২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ

‘পথের দাবী’ লেখার আগে বিপ্লবের সপক্ষে রচিত সাহিত্য পাঠ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। ম্যাক্সিম গোর্কির মাসহ অন্য লেখাও পাঠ করছেন এবং নোট নিয়েছেন। এপর্বে শরৎচন্দ্র ব্যক্তি হিসেবে অনেক সংহত ও সংযমী। তাঁর চিন্তা ও ভাবনা বিবর্তিত হয়েছে।

স্বপন নাথ স্বপন নাথ

Published : 24 Aug 2026, 04:14 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:00 PM

সকলেই জানেন ও বলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [১৮৭৬-১৯৩৮] অসামান্য এক কথাশিল্পী। বাংলাভাষী বাঙালি  কেউ অল্পশিক্ষিত হলেও শরৎচন্দ্রের লেখা পড়েননি, এমন ব্যক্তি কমই আছেন। এখনো সেভাবেই শরৎসাহিত্যের পাঠকপ্রিয়তা বিস্ময়কর। এর কারণ শরৎচন্দ্র ভাষায় অঙ্কন করেছেন বাঙালির চিরচেনা জীবনাচরণ, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আনন্দ-বেদনা, শোষণ ও বঞ্চনা। বস্তুত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্যে চিত্রিত করেছেন ভারতবর্ষের সামাজিক বৈষম্য, বর্ণবাদ। বিশেষত বাঙালি সমাজের জীবনাচার। লিখেছেন সাধারণ মানুষের ওপর ধর্মীয় বাতাবরণে পরিচালিত স্বার্থান্ধ শ্রেণির নির্যাতন। তিনি এর প্রতিবাদও করেছেন। এসব সমস্যার বিপক্ষে সামাজিক উদ্যোগও গ্রহণ করেছেন কখনো। 

সকলেই তাঁর লেখার সাথে পরিচিত। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক মিলে তাঁর সাহিত্য কম নয়; বহুলপ্রজ ও বিচিত্র। সাহিত্যের বাইরে তাঁর বহুবর্ণিল ব্যক্তি জীবন বাঙালি সমাজকে আকৃষ্ট করে। অনেকের কৌতূহলও ছিল এবং আছে। প্রথাগত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর বর্ণ ও শ্রেণিচ্যুতি বাঙালি পাঠক এবং সাধারণ্যে জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। সমকালে শরৎচন্দ্রের জীবন যাপনের ধরন তুল্য ব্যক্তি ও লেখক দ্বিতীয় কেউ নেই। অনেকেই বলে থাকেন শরৎচন্দ্র ছিলেন জাত বোহেমিয়ান। 

বলাবাহুল্য যে, হিন্দিভাষী খ্যাতিমান লেখক বিষ্ণু প্রভাকর [১৯১২-২০০৯] নিবিষ্ট গবেষকের মতো শরৎচন্দ্রের জীবনী আওয়ারা মসিহা [১৯৭৪] রচনা করেছেন হিন্দি ভাষায়। যা ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ [১৯৮৭] নামে বাংলা ভাষান্তর করেন দেবলীনা ব্যানার্জি কেজরিওয়াল। এ জীবনীগ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে, শরৎচন্দ্রের জীবনী বাংলা ভাষায় এভাবে লেখা হয়নি। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক স্মরণীয় অনেক গবেষণাকর্ম রয়েছে। প্রসঙ্গত বিষ্ণু প্রভাকর সম্পর্কে সামান্য তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর জন্ম দিল্লির আগ্রার কাছে মিরানপুরে। তিনি পেশায় সাংবাদিক হলেও ছিলেন লেখক; লেখালেখি করেছেন মূলত হিন্দি ভাষায়। বিচিত্র তাঁর লেখালেখি; এবং পরিসরও বিশাল। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, গল্প, নাটক, ভ্রমণ, প্রবন্ধ, সমাজসংস্কারমূলক রচনা, স্মৃতিকথা, শিশুসাহিত্য এবং বিবিধ। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনার মধ্যে আওয়ারা মসিহা অন্যতম একটি। তিনি অর্জন করেছেন জনশ্রুত কয়েকটি পুরস্কার। যা হলো : সোভিয়েত ল্যান্ড পুরস্কার ১৯৭৬, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ১৯৯৩, রাহুল সাংকৃত্যায়ন পুরস্কার ১৯৯৫, পদ্মভূষণ ২০০৪। মূলত শ্রীকান্ত উপন্যাসের হিন্দি অনুবাদ পাঠ করে বিষ্ণু প্রভাকর শরৎচন্দ্রের জীবনের প্রতি আগ্রহী হন। সেই থেকে তাঁর তথ্য সংগ্রহের যাত্রা শুরু। 

