজীবী বলছেন, সিঙ্গেল ডেক বাসের অনুমোদন নিয়ে সেটি পরিবর্তন করে ‘স্লিপার বাস’ হিসেবে পরিচালনা করাও আইন অনুযায়ী অবৈধ। বাসটি একতলা বা দ্বিতল–যাই হোক না কেন, ‘স্লিপার’ নামে পরিচালনার সুযোগ নেই।

“যারা ‘স্লিপার বাস’ নামে বাস পরিচালনা করছেন, আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”

এর পাল্টায় স্লিপার বাস মালিক সমিতির সম্পাদক বলছেন, “এই খাতে আমরা হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছি। আমরাতো বাংলাদেশের মানুষ। এখানে বিনিয়োগ করেছি। ট্যাক্স দিচ্ছি, ভ্যাট দিচ্ছি। আমরা চাই একটা নীতিমালা হোক। যার আওতায় এই স্লিপার বাসগুলো চলবে।”

এ বিষয়ক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৯ অগাস্ট হাই কোর্টে দাখিল করা বিআরটিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা কোনো স্লিপার বাসের অনুমোদন দেয়নি।

বিআরটিএর তিন সদস্যের একটি কমিটির করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “এই কমিটির মূল পর্যালোচনার বিষয় ছিল ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন, বিদ্যমান নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি জাতীয় নীতিমালা বা গাইডলাইন প্রণয়ন করা।

“কমিটির পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিআরটিএ হতে অদ্যাবধি কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়নি। বিআরটিএ-এর ডাটাবেজ অনুযায়ী শুধুমাত্র সাধারণ ডাবল-ডেকার (স্লিপার নয়) হিসেবে ৮২৯টি বাসের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোর কোনটাই স্লিপার নয়।”

অননুমোদিত স্লিপার বাসের বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিআরটিএ থেকে সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার পর পরবর্তীতে কিছু সংখ্যক মালিক বডির ধরন পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করে রাস্তায় পরিচালনা করছেন। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রো ও ময়মনসিংহ সিরিজের ৪১টি রূপান্তরিত বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে।

“এ অভিযান চলমান রয়েছে। মালিকরা যখন রূপান্তরিত এসব বাসের ফিটনেস নবায়ন করতে আসেন, তখন তাদের ফিটনেস নবায়ন না করে যানগুলোর রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং সড়কে চলাচলের জন্য এদের কোনো রুট পারমিটও দেওয়া হয় না।”

এছাড়া অননুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও বিআরটিএর ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

কী বলছেন যাত্রীরা

স্লিপার বাসগুলো নিয়ে যাত্রীদের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আহসান হাবিব প্রায় প্রতি সপ্তাহে ঠাকুরগাঁও যান, প্রায়ই ভ্রমণ করেন স্লিপার বাসে। 

তিনি বলছেন, “বাসগুলো আস্তে-ধীরে চালালে একেবারে খারাপ না। যেখানে হানিফ এন্টারপ্রাইজের ভলবো বাসের একটা সিটের ভাড়া ১৮০০ টাকা, নন এসি বাসের ভাড়া ৯০০ টাকা সেখানে ১৪০০ টাকায় এসি বাসে শুয়ে শুয়ে যাওয়া নেহায়েত মন্দ না। তবে বেশিরভাগ সময় বাস চালকরা এই বাসগুলো অতিরিক্ত গতিতে চালাতে গিয়ে এদিক-এদিক করেন, তখন পুরো যাত্রাটা বিভীষিকা হযে ওঠে।”

গত ৪ সেপ্টেম্বর স্লিপার বাসে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন সাংবাদিক আতাউর রহমান। তিনি বলেন, “আমরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একদল শিক্ষার্থী আইকনিক এক্সপ্রেসের দুটো বাসে কুয়াকাটার উদ্দেশে রওনা দিই। কুয়াকাটার ১৩ কিলোমিটার আগে বাসটা মনে হইল এদিক ওদিক কেঁপে উঠলো। এরপর পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে একটা পুকুরে গিয়ে পড়লো।

“পুকুরে পড়ার পরপর ডান পাশের কাঁচটা আমাদের মাথার ছাদ হয়ে গেল। পাশেই একটা মাদ্রাসা ছিল। তার ছাত্র-শিক্ষকেরা দ্রুত ইট-শাবল নিয়ে এসে কাঁচ ভেঙে আমাদের বের না করলে আমরা সবাই সেখানে মারা যেতাম।”

আতাউর বলেন, “আমি জীবনে প্রথম এই বাসে উঠছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা একটা চলন্ত কফিন। তারা স্লিপার বানাইছে ঘুমানোর জন্য। অথচ গাড়িটা যদি কোনো কারণে সজোরে ব্রেক করে তাহলেই যাত্রীদের মাথা সামনে ঠুকে যাওয়ার শঙ্কা প্রবল। এগুলোকে এভাবে চলতে দেওয়া একদম ঠিক না।”

মালিকদের বিনিয়োগের কী হবে

স্লিপার বাস মালিক সমিতির সম্পাদক তৌহিদুল ইসলামের হিসাবে মহাসড়কে এখন ৮০০ থেকে ৮৫০ স্লিপার বাস চলছে।

“একটা বাসের বডি করতে ৪০ লাখ টাকা, চেসিস কিনতে লাগে ৫০ থেকে ৬০ লাখ। এই টাকাটা ঋণ বা কিস্তি হিসেবে নেয় বেশিরভাগ মালিক, যা শোধ করতে করতে দুই কোটির ওপরে চলে যায়। এছাড়া কাউন্টার তৈরিতে প্রচুর বিনিয়োগ আছে। গ্যারেজ, কর্মী মিলিয়ে এই খাতে দেড় হাজার কোটিও বেশি ইনভেস্টমেন্ট আছে। ওভারঅল এখানে অনেক লোকের একটা কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা আছে।”

তিনি বলেন, “গাড়িগুলোর বিষয়ে যে নয়টি আপত্তির জায়গা বলা হয়েছে সেগুলোর সবই সমাধানযোগ্য। গাড়িগুলোতে ইমারজেন্সি এক্সিট যুক্ত করাসহ এই বিষয়গুলো যুক্ত করতে আমাদের খুব বেগ পেতে হবে না। কিন্তু এসব কিছু মিলিয়ে আমরা চাই গাড়িগুলো চলুক।”

আরেকজন বাস মালিক বলেন, “বাবার পেনশনের টাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা এনে আমি গাড়ি নামাইছি। আমাদের প্রত্যেকটা মালিককে ইফাদ কোম্পানি বলছে গাড়ির অনুমোদন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। মূলত তারাই গাড়িগুলোর রেজিস্ট্রেশন নিয়ে দিয়েছে, কারণ কিস্তির সব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তাদের নামেই। এখন সরকার এই সিদ্ধান্ত নিলে আমরা সবাই বিপদে পড়ব।”

স্লিপার বাস কোম্পানি ‘৪৬ এক্সপ্রেস’ এর কর্ণধার আনিসুর রহমান শিল্পী বলছেন, “আমাদের গাড়িগুলোর উচ্চতাও অন্য সাধারণ বাসের মতই। বিআরটিএ থেকেই রেজিস্ট্রেশন নিয়েছি। কাজেই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীইতো আমরা গাড়ি চালাব। আর যারা অবৈধ, যাদের রেজিস্ট্রেশন নেই তাদের বিরুদ্ধে সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক।”