১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

মুক্তিযুদ্ধ ও অমীমাংসেয় আত্মপরিচয়ের অসমাপ্য ইতিহাস

সুব্রতশংকর ধর সুব্রতশংকর ধর

Published : 26 Mar 2021, 02:44 AM

Updated : 23 Jun 2022, 03:58 PM


মুক্তিযুদ্ধে কি আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি মীমাংসিত? প্রশ্নটিতে অনেকেরই খটকা লাগতে পারে—এ আবার কেমন প্রশ্ন স্বাধীনতার এত বছর পর? বিশেষত যারা এই কথাটি জোরেশোরেই বলেন যে স্বাধীনতা যুদ্ধই আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই প্রশ্নার্হ। বলে রাখা ভালো এটি কোন প্রশ্ন তোলা নয়। বরং আমাদের ইতিহাসের আলোকে ভবিষ্যৎকে বোঝার চেষ্টা। এই যে অনেকে আজ বাঙলার অখণ্ড উত্তরাধিকারকে, তার স্মৃতিসম্পদকে খারিজ করে এক "ভিন্ন" বাংলাদেশকে আমাদের সামনে এনে হাজির করতে চাইছে, যেখানে আত্মপরিচয় ভৌগোলিক সীমানানির্ভর, ধর্ম-ভিত্তিক, তারও কিন্তু একটা ইতিহাস আছে। অনেকেই যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে অনেকের রাজনৈতিক অবস্থান প্রমাণ করেছে তারা এই মীমাংসা স্বীকার করেন নি। তাদের অনেকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন, রাষ্ট্রের গতিপ্রকৃতি অনেকখানিই বদলে দিয়েছিলেন। তাদের পেছনে সমর্থনও ছিলো—মানুষের, এবং নির্বাচিত ইতিহাসেরও।

বলে রাখা ভালো, সব ইতিহাসই নির্মিত হয় খণ্ডসত্যকে আশ্রয় করে। ইতিহাস অতীতে নির্মিত হয় না, হয় বর্তমানে। অতীতের ঘটনাগুলো বেছে বেছে জোড়া লাগিয়ে, যুক্তির সুতোয় গেঁথে গেঁথে, আমরা এক বা একাধিক ইতিহাস নির্মাণ করি বর্তমানে এসে। ওই যে ঘটনার নির্বাচন আর যুক্তির সুতো, তার অনেক রকমফের হয়। হয়তো তার কোনটিই অবৈধ নয়, নেহায়েতই মিথ্যাচার না করলে। কারণ অতীতে সব উপাদানই থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস নির্মাণের। আমরা আমাদের রাজনৈতিক, মতাদর্শিক এবং অন্যান্য বিচারের আলোকে তার কোন কোনটিকে স্বীকার করি, অন্যগুলোকে নয়। সেই আলোকেই আমরা ইতিহাস বুঝি, আত্মপরিচয় নির্মাণ করি, বিশ্বাস গড়ি।

এখানে এও বলে রাখা ভালো, কোন ইতিহাস, কোন পরিচয় কতখানি বৈধ সে বিচার একেবারেই আপেক্ষিক, একেবারেই রাজনৈতিক। আমার বিশ্বাস আমার কাছে যতখানি বৈধ, অন্যের বিশ্বাস অন্যের কাছেও হয়তো ততখানিই বৈধ। বিশ্বাসের এই বিরোধের মীমাংসা সহজ নয়। অনেক সময় সেই মীমাংসার জন্য আমরা যুদ্ধে যাই। যুদ্ধে জয়ী হলে বলি—সব মিটে গেছে। আসলে কিছুই মেটেনি। আমাদের 'মিটেগেছে' ভাবনাতে আর যাই থাক, নির্মোহতা নেই। থাকা কঠিনও বটে। যুদ্ধে অনেক ত্যাগ থাকে, আবেগ থাকে। তাকে আর নির্মোহভাবে দেখার উপায় থাকে না। অথচ এই নির্মোহতা না থাকলে দৃষ্টি আচ্ছন্ন থাকে। ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাচ্ছে, ঠিক দেখা যায় না। মঞ্চের আলোতে আমরা শুধু মঞ্চটাই দেখি। উইংসের আড়ালে আরও যে অনেক ঘটনা থাকে তা আর দেখি না।

অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখবো, আমাদের আত্মপরিচয় কখনও কোন এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নি। ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলাকে একত্রিত করার আগে এটি কোন অখণ্ড দেশও ছিল না। এই বাঙ্গাল মুলুক এবং তার বিভিন্ন অংশ কত নামেই তো পরিচিত ছিল অতীতে—সমতট, হরিকেল, পুণ্ড্র, গৌড়, বরেন্দ্র, বঙ্গ। সেসব ভৌগোলিক সীমানা এই অঞ্চলের মানুষের একেকটা পরিচয়ও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন সময়। আবার রাজা-সুলতান-সম্রাটদের রাজ্যজয়ের সাথে সাথে রাজ্যের ভৌগোলিক সীমার সাথে সঙ্গতি রেখে সে পরিচয় হয়তো বদেলেছেও। কিন্তু সেই পরিচয়ের সাথে আবেগের সংযোগটি ঊনিশ শতকের আগে তত স্পষ্ট হয় নি। যে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে পরবর্তীকালে আমরা ইতিহাস লিখেছি, নাটক লিখেছি, কবিতা লিখেছি আবেগ মিশিয়ে, তাঁর সমকালে কিন্তু তাঁকে নিয়ে এত আবেগ ছিল বলে জানা যায় না। বরং জানা যায়, ক্লাইভ যখন মাত্র দু'শত সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদে ঢোকেন, রাস্তার পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন যদি একটি করেও ঢিল ছুঁড়ে মারতো, বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। সেটি হয় নি। আমরা দু'শ বছর ইংরেজের দাসত্ব করেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের অপরিণামদর্শিতার কারণে। এমন তো নয় মুর্শিদাবাদে ইট-পাটকেল ছিল না বিশেষ!

ঊনিশ শতকের শেষে এসে বাংলায় আত্মপরিচয়বোধের রাজনৈতিক উন্মেষের আগে কতগুলো ঘটনা ঘটে গেছে, এবং কতগুলো ঘটনা ঘটে নি। সব মিলিয়েই একটা প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে, যা অনেকখানিই নির্ধারণ করে দিয়েছে জাতীয়তাবোধের সীমানা, প্রকৃতি, অনুভব এবং অনুভবের প্রকৃতি। এর মধ্যে একটি বড় ঘটনা হলো ঊনিশ শতকের শুরুতে ইংরেজ পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মসংস্কার আন্দোলন। এর অনেক ভালো ফল ছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু কিছু অনভিপ্রেত, অথবা বলা যায়, কিছু অভাবিত ফলও ছিল যা আমরা দেখি ঊনিশ শতকের শেষ দিকে এসে। এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া শুরুতে সামাজিক এবং পরে রাজনৈতিক ডিসকোর্সের একেবারে কেন্দ্রে এনে বসিয়ে দিলো ধর্মকে। এ প্রায় অনিবার্য ছিল। পাশাপাশি আরেকটি ঘটনা ঘটলো, তাহলো, একটি শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি এবং তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ক্রমবিকাশ। এই মধ্যবিত্ত, শুরুতে শুধুই 'হিন্দু' মধ্যবিত্ত বলে, তার আত্মপরিচয় নির্মাণে সমস্ত উপাদান সংগ্রহ করেছে ধর্ম থেকে, কারণ তার কাছে মনে হয়েছে ধর্ম আক্রান্ত, ঔপনিবেশিক শাসন এবং ক্ষমতার কাছে নিগৃহীত, পর্যুদস্ত। ঔপনিবেশিক শৌর্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে সে খুঁজেছে নিজের শৌর্য। কোথায় পাবে সে শৌর্য? আমরা লক্ষ করি ঊনিশ শতকের শুরুতে জেমস টডের লেখা রাজস্থানের 'এনালস' থেকে সবাই সংগ্রহ করেছেন সেই উপাদান। গিরিশ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রংগলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ –কে নয়? টডের সেই এনালস কতখানি ঐতিহাসিক, তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন আছে। কিন্তু অন্বেষণের বিষয় যখন শৌর্য, তখন ইতিহাস এবং কল্পকাহিনির পার্থক্য একেবারেই গৌণ।