আমাদের আলোচ্য আওয়ারা মসিহা গ্রন্থটিও পৃরস্কৃত হয়। হিন্দি ও বাংলা নামকরণ বিষয়ে অনুবাদক জানাচ্ছেন, আওয়ারা মসীহা হিন্দীতে শরতের সার্থক নামকরণ। আওয়ারা অর্থাৎ ভবঘুরে আর মসীহা মানে ত্রাণকর্তা বা দেবদূত। শরৎচন্দ্র সম্পর্কে এই দুটি শব্দ হিন্দীতে সঠিক হলেও, বাংলায় এই নাম বেমানান। বর্তমান সাহিত্য ও সমাজের ব্যাপক পরিসরে শরৎচন্দ্রের সুদূরপ্রসারী ভূমিকার জন্য শরৎচন্দ্রকে ‘ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ’ বলাই শোভন ও সংগত।’’ 

এ গ্রন্থ তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত : দিশাহারা, দিশান্বেষণ ও দিশান্ত। প্রথম দুটো অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ছন্নছাড়া এক জীবন এবং তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে বর্মা(মিয়ানমার) থেকে কলকাতায় ফিরে আসার পরের স্থিত জীবন। মূলত শরৎচন্দ্রের মতো ক্রম ছুটে চলা এক জীবনের তথ্য সংগ্রহ ও জীবনী নির্মাণ করা বেশ জটিল। তবুও তিনি সফল হয়েছেন শুধু অধ্যবসায়ের কারণে। বিষ্ণু প্রভাকরের ভাষায় সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল, শরৎচন্দ্রের জীবনের সাথে জুড়ে দেওয়া নিন্দা ও ঘৃণা। সমকালের অধিকাংশ বন্ধু, স্বজন, পরিচিতজনদের কাছে তিনি ছিলেন অপছন্দের ব্যক্তি। ফলে তথ্য সংগ্রহে করতে গেলে বারবার তাঁকে হোঁচট খেতে হয়েছে। বিচিত্র ভাষ্যে সকলেই তথ্য প্রদানে সংশয়ী করে তুলেছিল। কয়েকজন বিষ্ণুকে বলেছিলেন, তারা নিজেরাই শরতের জীবনী লিখবেন। কিন্তু কেউ লিখেননি। অন্যদিকে শরৎচন্দ্র নিজেও আড্ডা, সাক্ষাতে, মূল কথা না বলে, নিজের সম্পর্কে বানোয়াট গল্প বলতেন। ফলত তাঁর জীবদ্দশায়ও নানা কষ্টকল্পিত গল্প প্রচারিত হয়েছে। অনেকের কাছে তিনি নিজেকে স্পষ্ট করতেন না। ছিল রহস্যঘেরা এক জীবন। বিষ্ণু এ গ্রন্থ রচনায় অভিজ্ঞতার কিছু সংকেত উল্লেখ করেছেন এর প্রথম সংস্করণের ভূমিকায়। যাতে অল্প হলেও শরৎকথা নয়, বাঙালি জীবনাচারের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য আমরা বুঝে নিতে পারি। ‘‘শরৎচন্দ্রের সমকালীন এমন কয়েকজন লোক আমি পেয়েছিলাম, যাঁরা সত্যিই তাঁকে ঘৃণা করতেন। রেঙ্গুনের এক ভদ্রলোক আমায় বলেছিলেন, ‘তিনি এক স্ত্রীলোকের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর কাছে খুব কম লোকই যেত।... গুজব ও রটনায় ভারাক্রান্ত তাঁর জীবনকে বোঝা তো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু যাঁরা তাঁর কাছের মানুষ ছিলেন, তাঁরাই কি তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন? নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তাঁর খুব কাছেই থেকেছেন এমন কিছু লোকও তাঁর সম্বন্ধে পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন।... এ কথা সত্যি যে, মানুষ শরৎচন্দ্রের প্রকৃতি ছিল অত্যন্ত জটিল। সাধারণ কথাবার্তার সময়ে তিনি মনের ভাবটি সযত্নে গোপন করে তার বদলে মনগড়া কাহিনী গড়ে দিতেন।’’ [ছন্নছাড়া মহাপ্রাণ : xiii]  

