ধূসর মৃত্যুর মুখ
শেষ যে-বার দেখা হলো, বললাম, "স্যার, একবার বেড়াতে আসুন না আমাদের ওখানে।" চোখে স্নেহভাজনের অনুনয়, তাই হয়তো একটু অপ্রস্তুত হয়েই বললেন, "আর কি পারবো, এই বয়সে, এই শরীরে?" ধ্বক করে লেগেছিল কথাটা। কোথায় যেন চলে-যাওয়ার গোপন একটা বার্তা আছে "আর-কি-পারবো"তে। নিজের অজান্তেই সংগোপনে তাঁর মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে স্নেহঘন দৃষ্টিকে এড়িয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম তাঁকে। কিছু বলিনি। কিন্তু মনের ভিতর ভয়টা জমে থাকলো। সেই তিনি সত্যি চলে গেলেন।
বয়েস হয়েছিল তাঁর। আমার কাছে বাঙালির পূর্ণতম বেঁচে থাকার মাপকাঠি রবীন্দ্রনাথের জীবন। সেই অর্থে একটি পূর্ণ জীবনই তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু যদি তাঁর জীবনকে দেখি তাঁর কাছ থেকে আমাদের প্রাপ্তির নিরিখে, আমাদের আকাঙ্ক্ষার নিরিখে, মনে হয়, আরও কিছুদিন থেকে গেলেও পারতেন!
যারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র, সন্দেহ নেই, তাঁদের কাছে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, একটি আকরগ্রন্থ। সাহিত্যের ছাত্র নই। তবুও পড়েছি। পড়েছি আমার নিজের গবেষণার জন্যই, সাহিত্যের পাঠ হিসেবে নয়, বরং সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে—মুসলিম মননশীলতার বিকাশের ইতিহাসটি বোঝার জন্য, পরিবর্তমান রাষ্ট্রের এবং এই ভূখণ্ডের মানুষের আত্মপরিচয় বোধের বিকাশ এবং বিবর্তনের গতিরেখাটি চেনার জন্য। এমন সরস গবেষণা গ্রন্থ খুব বেশি নেই আমাদের। অতীতের একটি কালপর্বকে ধারণ করেও এটি অতীতচারী নয়। ১৭৫৭ থেকে ১৯১৮-এই কালপর্বের ওপর লেখা এই গ্রন্থ, যা ১৯৬৪ সালে প্রথম প্রকাশিত। এই গ্রন্থ যেন অতীত থেকে হাত ধরে আমাদের সামনের দিকে নিয়ে যায়, ভবিষ্যতের পথে। সেই পথেই হেঁটেছিল বাংলাদেশ। এই পথপরিক্রমার শেষ প্রান্তে ছিল নতুন আত্মপরিচয়ের স্পর্ধিত মূর্ত রূপ—বাঙালির নিজের রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
যে ইতিহাস তিনি তুলে এনেছেন অতীতের গর্ভ থেকে, তার পরবর্তী অংশের তিনি একাধারে সাক্ষী এবং নির্মাতা। অবশ্যই নির্মাণের কাজটি তিনি একা করেননি। কিন্তু তিনি ছিলেন। জোরেশোরেই। সাতচল্লিশোত্তর প্রতিটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মর্মস্থলে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। একজন আনিসুজ্জামানের মননের বিকাশ, আত্মপরিচয়ের উপলমুখরিত চিন্তাস্রোত কীভাবে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং একই সাথে তাকে প্রভাবিত করে, সেই বিস্ময়কর ইতিহাস আমরা জানি তাঁর তিনটি অনন্য আত্মজৈবনিক গ্রন্থ কাল নিরবধি, আমার একাত্তর, এবং বিপুলা পৃথিবী থেকে। আমরা এও দেখি একজন আনিসুজ্জামানের নির্মাণ আর বাংলাদেশের নির্মাণ একাকার হয়ে মিশে আছে। তাঁর অন্য সব গ্রন্থের আলোচনা আপাতত মুলতবি থাক। আমি বলবো তাঁর মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, কাল নিরবধি, আমার একাত্তর, এবং বিপুলা পৃথিবী একটি সঙ্গত ইতিহাস পরম্পরা আমাদের উপহার দেয়। একজন আনিসুজ্জামান তাঁর জন্মেরও আগে থেকে ইতিহাস বাহিত হয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হন তাঁর ইতিহাস দর্শন এবং বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে, এবং আমাদের সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। এই প্রক্রিয়ায় আমরাও আনিসুজ্জামান হয়ে উঠতে থাকি—চিন্তায়, মননে, বিশ্বাসে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