কিন্তু হিন্দুত্বের এই শৌর্যের কাহিনিতে তার প্রতিপক্ষ কে? এর আগের সাতশ' বছর ধরে ভারতবর্ষের শাসক মুসলমান। সব যুদ্ধই তো তাদের বিরুদ্ধে। আত্মপরিচয় নির্মাণের এই প্রক্রিয়াটির অনিবার্যতা নিবিড়ভাবে লক্ষণীয়। ঊনিশ শতকের শেষে বিকাশমান হিন্দু মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নির্মাণে তার যুদ্ধক্ষেত্রটি পূর্ব-নির্ধারিত হয়েই ছিল এবং সেটি ছিল ধর্ম। তার শৌর্যের সন্ধান তাকে অনিবার্যভাবে নিয়ে যায় ইতিহাস এবং কল্পকাহিনির সেইসব উপাদানের দিকে যা তার ধর্মকে মহিমান্বিত করে। কিন্তু এর পার্শ্বফল হলো মুসলিম জনগোষ্ঠি থেকে তার বিচ্ছিন্নতা। যে ধর্মাশ্রিত ইমেজ এবং আইকনগুলো রাজনীতিতে সামনে বাড়িয়ে দেয়া হলো,তা মুসলিম জনগোষ্ঠিকে আরও বিচ্ছিন্ন করলো। ঊনিশ শতকের শেষে 'হিন্দুমেলা' 'শিবাজী উৎসব' -এসবের সাথে মুসলমানদের একাত্ম হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না।

ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে আত্মপরিচয় নির্মাণের এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় উপাদান যেমন 'আমি কে?,' তেমনি আরেকটি বড় উপাদান 'আমি কে নই?' অর্থাৎ আমার 'অপর' (other) কে? হিন্দু মধ্যবিত্ত যেমন তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হয়ে আধুনিক রাষ্ট্রভাবনার আবহে 'আমি কে' এই প্রশ্নের উত্তরে অনিবার্যভাবে গেছে ধর্মের কাছে, তেমনি শাসকের শৌর্যকে 'অপর' ভেবে প্রতিপক্ষ হিসেবে যে শৌর্যকে দাঁড় করাতে চাইলো, তাও ধর্মাশ্রিত। তাতে করে অনিবার্যভাবে সে শুধু শাসককেই প্রতিপক্ষ এবং 'অপর' হিসেবে দাঁড় করালো না, মুসলমানদেরকেও প্রতিপক্ষ এবং 'অপর' বানিয়ে দিলো। বেছে বেছে অতীতের ঘটনার পরম্পরায় তার যে ইতিহাস নির্মাণ করলো এই আত্মপরিচয়কে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে, তা সবার আত্মপরিচয় হলো না, সবার ইতিহাস হলো না।