বিষ্ণু এ বই লিখতে তিনটি প্রধান সূত্র উল্লেখ করেছেন, প্রথমত : শরৎচন্দ্রের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার; দ্বিতীয়ত : তাঁর সম্পর্কে লিখিত স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ; তৃতীয়ত : শরৎচন্দ্রের ভ্রমণ, সাহিত্যকর্ম ও উপস্থাপিত স্থান এবং ভূগোল। শরৎচন্দ্রের ভেতরে ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ, দ্রোহ; কিন্তু তিনি তা প্রকাশ্যে বলতেন না। হিউমার, শ্লেষ, তামাশায় নিজেকে আড়াল করে ফেলতেন। তবে লেখায় তাঁর মনোভঙ্গি অংশত প্রকাশ করেছেন। সেই সময় অনেকেই তা বুঝতে পারেনি। তাঁর লেখায় সেই বিদ্রোহ ও সংস্কারের অভিমত রেখেছেন কী কারণে। এর পেছনে ছিল সামাজিক অসংগতি এবং অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিজীবনের ওপর এর অভিঘাত। 

বাঙালি ও ভারতবর্ষীয় সমাজের চিত্রায়ন ও এর সংস্কারে সারাজীবন তিনি ভূমিকা রেখেছেন। দারিদ্র্য, সামাজিক ও বর্ণবৈষম্যসহ নানা আচারিকতার বিপক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। যদিও সমূহ দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, স্ববিরোধিতা তাঁর ব্যক্তি-আচরণের মধ্যেও ছিল। স্বাভাবিকভাবে শরৎচন্দ্রের সমকাল, রাজনীতি, সমাজনীতি সম্পর্কে পাঠক যেমন সচেতন, তেমনি বিষ্ণু প্রভাকরও উল্লেখ করেছেন। যখন তাঁর জন্ম হয় তখন ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে মুখর। নতুন নতুন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন, সংস্থার প্রতিষ্ঠা; একইসাথে সমাজ সংস্কারের উদ্যোগ সমাজকে আন্দোলিত করে। এ প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করি রামমোহন, বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের ভূমিকা। ঊনিশ শতকীয় নবজাগরণের প্রতিক্রিয়া সমাজকে প্রভাবিত করে এবং এর প্রমাণ শরৎচন্দ্র নিজে। 

এর ফলে শরৎচন্দ্রের পরিবারেও বিভাজন ছিল; বিষ্ণু প্রভাকর উল্লেখ করেছেন। ‘... আর এই পুরোনো দলের দলনেতা ছিলেন শরতের দাদামশাই কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। শাস্ত্রসম্মত আচার বিচার তাঁর প্রিয় ছিল। অত্যন্ত নিয়মের সঙ্গে তিনি তা পালনও করতেন। কিন্তু ক্রমশ ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে স্বাধীন চিন্তাধারার যুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রাচীন আচার সংহিতা ক্রমশ প্রভাবহীন হয়ে পড়ছিল। নতুনের রূপও তেমন স্পষ্ট ছিল না। অরাজকতার এই আবহাওয়ায় বাঙালী সমাজ দুভাগে ভাগ হয়ে যায়।’ [পৃ ৩১]   