সম্ভবত কাল নিরবধি এবং বিপুলা পৃথিবী নাম দুটির প্রেরণা তিনি নিয়েছিলেন অষ্টম শতকের কবি ও নাট্যকার ভবভূতির একটা অভিমানসঞ্জাত লেখা থেকে। ভবভূতি অভিমানভরে লিখেছিলেন, কাল নিরবধি এবং পৃথিবী বিপুল। তার বিশ্বাস ছিল তাঁর কালে এবং তাঁর জনপদে তাঁর লেখার মূল্যায়ন হয়নি। তিনি জানিয়ে রেখেছিলেন, এই নিরবধি কালের কোন এক সময়ে এবং এই বিপুলা পৃথিবীর কোথাও হয়তো তাঁর সৃষ্টির সঠিক মূল্য বুঝবে কেউ। জানি না অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও সেই সংশয়ে ভুগেছিলেন কিনা। গ্রন্থ দুটির রচনাকালের অনেকখানি সময় রাজনৈতিক কারণে আমাদের ইতিহাস সংশয়বিদ্ধ, তার পুনর্বিন্যাস ও পুনর্লিখনের তোড়জোড় চলছে ক্ষমতাদর্পী মহলে। যে আত্মপরিচয়ের নির্মাণে উদ্বোধনে তাঁর হার্দিক এবং সক্রিয় উপস্থিতি, তাকে প্রশ্নার্হ করে তুলতে দেখেছেন তিনি। তাই অভিমান হয়তো অসঙ্গত নয়। ভেবেছিলাম আবার দেখা হলে তাঁকে জিজ্ঞেস করবো, তা আর হলো না! সে অভিমানবশে হোক বা না হোক, যা তিনি লিখে গেছেন এই দুই গ্রন্থে তা এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে অনন্ত কাল, এই বিপুলা পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে থাকা বাঙালির কাছে।
পাকিস্তানের মাত্র ২৪ বছর এই আত্মপরিচয় ভাঙাগড়ার এবং তার একটি নিশ্চিত দেহসৌষ্ঠব পাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় নয়। ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠন, সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা সংস্কারের উদযোগ, লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠা, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিক উদযাপনের উদযোগ এবং তার বিরোধিতা, রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ করা, একই সাথে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বাঙালি জাতীয়তাবোধের স্ফূর্তি এবং আন্দোলনের ক্রমবিকাশ—ঝড়ের গতিতে এসেছে সব মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে। সহজ ছিল না অনেকের জন্য এই দ্রুত পরিবর্তমান সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আবহের সাথে মানিয়ে নেয়া। টানাপোড়েন ছিলই।
আমরা দেখি, আনিসুজ্জামানের চারপাশের বিশিষ্ট জনেরা অনেকেই সেই টানাপোড়েনে ভুগছেন। কেউ কেউ উল্টোস্রোতে ভেসে গেছেন, কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো দূরদৃষ্টির অভাবে। আঁকড়ে থাকতে চেয়েছেন পুরোনো বিশ্বাস, হার মেনেছেন প্রলোভনের কাছে, কেউ অনেক পরে এসে যোগ দিয়েছেন সম্মুখ স্রোতে। স্বাধীনতা-উত্তর যুগে দেখেছি তাদের কেউ কেউ আবার ফিরেও গেছেন পুরোনো বিশ্বাসে। আর ছিলেন আনিসুজ্জামানের মত যারা– অবিচল, স্থিতসংকল্প। শুরু থেকেই যারা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে স্থির করে নিয়েছেন তাঁদের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ভূমিকার স্থানাঙ্ক। কাল নিরবধি বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরে সেই ইতিহাস।
সেই ইতিহাস আনিসুজ্জামান দেখেন ভেতর থেকে। আমাদেরকেও দেখতে সাহায্য করেন। দেখতে দেখতে মনে হতে থাকে আমিও বুঝি এক আনিসুজ্জামান, কলা ভবনের গেটে (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব অংশ) আমি দাঁড়িয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২তে, দেখছি ছোট ছোট দল বেরিয়ে যাচ্ছে ১৪৪ ধারা ভেঙে… পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে প্রবন্ধ পাঠ করছি এপ্রিল ১৯৫৪তে, রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পালনের মিটিং হচ্ছে মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের অফিস কক্ষে, অন্যান্য শিক্ষকের সাথে আমিও উপস্থিত…১৯৬৪এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখছি চোখের সামনে… আসে ঊনসত্তুর, একাত্তর… এক প্রক্ষিপ্ত আমি, কল্পিত আমি, এই উজ্জ্বল-আয়োজন-কাছ-থেকে-দেখতে-চাওয়া আমি সমাবৃত হই আনিসুজ্জামানে। কাল নিরবধি হয়ে ওঠে আমারই আকাঙ্ক্ষার "আমি"র ইতিহাস। নিজেরই অজান্তে আমি নির্মিত হতে থাকি। আমার কৃতজ্ঞতা বাড়ে আনিসুজ্জামানের প্রতি।