ঘটনাটি এ'কারণেও ঘটলো যে তখন পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মুসলমান মধ্যবিত্ত/অভিজাত শ্রেণী তেমনভাবে দৃশ্যপটে নেই। মাত্র দু'দশকের ব্যবধানে, বিশ শতকের শুরুতে সেই দৃশ্যপট বদলে গেলো। প্রতিক্রিয়ায় মুসলমান বেছে বেছে হাজির করেছে অতীতের অন্য ঘটনার পরম্পরা, রচনা করেছে অন্য ইতিহাস, যা সমর্থন দেয় তার ধর্মীয় আত্মপরিচয়কে। সেও প্রায় অনিবার্য ছিল। সামগ্রিক রাজনৈতিক-ডিস্কার্সিভ আবহই অনিবার্য করে তোলে আত্মপরিচয় আর ইতিহাসের এই বিবিধ প্রতিদ্বন্দ্বী নির্মাণ। ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ আশিটি বছর উপনিবেশ-বিরোধী আত্মপরিচয়ের রাজনীতি ছিল অমোঘ। যত রকমের আইডেন্টিটি, ততরকমই ইতিহাস। অতীত থেকে বেছে বেছে ঘটনা নিয়ে রচিত খণ্ডিত ইতিহাস। কল্পনা আর অনুভবকে উস্কে দেয়া ইতিহাস। জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ইতিহাস—যে ইতিহাস এক কল্পিত আত্মপরিচয়ের, যাতে সবার আস্থা এবং প্রতীতি জন্মায়, প্রতিদ্বন্দ্বী আইডেন্টিটির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রেরণা যোগায়। এমনি ঘটনা পরম্পরায় উপনিবেশবিরোধী এবং পরস্পর বিরোধী আত্মপরিচয়ের রাজনীতি ঠেলে ধাক্কিয়ে ১৯৪৭ এ এনে হাজির করে আমাদের। এ অনিবার্যই ছিল। ১৯৪৭ এ যা ঘটেছে তার বীজ রোপিত হয়েছিল ঊনিশ শতকের শুরুতে। আমরা ঘটনা পরম্পরার অনিবার্যতার দিকটিতে তাকাইনি। আমরা মনোযোগ দিয়েছি দোষারোপের রাজনীতিতে। আমরা ইতিহাসের 'নায়ক' এবং 'প্রতিনায়ক'দের যতখানি কৃতিত্ব দিই, ততখানি হয়তো তাদের প্রাপ্য নয়, কারণ তারাও সময়ের সৃষ্টি, বিরাজমান রাজনৈতিক আবহেই অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে তাদের ভূমিকা।

সবাই জানি, বাংলার সমর্থন না পেলে পাকিস্তান হতো না। ১৯৪৬-৪৭ এ ধর্মীয় পরিচয় যখন রাজনীতিতে উত্তুঙ্গ, তখন বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সমর্থনটিই ছিল পাকিস্তানের পক্ষে বড় সমর্থন, সে ধর্মের নামেই। এর আগের আশি বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে তার ধর্মাশ্রিত আত্মপরিচয়ের কল্পনা, অনুভব। অন্যান্য উপাদানও যুক্ত হয়েছে তাতে, কিন্তু ধর্মই ছিলো প্রধান। সেই ইতিহাসকেই প্রধান বলে সে গ্রহণ করেছে যা সেই কল্পনাকে বৈধতা দিয়েছে, যা তাকে 'অপর' থেকে আলাদা করেছে। অন্যান্য প্রবণতাও ছিলো ক্ষীণ ধারায়, কিন্তু সেগুলো তখন প্রধান হয়ে উঠতে পারে নি। এই যেমন বাংলা ভাষা বিষয়ক বিতর্কটির সূত্রপাত ১৯৪৭ এর আগেই। অখণ্ড বাংলার কথাও কেউ কেউ ভেবেছেন, কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের তোড়ে তা দাঁড়াতে পারে নি। ভেসে গেছে। অনেকের নিশ্চয়ই তখনও মনে হয়েছিল আত্মপরিচয়ের ব্যাপারটি বুঝি স্থায়ীভাবে মীমাংসিত হয়ে গেল। ইতিহাস বুঝি তার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আর নতুন কোন ইতিহাস হবে না, মুসলমান শুধু মুসলমানই, অন্য কিছু নয়।

