০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর: প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মিল কতটা

“আমাদের আরও কিছু প্রত্যাশা আছে, বিশেষ করে যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দরকার। তবে তাতে সময় লাগবে। সামাজিকভাবে বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রক্রিয়াটা শুরু করতে হবে,” বলেন একজন বিশ্লেষক।

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর: প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মিল কতটা
৫ অগাস্ট ২০২৪: শেখ হাসিনার সরকারপতনের পর জনতার দখলে গণভবন। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

মাসুম বিল্লাহ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Aug 2026, 11:31 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

সরকারি চাকরিতে ‘কোটা বৈষম্যের’ বিরুদ্ধে আন্দোলনে দমন-পীড়নের পথ ধরে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটাল যে অভ্যুত্থান, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ফারাক নিয়ে পূর্ণ হল তার দুই বছর।

আওয়ামী লীগের সাড়ে পনেরো বছরের শাসনাবসানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাস পেরিয়ে এ বছরই নির্বাচন হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগবিহীন ওই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতে দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। 

সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসন পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এতটা সাফল্য অতীতে কোনো নির্বাচনে পায়নি দলটি।   

অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টার মধ্যে দেশে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছে সরকার।

জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনের শক্তি হিসাবে বড় পরিসরে থাকা বিএনপি ওই সময়ের প্রত্যাশা ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। ৫ অগাস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচিও নিয়েছে।

বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া সেই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার বিপরীতে প্রাপ্তির মিল কতটা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে বিশ্লেষকদের কারো কারো মনে।

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেছেন, প্রত্যাশার পারদ আসলে অনেক উপরে ছিল। কিন্তু বাস্তবতা সে রকম না। 

“আমরা চাচ্ছিলাম পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী একটা পূর্ণ গণতন্ত্রে প্রবেশ করার জন্য সময় লাগে, এটা বাস্তব।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপকের বিচারে, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ‘কর্তৃত্ববাদ থেকে মুক্তি’ পেয়েছে, ‘অনেক দিন পর’ মানুষ ভোট দিতে পেরেছে, একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে।

“নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের একটা বার্তা আমরা পাচ্ছি, কিন্তু ভবিষ্যৎ বলে দেবে, এটা কতটা টেকসই হল। এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর রাখা এবং এটা সক্রিয় করার ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে।”

তার মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মত রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গুম-খুনের অভিযোগ এখন আসছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে ‘জবাবদিহিতাহীন’ হয়ে পড়েছিল, সেখান থেকেও উন্নতি হয়েছে। 

“সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, আমরা একটা সংস্কারের প্রক্রিয়ায় এসেছি। সেই সংস্কার কমিশনের ধারাবাহিকতায় ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১২০টা কার্যকর হয়েছে। বাকিগুলো কার্যকর করার জন্য কমিটি হয়েছে।”

কিন্তু যে বৈষম্যের প্রতিবাদে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের শুরু, সেই বৈষম্য কমানোর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প দেখছেন না এই বিশ্লেষক। 

তিনি বলেন, “আমাদের আরও কিছু প্রত্যাশা আছে, বিশেষ করে যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার দরকার। তবে তাতে সময় লাগবে। সামাজিকভাবে বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রক্রিয়াটা শুরু করতে হবে।”

৫ অগাস্টের বার্ষিকীতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ এর বাণীতে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম।

৫ অগাস্ট ২০২৪: শেখ হাসিনার সরকারপতনের পর জনতার দখলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ছবি: কে এম আসাদ

৫ অগাস্ট ২০২৪: শেখ হাসিনার সরকারপতনের পর জনতার দখলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

তিনি বলেন, “আসুন, মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, বৈষম্যহীন ও সুখী-সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

“মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্বপ্ন, আদর্শ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করি।”

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “আমার বিশ্বাস, রাষ্ট্র শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদান, তাদের পরিবারের কল্যাণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘঠিত সকল হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করবে।”

দিবসের বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ কখনো ভোলেনি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও বাংলাদেশ কখনো ভুলবে না।”

জুলাই অভ্যুত্থানে “হাজারো শহীদের রক্তে স্নাত রাজপথে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল” বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

সরকারপ্রধান বলেন, “রক্তে অর্জিত এই জাতীয় ঐক্য যে কোনো মূল্যে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের মধ্যে নানা ইস্যুতে ভিন্নমত থাকবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। 

“কিন্তু ভিন্ন চিন্তা, ভিন্নমত যাতে শত্রুতায় পর্যবসিত না হয়, সে ব্যাপারে গণতন্ত্রের পক্ষের প্রতিটি রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী, আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে আর কখনোই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদ কায়েম হবে না, কখনোই দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে দেওয়া হবে না। এইসব মৌলিক প্রশ্নে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ঐক্য অটুট আছে এবং থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”

যেভাবে হয়েছিল সরকার পতন

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, শেষমেশ তা গড়েছে সরকার উৎখাতের ইতিহাস।

৩৬ দিনের সেই আন্দোলনে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন সাড়ে ১৫ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করে আসা শেখ হাসিনা।

শুরুতে ওই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরে তা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

এর মধ্যে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোটার বিষয়টির সমাধান হবে আদালতে।

এক প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি পুতিরা (চাকরি) পাবে?”

সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান উঠলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

আন্দোলন দমাতে আলোচনার কোনো পথে না গিয়ে সরাসরি ‘গুলি’, ডিবি অফিসে ধরে এনে নির্যাতনের মত পথগুলো বেছে নেয় তৎকালীন সরকার। 

রক্ত ঝরতে থাকে রাজপথে, মৃত্যু আর আহতের ভিড় বাড়তে থাকে হাসপাতালগুলোতে। সেই সঙ্গে বড় হতে থাকে আন্দোলনের জমায়েত।

রাজধানীর শাহবাগে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ

রাজধানীর শাহবাগে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ

সরকারের তরফে জবাব ছিল- গুলি, টিয়ারশেল আর লাঠি; এককথায় কেবলই বলপ্রয়োগ। প্রথমে ফেইসবুক, পরে ইন্টারনেট বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চায় সরকার। তাতে হিতে বিপরীত হয়।

আন্দোলনে রক্তপাত শুরু হওয়ার ২০ দিনের মধ্যে লাশ আর রক্তের বোঝা মাথায় নিয়ে পতন হয় দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা আর তার অমাত্যরা।

শেখ হাসিনার পতনের দিন ৫ অগাস্ট দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু গণভবনের পাশাপাশি সারাদেশের থানা, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। তিন দিন সরকারবিহীন ছিল বাংলাদেশ। ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

এর পরের মাসখানেক সময় ছিল নানা বিশৃঙ্খলায় ভরা। রাতভর ডাকাত আতঙ্ক, পাড়ায়-মহল্লায় বাসিন্দাদের পাহারা, নানা পক্ষের দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন-বিক্ষোভের চাপে একরকম অচল হয়ে পড়ে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড।

২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট। দেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস। 

২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট। দেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস।

১৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত সেই অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪শ মানুষ নিহত এবং আরও কয়েক হাজার আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে।

১৮ মাস পর নির্বাচন, নতুন সরকারে বিএনপি

জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া, ব্যাপক সংস্কার উদ্যোগ আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় ১৮ মাস কাটিয়ে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যে। 

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।  

২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।

বিএনপির তাদের সঙ্গী করে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে থাকা জোট শরিকদের। আর জামায়াতে সঙ্গী হয় জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা ছাত্র নেতাদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১০ দল।

ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি; ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তারেক রহমান।

বিএনপি সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে পেয়েছে এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতকে; যেখানে বিতর্কের মূল কেন্দ্রে থাকছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি করা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন।

জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে হওয়া গণভোটের রায়ের আলোকে ভোটের সংখ্যানুপাতে সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনের মত বিষয়ে সংবিধান সংশোধন চেয়ে আসছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।

৩ অগাস্ট ২০২৪: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ থেকে তোলা হয় সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবি। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

৩ অগাস্ট ২০২৪: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ থেকে তোলা হয় সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবি

আর বিএনপি জুলাই সনদে দলটির দেওয়া নোট অব ডিসেন্টের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে চাইছে। সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমন্ত্রণ জানানো হলেও ওই কমিটিতে যোগ না দেওয়ার কথা বলেছে জামায়াত-জোট।

২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সন্ত্রাসী বিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো বহাল আছে। আগের মতই পলাতক জীবন-যাপন করছেন দলটির বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ নেতা। 

ফেরার ঘোষণা দিয়ে কয়েকবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা করলেও তা সফল করতে পারেনি আওয়ামী লীগ; বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিলের পর ধরপাকড়ের মুখে পড়েছে দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে ‘শহীদি মার্চ’ আয়োজন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে ‘শহীদি মার্চ’ আয়োজন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

এই দুই বছরে জুলাই হত্যার বিচার শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে, যে আদালত গঠন করা হয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য। 

ইতোমধ্যে জুলাইয়ের ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ কয়েকটি মামলার রায়ও এসেছে। তার একটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।  

ফাঁসির রায় মাথা নিয়ে দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটানো আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশের ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ক্ষমতা হারানোর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তিনি ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ারও পরিকল্পনা করেছেন। 

সরকারের তরফে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ফিরলে তাকে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতা, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ‘ফাঁসির মঞ্চে’ নেওয়া হবে।

ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টার কথা বলছে বিএনপি। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগকে পাল্টে দিলেও জুলাই অভ্যুত্থানকে সামনেই রাখছে বিএনপি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে সরকারের তরফে নানা কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার কথা বলছে ভারত ও বাংলাদেশ; তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই তাকে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যাওয়ার আমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছেন নরেন্দ্র মোদী। 

এরপর বিমসটেক সভাপতি হিসাবে সেপ্টেম্বরে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণও এসেছে দিল্লি থেকে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে এখনও কিছু চূড়ান্ত না হওয়ার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন ঘুরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর মধ্যে ঢাকা সফর করেছেন। সৌদি আরব, তুরস্কসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের কথাই বলছে বিএনপি সরকার।

গণঅভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচি

‘জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বুধবার সারাদেশে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ পালনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বেলা ১২টায় জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

এদিন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবনে প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, উদ্বোধনের দিন জাদুঘরে প্রবেশাধিকার বিশেষ অতিথি ও শহীদ পরিবারের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। বৃহস্পতিবার থেকে সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার সকাল ৬টা ১ মিনিটে শাহবাগে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।

অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেবেন।

দিবসটি উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের সব জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।