আমরা বিভিন্ন লেখায় আগেও জেনেছি শরৎচন্দ্র ব্যক্তিজীবনে ছিলেন খুব অস্থির ও ভ্রমণপ্রিয়। আয় রোজগারের কোনো কাজেই তাঁর স্থিরতা ছিল না। তিনি উপেক্ষা করেছেন সেকালের শাস্ত্র ও আচারকেন্দ্রিক প্রচলিত রীতিনীতি। ফলে পরিবার ও সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নই ছিলেন। প্রভাকরের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘শরৎ সুন্দর সুপুরুষ ছিল না। চোখ দুটি ছাড়া তার আর কোন বিশেষত্ব ছিল না। চোখের দিকে চাইলে আর কেউ মুখ ফেরাতে পারত না। শ্যাম রঙ, রুগ্ন শরীর কিন্তু দৌড়বার সময় পা-দুটো যেন হরিণের ক্ষিপ্রতা পেত। বেড়ালের মতো অনায়াসে গাছে চড়তেও পারত। তীক্ষ্ন মেধা, কিন্তু কঠোর অনুশাসনের গণ্ডির মধ্যে হাঁফিয়ে উঠে অবাধ্যতা ও উচ্ছৃঙ্খলতার পথ বেছে নিত।’ [পৃ ১৭] আবার কৈশোরে তিনি মামার বাড়ি থাকতেন। কিন্তু ওই আচরণের কারণে মামার বাড়ির কেউ তাকে সহ্য করতে পারেনি। 

তাঁর বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যে গল্প, নিন্দা প্রচলিত ছিল। তবে তথাকথিত মন্দ কথার অভিযোগসমূহ বিষ্ণু প্রভাকর খতিয়ে দেখেছেন। শরৎচন্দ্রের মধ্যে যে ছুটে চলা ও নান্দনিকতার প্রতি ঝোঁক; এ ঝোঁক ছিল তাঁর পিতা মতিলালের মধ্যেও। যেন তা পরম্পরায় লাভ করেছেন। বিষ্ণু প্রভাকরের তথ্যে পাওয়া গেল শরৎচন্দ্র বাল্যকৈশোর থেকেই ছিলেন সংস্কৃতি, বই, নিসর্গ ও প্রাণীবান্ধব ব্যক্তি। মনে মনে হয়তো তাঁর শপথ ছিল, ‘আমি সূর্য গঙ্গা, হিমালয়কে সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞা করছি সারাজীবন সৌন্দর্যের উপাসনা করব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরদিন লড়াই করব, কখনো কোনো ছোট কাজ করব না।’ 

বিষ্ণু যে বিশেষ দিকটার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং প্রতিবেদনে খানিকটা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ শরৎচন্দ্রের জীবনের বাস্তবতা ও  তাঁর কথাসাহিত্যের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক এবং বিনিময় প্রসঙ্গ। ফলে এই ব্যক্তি জীবন ও বহির্বাস্তবতার এক আলোকসামান্য অন্তর্বয়ন লক্ষ করি। বাস্তবতা থেকে লেখক শরৎকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। অর্থাৎ গল্প বা উপন্যাস যা-ই বলি, লেখক যেন ঘটনার সঙ্গেই থাকেন। কারণ তাঁর জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে তাঁর সাহিত্যে। এসব প্রতিবেদন শুধু লেখকের কল্পনাপ্রসূত সৃষ্ট নয়। ফলত, ‘সব মানুষেরই কিছু-না-কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, কিন্তু তাকে অনুভূতিতে রূপান্তরিত করার সূক্ষ্ন পর্যবেক্ষক দৃষ্টি ছাড়া কোনো যথার্থ শিল্পীর জন্ম হতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই শরতের সে দৃষ্টি ছিল।’ [পৃ ১০২]

এভাবে প্রতিবেশ ও সামাজিক ঘটনার স্বতঃস্ফূর্ত সাক্ষী হয়ে উঠেন তিনি। এ অভিজ্ঞতা তাঁকে কথাশিল্পী শরৎ হিসেবে তৈরি করেছে। কখনো তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বা কখনো তিনি ছিলেন ঘটনারই এক কুশীলব। যা তাঁর উপন্যাস শ্রীকান্ত, শুভদা, চরিত্রহীন, পল্লীসমাজ, শেষপ্রশ্ন, পথের দাবী ও গল্পগুলোর পরিচর্যায় লক্ষ করি। বিষ্ণু প্রভাকর লিখেছেন, ‘‘উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’- এর আধারটুকু বোধ হয় এই ঘটনাগুলোই। এগুলোই উপন্যাসটি রচনার উপাদান যোগায়।’’ [পৃ ২১]  