কিন্তু আমরা দেখলাম এক বছর যেতে না যেতেই পূর্ব বাংলার মানুষের কল্পনায় ভিন্ন এক জাতিসত্তার বোধ ক্রমশ প্রধান হয়ে উঠছে। দেখা গেল সেই জাতিবোধেরও ইতিহাস আছে। যে অভিজাত শ্রেণী ছিল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে, তাদের অনেকেই নিজেদের বাংলায় বহিরাগত বলে গর্ববোধ করতো এবং স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানদের অবজ্ঞা করতো। তাদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষের একটি ধারা বিশ শতকের শুরু থেকেই ছিল। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম 'সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমতঃ ১৯০১-১৯৩০' গ্রন্থে দেখিয়েছেন 'নূর-অল-ইমান,' 'নবনূর,' 'ইসলাম-প্রচারক,' 'কোহিনুর,' 'আল-এছলাম,' 'বঙ্গনূর,' সহ অনেক সাময়িকপত্রে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এই মুসলিম অভিজাত শ্রেণির বাঙালি বিদ্বেষ নিয়ে, তাদের উর্দু ভাষা চর্চার হাস্যকরতা নিয়ে। অপেক্ষাকৃত অনভিজাত বাঙালি মুসলমানের মধ্যে আত্মপরিচয়ের এই অন্তঃসলিলা ধারাটিও ছিল যদিও তা সামনে আসতে পারেনি দীর্ঘকাল। পাকিস্তান যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে চাইলো না, তখন বাঙালি মুসলমান অভিমান ভরে তার এত দিনের জানা ইতিহাস থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য ইতিহাসের সন্ধান করলো। মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে তার বাঙালি পরিচয় ক্রমশ প্রধান হয়ে উঠতে থাকলো। সেই পরিচয়কে বৈধতা দেয়ার জন্য অতীতের গর্ভ থেকে বেছে বেছে ঘটনাগুলো গেঁথে গেঁথে রচনা করলো নতুন ইতিহাস, সেই ইতিহাস অখণ্ড বাঙালিত্বের ইতিহাস, সদ্যোজাত পাকিস্তানের প্রতিদ্বন্দ্বী ডিসকোর্স। যে ইতিহাস বছর দুই আগেও ছিল প্রান্তিক, বাঙালি মুসলমানের অধিকারের রাজনীতিকে দুর্বল করার অনুষঙ্গ, তাই হয়ে উঠলো তার ক্ষমতায়নের হাতিয়ার। তার সম্প্রদায় ভাবনার প্রকৃতি গেল বদলে।

এ'ব্যাপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উক্তিটি করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ৩১শে ডিসেম্বর, ১৯৪৮ এ। তিনি বলেছিলেন, "আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুংগি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।"

অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার এই বোধ এবং তার ধারক প্রতিদ্বন্দ্বী ডিসকোর্স খুব দ্রুতই পরিবর্তন এনেছিল রাজনীতিতে। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র দুই বছরের মধ্যে ১৯৪৯ এ মুসলিম লীগ তার সমস্ত শক্তি দিয়েও টাংগাইলের উপনির্বাচনে জয়ী হতে পারলো না এই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতির বিরুদ্ধে। এতটাই ভড়কে গেল মুসলিম লীগ যে পরের পাঁচ বছর নির্বাচনের পথই মাড়ালো না। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের ইতিহাস সেই অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধের যেমন সম্মুখযাত্রার ইতিহাস, তেমনি তখনকার সময়ের রাজনীতির সমর্থনে অতীতকে ঢেলে সাজানোরও ইতিহাস। বলতেই হবে সেও চয়িত ঘটনাসমূহকে রাজনৈতিক যুক্তির সুতোয় গেঁথে গেঁথে সাজানো এক নির্বাচিত ইতিহাস। যে ইতিহাস বৃহত্তর জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে, সংগঠিত করে একটা যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এনে হাজির করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এসে তার পরিণতি বাঙালির জন্য একটি নতুন জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে।

