এবার মিরপুর ডিওএইচএসে জিয়াউল আহসানের ফ্ল্যাটের সম্পদের তালিকা করছে দুদক
আদালতের আদেশে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসের ওই ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়েছে।
সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের আরেকটি ফ্ল্যাটের সম্পদের তালিকা বা ইনভেন্টরি তৈরির কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আদালতের আদেশে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসের ওই ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে সেখানে ইনভেন্টরি তৈরির কাজ শুরু করেন দুদক কর্মকর্তারা।
দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কমিশনের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ একটি দল সেখানে কাজ করছেন।
এর আগে গত ২০ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে জিয়াউল আহসানের আট ও নয়তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে ইনভেন্টরি তৈরির কাজ করে দুদক। ওই ভবনেই তিনি বসবাস করতেন।
সেখানে বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, পোশাক, শাড়ি, গয়না, শোপিস, ব্যবহার্য সামগ্রী এবং বিভিন্ন নথিপত্রের তালিকা করা হয়।
জব্দ করা সামগ্রীর মধ্যে চার কোটি টাকার একটি চেক, ৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকার মানি রিসিট, একটি হোয়াইট গোল্ডের নেকলেস, দুই জোড়া দুল, বিভিন্ন চুক্তিপত্র এবং মসলিন ও বেনারসি শাড়িসহ নানা সামগ্রী রয়েছে।
জিয়াউল আহসান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা ৩৯টি স্থাবর সম্পত্তি ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল জব্দের আদেশ দেয় আদালত। এর মধ্যে মিরপুর ডিওএইচএসের ওই ফ্ল্যাটও রয়েছে।
জব্দ করা সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো রিসিভার (তত্ত্বাবধায়ক) না থাকায় সেগুলো বেহাত হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে আদালতে আবেদন করেছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম।
ওই আবেদনের পর ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ সম্পত্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের আদেশ দেন।
আদালতের আদেশে জলসিঁড়ির বাড়িসহ কয়েকটি সম্পত্তির রিসিভার হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রয়োজনে তিনি সংশ্লিষ্ট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের দায়িত্ব দিতে পারবেন বলে আদেশে জানানো হয়।
এ ছাড়া সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসকদের বিভিন্ন সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়।
তত্ত্বাবধায়কদের প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে ঢাকার পুলিশ কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেয় আদালত।
আদেশে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়কদের প্রতি দুই মাস অন্তর সম্পত্তির আয়-ব্যয়ের হিসাব আদালতে দাখিল করতে হবে। সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ সার্ভিস চার্জ বাদ দিয়ে তফসিলি ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর বিধি ১৮(গ)(২) অনুযায়ী, সম্পত্তির আয়-ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার তথ্য প্রতি ছয় মাস অন্তর দুদকের মাধ্যমে আদালতে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
আদালতে দেওয়া তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, তদন্ত চলাকালে জিয়াউল আহসান তার মালিকানাধীন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ‘হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন’ বলে তথ্য পাওয়া যায়।
এর ভিত্তিতে আদালত তার স্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয়।
জব্দ করা সম্পদের মধ্যে ঢাকার দক্ষিণখান, পল্লবী, মিরপুর ডিওএইচএস ও আশুলিয়ার জমি ও ফ্ল্যাট; নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি, কায়েতপাড়া ও নাওড়ার বাড়ি, প্লট ও কৃষিজমি; বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জের বাড়ি, বাগানবাড়ি ও জমি; ঝালকাঠির বাড়ি, পুকুর ও কৃষিজমি; পটুয়াখালীর কুয়াকাটার জমি এবং মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের কৃষিজমি রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের তফসিলে ৩৯টি স্থাবর সম্পদের মোট দাম দেখানো হয়েছে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৭ টাকা।
প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ’ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেনের’ অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক।
এক মামলায় দুদকের অভিযোগ, জিয়াউল আহসান তার ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’ ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৪২ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন।
অনুমোদিত সীমা লঙ্ঘন করে নিজের হিসাবে ৫৫ হাজার ডলার জমা রাখার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদক বলছে, জিয়াউল আহসানের নামে থাকা আটটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেন’ হয়েছে। স্ত্রী নুসরাত জাহানের সহযোগিতা ও যোগসাজশে ওই অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ‘স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর’ করেছেন।
অন্য মামলায় নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৮ টাকার ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ’ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার চারটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ‘অস্বাভাবিক লেনদেন’ পাওয়ার কথা বলেছে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিয়াউল আহসান এসব সম্পদ অর্জন করেন। তার সম্পদের মধ্যে পাঁচটি বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট এবং ৩ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমির তথ্য পেয়েছে দুদক।
জিয়াউল আহসান এনটিএমসির মহাপরিচালক ছিলেন। ২০২৪ সালের অগাস্টে তাকে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
পরে ঢাকার নিউ মার্কেট থানায় করা একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
