২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিদেশে দেড় বছর আটকা স্বামীর মরদেহ, অপেক্ষা ফুরোয় না মুন্নির

“আল-আমিনের মরদেহ হয়তো শেষ পর্যন্ত দেশে পৌঁছাবে, কিন্তু এই দেড় বছরের অনিশ্চয়তা ও স্বজনদের মানসিক যন্ত্রণার জবাবদিহি কে করবে?”

বিদেশে দেড় বছর আটকা স্বামীর মরদেহ, অপেক্ষা ফুরোয় না মুন্নির

আল আমিন

মাছুম কামাল মাছুম কামাল

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 28 Sep 2026, 01:09 PM

Updated : 28 Sep 2026, 01:27 PM

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ২০২০ সালে কম্বোডিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পাবনার সুজানগর আল-আমিন। পরিবারে সুদিন আনতে গিয়ে পারঘোড়দহ গ্রামের এ যুবকের জীবনই চলে গেছে।

২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল দেশটির সিহানুক সিটিতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। দুর্ঘটনার পর দেড় বছর পেরোলেও এখনো তার মরদেহ বুঝে পাননি স্বজনরা।

মৃত্যুর ১০ দিন বাদে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে আল-আমিনের পরিবার।

দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা শেষে রোববার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩২১ ফ্লাইটে তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল।

স্বামীর মরদেহ গ্রহণ করতে শনিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকেই ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছান স্ত্রী মুন্নি খাতুন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ভগ্ন হৃদয়ে বিমানবন্দর থেকে ফিরতে হয়েছে মুন্নিকে।

বন্যার কারণে ফ্লাইট বাতিল

বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার কারণে ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে।

থাই এয়ারওয়েজ কর্তৃপক্ষও শনিবার এক বার্তায় জানিয়েছে, চলমান বন্যার কারণে ব্যাংকক থেকে পরিচালিত বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই আবার ফ্লাইট চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি।

বিমানবন্দরে দীর্ঘ অপেক্ষার বর্ণনা দিয়ে হতাশাগ্রস্ত মুন্নি খাতুন বলেন, “আমি ভোর রাত ৩টা ৪০ মিনিটে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম।

“সব প্রক্রিয়া শেষ করে বাইরে অপেক্ষা করার সময় প্রবাসী কল্যাণ অফিস থেকে ফোন করে জানানো হয় ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়েছে, আজ বডি পাওয়া যাবে না।”

তিনি বলেন, “ব্যাংককে বন্যার কারণে নাকি ফ্লাইট বন্ধ। পরবর্তীতে আবার কবে মরদেহ আসবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। বলা হয়েছে, পরে জানানো হবে।”

সংকটে পরিবার, বেঁচে থাকার লড়াই

স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন মুন্নি খাতুন। ১৫ ও ৯ বছর বয়সি দুই ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

চরম সংকটে থাকার কথা জানিয়ে মুন্নি বলেন, “সরকারি কোনো সহায়তা বা অনুদান আমরা এখনো পাইনি।

“কোনো উপায় না পেয়ে এখন পাবনায় টিউশনি করে সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানোর চেষ্টা করছি।”

নিহত আল-আমিনের শ্যালক মাসুম খান বলেন, “বর্তমানে বোনকে আমি কিছুটা সাহায্য করি, আর দুলাভাইয়ের জমানো কিছু টাকা ব্যাংকে ছিল, সেখান থেকে আসা লভ্যাংশ দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলছে।”

নথি জটিলতা, কী বলছে কর্তৃপক্ষ

কেন লাশ ফিরতে দেরি হলো, জানতে চাইলে মাসুম খান বলেন, “কম্বোডিয়ায় আমাদের কোনো আত্মীয় বা যোগাযোগ করার মতো লোক ছিল না। দুর্ঘটনার পর মরদেহ কোন হাসপাতালে রাখা হয়েছে বা কী কাগজপত্র লাগবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।”

প্রশাসনিক সহায়তা প্রশ্নে অভিযোগ করে মাসুম বলেন, “আবেদনের পর কোনো নির্দিষ্ট চিঠি বা নির্দেশনা আমাদের দেওয়া হয়নি যে কী কী কাগজপত্র লাগবে।

“আমরা নিজ উদ্যোগেই পাসপোর্ট ও ভিসার কপি জমা দিয়েছিলাম। জানতে পারলে আমরা হয়ত দেওয়ার চেষ্টা করতাম।”

মরদেহ ফেরাতে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক আসাদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিদেশে কেউ মারা গেলে সেখানে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা থাকে। তিনি কোনো অপরাধে যুক্ত ছিলেন কি না বা মৃত্যুর সঠিক কারণ কী—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি), ডেথ সার্টিফিকেট ও ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হয়।”

তিনি বলেন, “কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের সরাসরি কোনো দূতাবাস নেই। তাই থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনা করা হয়।

“মৃতের বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন এবং প্রপার ডকুমেন্টস থাকলে মরদেহ ফিরিয়ে আনতে বাধা থাকার কথা নয়। প্রয়োজনীয় নথি পেলে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এগিয়ে আসে ব্র্যাক মাইগ্রেশন

দীর্ঘ দেড় বছর হিমঘরে থাকার পর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের বিশেষ সহায়তায় আল-আমিনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সব বৈধ ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশ গিয়েও মৃত্যুর পর মরদেহ ফিরতে কেন দেড় বছর সময় লাগল—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্র‍্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একজন কর্মকর্তা।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একজন কর্মী সরকারের সমস্ত নিয়ম মেনে বিদেশে গেলেন, অথচ মৃত্যুর পর তার মরদেহ ফিরতে দেড় বছর লেগে গেল।

“যেখানে দূতাবাস বা কনস্যুলার সেবা সীমিত, সেসব দেশে কর্মী পাঠানোর আগে রাষ্ট্র কতটুকু ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে—সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি।”

তিনি বলেন, “সুরক্ষিত ও নিরাপদ অভিবাসন কেবল বিদেশে যাওয়ার অনুমোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

“বিপদের দিনে আইনি সুরক্ষা, মৃত্যুর পর মরদেহের দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ।”

ব্র্যাকের ওই কর্মকর্তা বলেন, আল-আমিনের মরদেহ হয়তো শেষ পর্যন্ত দেশে পৌঁছাবে, কিন্তু এই দেড় বছরের অনিশ্চয়তা ও স্বজনদের মানসিক যন্ত্রণার জবাবদিহি কে করবে?

ভবিষ্যতের অন্য কোনো পরিবারকে যেন এমন দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক অপেক্ষার দিন গুনতে না হয়, সেজন্য নীতিগত সংস্কার ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।