কিন্তু গল্পটি কি এখানে এসেই শেষ হয়? অতীত কিন্তু তা বলে না। ঊনিশ শতকের আশির দশকে যখন হিন্দু জাতীয়তাবোধের উদ্ভব, তখনও হয়তো কেউ কেউ ভেবেছিল উপনিবেশিতের আইডেন্টিটি নির্মাণে তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। খুব শীঘ্রই তা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। সাতচল্লিশে এসে পাকিস্তান সৃষ্টির মুহূর্তেও হয়তো ভাবা হয়েছিল আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে একটা স্থায়ী সমাধান হলো। তাতো হয় নি। তাহলে একাত্তরের পরই বা তাকে মীমাংসিত ধরে নেবো কেন? বিশেষত রাজনীতি যখন এখনও আইডেন্টিটি নির্ভর? আবার একটু পিছন ফিরে দেখা যাক।

পাকিস্তানের চব্বিশ বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়। বাঙালি জাতিসত্তা নির্মাণের উপাদানগুলো অতীতের ভাণ্ডারে ছিল, কিন্তু তার প্রতিপক্ষ যে ধর্মপরিচয়-ভিত্তিক জাতীয়তা যা কিনা সদ্য একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির কৃতিত্বের অধিকারী, তার সাথে যুদ্ধটা সহজ ছিল না। অনেকের মনোভূমে তখন সদ্যোজাত পাকিস্তান নিয়ে অনেক স্বপ্ন, অনেক মোহ। একেবারে শুরুতেই ভাষা আন্দোলন এবং ক্রমশ দৃশ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রকট চিত্র সেই মোহভঙ্গে সহায়ক হয়েছে বটে, সবার অনুভবে এত কম সময়ে বাঙালিত্ব প্রবল হয়ে উঠতে পারে নি। টানাপড়েন ছিলই। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের কথাই ধরা যাক।

ভাষা আন্দোলনে তাঁদের জোরালো সমর্থন এবং অনেকের সরাসরি অংশগ্রহণ সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে আমরা অনেককেই দোদুল্যমানতায় ভুগতে দেখেছি। রবীন্দ্র-বিতর্কে বিপ্রতীপ ভূমিকায় দেখা গেছে অনেককেই। প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপর সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেছেন কেউ কেউ। ষাটের দশকের শুরুতে সামরিক শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় পাকিস্তান লেখক সংঘ গঠনে যুক্ত হন নি, এমন সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী বিরল। তবে সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের পূর্বাপর রাজনৈতিক অবস্থান বিচার করলে মানতে হয় যে কারও কারও অংশগ্রহণ ছিল কৌশলগত, কারও কারও ছিল বিশ্বাস-নির্ভর। মোরশেদ শফিউল হাসানের গ্রন্থ "স্বাধীনতার পটভূমিঃ ১৯৬০ দশক" লেখক সংঘের বিভিন্ন সম্মেলন থেকে আমাদের সেই অবস্থানগুলোর কথা জানায়। দেখা যায়, আনিসুজ্জামান লেখক সংঘের সম্মেলনে জানাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথের ঐতিহ্যে আমাদের উত্তরাধিকারের কথা, রফিকুল ইসলাম নজরুলকে দেখতে চাইছেন তাঁর সমগ্রতায়, খণ্ডিতভাবে শুধু মুসলমানের জন্য নয়, আবার সৈয়দ আলী আহসান জোর দিচ্ছেন কোরানের আলোতে পাকিস্তানের জাতীয় সাহিত্য নির্মাণের উপর। সেই সৈয়দ আলী আহসান আবার মুক্তিযুদ্ধেও গেছেন একাত্তরে এসে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অনেকে এসে হাজির হয়েছেন বিভিন্ন পথ ধরে। কেউ অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের বোধে উদ্দীপিত হয়ে, কেউ সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে, কেউ তার ধর্মপরিচয়কেই সামনে রেখে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদ হিসেবে, আবার কেউ দ্রুত পরিবর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় বাধ্য হয়ে, ঠিক বিশ্বাস থেকে নয়। এই সব প্রবণতারই ছিল নিজস্ব ইতিহাস। কোন প্রবণতাই অন্য প্রবণতাকে, অন্য ইতিহাসকে সম্পূর্ণত খারিজ করতে পারে নি ২৪ বছরে। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ সমস্ত প্রবণতাকেই ধারণ করে সামনে এগিয়েছে।

