২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুর ঈদ, সন্তানের হাসিতেই মা-বাবা খুশি

“বাচ্চার কষ্ট দেখে নিজের ভিতরটাও ফেটে যায়,” বলেন এক মা।

হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুর ঈদ, সন্তানের হাসিতেই মা-বাবা খুশি
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের সঙ্গে ঈদ কেটেছে মা-বাবারও।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 May 2026, 11:09 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:43 PM

ফুটফুটে শিশুটির গায়ে র‌্যাশের কালচে দাগ, এক বছর হতে কয়েক দিন বাকি এখনো, হাতে ক্যানুলা লাগানো। 

কোরবানির ঈদের দিন বৃহস্পতিবার মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালের করিডরে মাইশা নামে এ শিশুটিকে কোলে নিয়ে পায়চারি করছিলেন তার বাবা মানিক হোসেন।

বললেন, গেল ২০ মে তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মাইশাকে বেসরকারি একটি হাপসাপালে ভর্তি করা হয়েছিল। দুই দিন পর সেখান থেকে এই সরকারি হাসাতালে আনার পর পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়েছে। 

তিনি বলেন, “মেয়ের হাসিই আমার কাছে ঈদ।”

হাসপাতালের করিডরে মেয়েকে কোলে নিয়ে পায়চারি করতে করতে মানিক বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ বেডে শুয়ে থাকার পর এদিনই প্রথম বাইরে বাবার কোলে ঘুরতে পারছে মাইশা। 

“হামের র‌্যাশ হওয়ার পর থেকে মেয়ে হাসে না। কয়েক দিন আগে বাচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তবে এখন ভালো। আমার মেয়ের হাসিই, আমার কাছে ঈদ। মেয়ে অসুস্থ ছিল, তাই কিছু ভালো লাগছিল না। 

“গতকাল থেকে বাবা বলে ডাকতে পারছে। এটা শুনে আমার সব কিছু ভালো হয়ে গেছে।”

দুপুর আড়াইটায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হামের অধিক সংক্রমণের শঙ্কায় রোগীর অল্প সংখ্যক স্বজন ব্যতীত অন্য সবার হাম ওয়ার্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

তবে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত নার্সরা জানান, বর্তমানে এই হাসপাতালে ১১৫ জন হামের রোগী ভর্তি রয়েছে। ঈদের দিনে সকাল থেকে ১৯ জন রোগী এসেছে, তাদের মধ্যে ১৫ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। 

এদিন হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে মোট ৫৬৫ শিশু।

বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৫১ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের বুলেটিনে বলা হয়েছে, এ সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭১৯ শিশু।

মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি শিশুকে কোলে নিয়ে বাবার পায়চারি। 

মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি শিশুকে কোলে নিয়ে বাবার পায়চারি।

বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সারাদেশে হাম আক্রান্ত হয়ে ৮৮ শিশু মারা গেছে, এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে মারা গেছে ৫২ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৭৭ শিশু, তাদের মধ্যে ১৮৯ জনই ঢাকা বিভাগে মারা গেছে।

‘জীবনে ঈদ আবার আসবে’

ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা এবং ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মানিক বলেন, “চলতি মাসের ২০ তারিখ থেকে মেয়ের গায়ে অনেক জ্বর, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে আমরা ভাটারার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। সেখানে দুদিনে ১৪ হাজার টাকা বিল হয়। পরে হামের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছি।”

এই হাসপাতালের খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখানে খুব বেশি খরচ হয়নি। তবে গত চারদিনে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এখানের খাবার ভালো নয়, তাই বাধ্য হয়ে আমরা যারা আছি, তাদের বাইরে থেকে নিয়ে আসা খাবার খেতে হয়।” 

মানিক বলেন, “মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর থেকে খুব দৌড়ের ওপর আছি। গতকাল থেকে মেয়ে সুস্থ কিছুটা, তাই ভালো লাগছে। এখন আর কোনো চিন্তা নেই।” 

ঈদের সময় হাসপাতালে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার মেয়ে আমার কাছে সব। মেয়ে অসুস্থ্ থাকায় সব কিছু থেকে মন উঠে গেছিল। আর জীবনে ঈদ আবার আসবে, তাই ঈদ নিয়ে মন খারাপ নাই। মেয়ে সুস্থ্ হয়ে উঠছে, এটায় ভালো লাগছে। 

মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি শিশুকে কোলে নিয়ে বাবার পায়চারি। 

মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি শিশুকে কোলে নিয়ে বাবার পায়চারি।

মানিক বলেন, “আমার বড় মামার বাড়ি থেকে একটু আগেই গরুর মাংস, রুটি, পোলাও সব নিয়ে আসছে। এখানে আমি, আমার স্ত্রী আছি। পরিবারের লোকজনও আসছে, তাই কোনো খারাপ লাগা নাই।” 

নেবুলাইজ করার ‘যুদ্ধ’ মায়েদের

আরিফের বয়স মাত্র ৮ মাস, হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে গত পাঁচদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। শ্বাসকষ্ট থাকায় দিনে তিন থেকে চার বার নেবুলাইজ করতে হয়। 

বৃহস্পতিবার বিকালে কথা হয় আরিফের মা শরীফা বেগমের সঙ্গে।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পঞ্চম তলায় শরীফা ছাড়াও হাম আক্রান্ত মায়েরা যারা আছেন, তাদের ঈদ কাটছে বাচ্চাদের নেবুলাইজ করতে করতে।

কেরানীগঞ্জ থেকে আসা শরীফা বলেন, “এক সপ্তাহ আগে বাচ্চার জ্বর ছিল, তারপর র‌্যাশ ওঠে। এখন মাঝে মাঝেই অনেক শ্বাসকষ্ট হয়। তাই দিনে চার বারের মতো ‘গ্যাস’ দিতে হয়। কিন্তু এই ‘গ্যাস’ দেওয়ার মাস্ক লাগালেই বাচ্চার ‘শক্তি বেড়ে যায়’। 

“সারাদিন সেভাবে নড়াচড়া করতে পারে না। কিন্তু গ্যাস দিতে শুরু করলেই বার বার মাস্ক হাত দিয়ে সরাতে চায়।”

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের একাধিক নার্সের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে এ হাসপাতালে হামের ৩১ জন রোগী রয়েছে।

হাম রোগীদের রাখা ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ শিশুর হাতে ক্যানুলা লাগানো। অনেকের মাথার পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। কেউ বাচ্চাকে নেবুলাইজ করছেন আবার কেউ বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশুকে নেবুলাইজ করছেন মা।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশুকে নেবুলাইজ করছেন মা।

১১ মাসের ফারিসের মা সন্ধ্যা আক্তার বলেন, “আমি এই হাসপাতালে চলতি মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত ছিলাম। আগে শুধু বাচ্চার জ্বর ও র‌্যাশ ছিল। কিছুটা ভালো হওয়ায় বাড়িতে চলে গেছিলাম।

“ঈদের আগের দিন থেকে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। তাই বাচ্চাকে নিয়ে আবার হাসপাতালে চলে আসছি। ঈদের চেয়ে বাচ্চার সুস্থ্ থাকা বেশি জরুরি।”

নেবুলাইজ করার সময় শিশুর কষ্ট হয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “এমনিতে হামের কারণে বাচ্চার নড়াচড়া নাই। তবে নেবুলাইজ শুরু করলে বাচ্চা কষ্টে অনেক সময় শরীরে মোচড় দেয়। মনে হয় উঠে দাঁড়াবে। কিন্তু সেটি পারে না। বাচ্চার কষ্ট দেখে নিজের ভিতরটাও ফেটে যায়।”

আরেক শিশুর মা লাকী আক্তার বলেন, “বাচ্চার পাতলা পায়খানা এবং জ্বর ছিল, তাই কলেরা হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। সেখানে তিন দিন থাকার পর নতুন করে র‌্যাশ শুরু হয়। গত পরশু শ্বাসকষ্ট শুরু হলে আমরা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চলে আসি।”

রাজধানীর মধ্যবাড্ডা এলাকার এই বাসিন্দা বলেন, “বাচ্চার যে কষ্ট তাতে আর ঈদ বলে কিছু নাই। কিছু করার নাই। তাই বাধ্য ঈদের মধ্যে বাচ্চার সঙ্গে আমরা হাসপাতালে আছি। 

“কখনো নেবুলাইজ করতে হচ্ছে আবার গতকাল রাতে একবার অক্সিজেনও দিতে হয়েছে।”

এদিকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে চেম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।