কাল নিরবধি-তে বর্ণিত আরেকটি ছোট্ট ঘটনা আমাকে ভীষণভাবে সচকিত করে মনে করিয়ে দেয় আমার শৈশব। ঊনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানের কিছুদিন পর ১৯৬৯ এর ৩রা জুন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন আনিসুজ্জামান। শেখ মুজিব তাঁকে দেখতে এলেন তাঁর বাসায়। আনিসুজ্জামানের শিশুকন্যা রুচি কাছ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে কানে কানে জিজ্ঞেস করলো, "আসাদ আসেনি?" রুচি মিছিল থেকে জেনেছে শেখ মুজিবের নাম। একই সময়ে সে শুনেছে আসাদের নাম। মনে পড়লো, আমার সদ্য শৈশব শেষে আমিও শেখ মুজিব এবং আসাদের নাম জেনেছিলাম মিছিল থেকেই। গল্পটি তখন আমার হয়ে যায়।
বিপুলা পৃথিবী-তে তিনি লিখেছেন তাঁর স্বাধীনতা-উত্তরকালের জীবন কথা, রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁর সম্পৃক্তির কথা। সংবিধান প্রণয়ন, শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ একটি সদ্যজাত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজে তাঁর অংশগ্রহণের কথা। অকপটে স্বীকার করেছেন তাঁর বিবিধ সীমাবদ্ধতার কথাও। কিছু বেদনার কথাও। ইতিহাসের নায়করা ছিলেন তাঁর কাছের মানুষ। তিনি কাছ থেকে দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের নায়ক তাজউদ্দীনকে, যিনি ক্রমশ কষ্টে আর অভিমানে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। নায়ক তো তিনি নিজেও। তাঁর চোখ দিয়ে আমরা রাষ্ট্রকে দেখি, সেই সব মানুষদের দেখি। রাষ্ট্রের অনেক কাজে তিনি যেমন যুক্ত হয়েছিলেন, তেমনি অনেক দায়িত্ব তিনি নিতে রাজি হননি অধ্যাপনা আর জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর নিষ্কম্প পক্ষপাতের কারণেই, এমন কি সেই অনুরোধ যখন এসেছে স্বয়ং শেখ মুজিবের কাছ থেকে। বাংলা গদ্যের ওপর তাঁর কাজটি সম্ভবই হয়েছে শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব নিতে তিনি রাজি হননি বলে।
বাংলা গদ্যের ইতিহাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের আরেকটি বড় কাজের জায়গা। ১৯৭৪-৭৫ এ তাঁর মৌলিক গবেষণার বিষয় ছিল বাংলা গদ্য। তাঁর আঠারো শতকের বাংলা চিঠি এবং পুরোনো বাংলা গদ্য-তে তিনি দেখিয়েছেন বাংলা গদ্যের ইতিহাস যথেষ্টই পুরোনো, যে সমস্ত তথাকথিত তাত্ত্বিক গদ্য নির্মাণের একটি সাম্প্রদায়িক বয়ান হাজির করেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পণ্ডিতদের প্রাধান্যের কথা বলে, তাদের কারও প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ না করেই আনিসুজ্জামান তাদের বয়ানের ইতিহাসহীনতাকে খারিজ করেন। পুরোনো বাংলা গদ্য-তে তিনি নির্যাসটুকু তুলে এনেছেন বাংলা গদ্যের ইতিহাসের, এবং ওই স্বল্প পরিসরেই অনেক অর্থহীন বিতর্কের জবাবও তিনি দিয়েছেন বিতার্কিকের মত করে নয়, বরং তাঁর সহজাত পাণ্ডিত্য দিয়ে, এবং সেই পাণ্ডিত্যের সম্ভ্রম বজায় রেখে।
তাঁকে দেখে সবসময় মনে হতো একজন সম্পূর্ণ মানুষ। এই তিমিরাচ্ছন্ন সময়ে তিনি ছিলেন আলোর এক ঝর্ণাধারা। রুচিতে, বাকসংযমে, পরিমিতিবোধে, স্নিগ্ধব্যক্তিত্বে, স্নেহময় সম্বোধনে, স্বভাবমাধুর্যে প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই জেনেছি তিনি আমার আত্মজন। আত্মার একটি অংশ বুঝি আজ আর নেই।