সেই সব প্রবণতাই, সেই সব ইতিহাসই আবার সামনে এসেছে স্বাধীন বাংলাদেশে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ডিসকোর্স হিসেবে। ইতিহাসের সন্ধানে কেউ গেছে চর্যাপদে ভুসুকপাদের লেখায় তার পরিচয় খুঁজতে, যেখানে ভুসুকপাদ লিখেছেন "আজি ভুসুক বঙ্গালী ভইলি," আর কেউ ইতিহাসের সূচনা দেখেছেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ে। সবই তো আছে অতীতের ভাণ্ডারে। প্রশ্ন হলো কে কি নেবে সেই ভাণ্ডার থেকে এবং কে কীভাবে সাজাবে ইতিহাস। এ তো গেল 'আমি কে' এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান এবং বিবিধ পথ ধরে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর গল্প। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আইডেন্টিটি নির্মাণে আরও একটি বড় উপাদান 'আমি কে নই।' পাকিস্তানের চব্বিশ বছর পাকিস্তান ছিল সেই 'অপর।' সেই পাকিস্তান এখন বারো শ মাইল দূরে। আর বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে আছে ভারত। সেই ভারতই রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নির্মাণে প্রধান 'অপর।' ধর্মাশ্রয়ী আত্মপরিচয় নির্মাণে এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে সামনে ঠেলে দেয়ার ক্ষেত্রে এই ভারত 'অপর' হিসেবে খুবই কেজো। কারণ, ভারতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রতিবেশী হিসেবে তার অন্যায় দাপট, এবং ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান। এই অনুকূল জলোবাতাসে বাংলাদেশে ধর্মাশ্রিত আইডেন্টিটির উত্থান অনিবার্য। সেই আইডেন্টিটির রাজনৈতিক শক্তি কতখানি, আমরা হয়তো ঠিকঠাক জানি না। কখনও কখনও সে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু চোখের অন্তরালে সেই শক্তির মাপজোখ কেউ করেনি। একাত্তরের জন্ম মুহূর্তের সেই বাংলাদেশ আর আছে কি নেই–তাও আমরা জানি না। দেশ যতখানি ভৌগোলিক সীমানায়, তার চেয়ে বেশি মানুষের মনোভূমে।

বেনেডিক্ট এন্ডারসন নেশনকে দেখেছেন Imagined Community হিসেবে (Anderson, Benedict, Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, London: Verso, 2016)। কল্পনাতেই তার নির্মাণ। এন্ডারসন বলেছেন ১৯৮৩ তে। কথাটি ভিন্নভাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন অনেক আগেই তার "নেশন কী?" প্রবন্ধে ১৯১৫ সালে। ফরাসী চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনাঁর অনুসরণে তিনি বলেছিলেন, "নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। সেই দুটি জিনিস বস্তুত একই। তাহার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা—যে অখণ্ড উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্ত ভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা।" স্পষ্টতই সেই প্রাচীন স্মৃতিসম্পদে আর অভিন্ন বিশ্বাস নেই। উত্তরাধিকারও আর অখণ্ড বলে স্বীকৃত নয়। অনেক পরে এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হওয়ার পর ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ এ সংসদে বলেছিলেন, "ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন—সকল কিছুর সাথে একটা জিনিস রয়েছে। সেটা হলো অনুভূতি……জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর" (আহমদ, মহিউদ্দিন, বেলা-অবেলা: বাংলাদেশ ১৯৭২-৭৫, ঢাকা: বাতিঘর)। সেই অনুভূতির জন্ম ও নিবাস মানুষের মনোভূমে। অনুভব, স্মৃতিসম্পদ আর ইতিহাসে বিশ্বাস যখন ভিন্ন, তখন যুদ্ধটা চলতেই থাকে। একাত্তরে এসে তার শেষ হয় না।