ব্যক্তি অভিজ্ঞতার উপকরণ থেকে গড়ে তুলেছেন তাঁর সাহিত্যের সৌধ। এ ছাড়াও যাত্রা, থিয়েটার দেখার অভ্যাস ছিল শরতের। তরুণ বন্ধু রাজুর সাথে বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যেতেন অবাধে। যেভাবে তিনি বেশ্যালয়ে যাওয়া-আসা শুরু করেন। এ অভ্যাস প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মনসুরগঞ্জের সম্পদশালী নর্তকী কালীদাসীর সাথে তার পরিচয় হয়। কালীদাসীর কণ্ঠে কীর্তন ও নাচে তিনি আকৃষ্ট হন। মনে করা হয় কালীদাসীর কাছে শরৎচন্দ্র প্রথম মনোদৈহিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন। কিন্তু বিষ্ণু প্রভাকর বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। এ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি লুকিয়ে দেবদাস উপন্যাস লেখা শুরু করেন। ‘চন্দ্রমুখীর উপাদান জুটিয়েছে একটি নর্তকী। শরৎচন্দ্র স্বয়ং নর্তকীটির ঋণ স্বীকার করেছেন।’ [পৃ ৩৪]  

এক পর্যায়ে তিনি স্যাটেলমেন্ট বিভাগে কর্মচারী পদে যোগদান করেন। ওই সময় নাচগানের আসরে প্রায়ই যাতায়াত করতেন। একদিন পাটনা থেকে আগত এক সুন্দরী বাঈজির নাচগান দেখতে গেলেন অনেকের সাথে। আবার একদিন হঠাৎ তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন। তখন অভিযোগ ওঠে বাঈজির সাথে সম্পর্কের কারণে নাকি তিনি চাকরি হারিয়েছেন। আসলে চাকরি থেকে তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছিলেন। তবে প্রভাকর বলেছেন, ‘তবুও কুসঙ্গ, স্বেচ্ছাচারিতা, দুঃসাহসপূর্ণ প্রবৃত্তির তাড়না সত্ত্বেও তার সাহিত্য সাধনা মৌন মন্থর গতিতে এগুচ্ছিল।’ [পৃ ৩৯]  প্রভাকর সন্দেহ করেছেন, বাঈজির প্রসঙ্গ তাঁর বানানো গল্প হতে পারে। কারণ তিনি অনেক বানোয়াট কথা প্রচার করতেন। তখন তাঁর সম্পর্কে মিথজাতীয় গল্প প্রচলন শুরু হয়। 

এসব কাজে যতটুকু না তাঁর অংশগ্রহণ ছিল এর চেয়ে বেশি অমূলক, ভিত্তিহীন নিন্দা, অপবাদ, গুজব তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত ছিল। তখন বিচিত্র রকমের বদনাম ছড়ানো হয়েছে। স্বীকার করতে হয় যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করেছেন। বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছেন; হয়তো অভিজ্ঞতা অর্জন ও তাঁর গল্পের প্রয়োজনে। কিন্তু কখনো তিনি জীবন ও সাধনাকে অবহেলা করেননি। বিষ্ণু প্রভাকর এ বিষয়ে বলেছেন, ‘শিল্পীর জীবন তার নিজস্ব ধন। তাকে কটাক্ষ করে কী লাভ? শিল্পীর মূল্যায়ন তার শিল্পের দ্বারাই করা উচিত। কিন্তু মানুষ স্বভাবতই ছিদ্রান্বেষী। দোষ খুঁজে না পেলেও দোষ গড়ে নিতে তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি। নীরব থেকে অখ্যাতিকে বাড়তে দেবার লাঞ্চনা ও অপমানের প্রতিবাদে শরৎচন্দ্র কখনও কিছু বলেননি।’ [পৃ ১৫৩]

একবার নামহীন লেখা বড়দিদি ভারতী পত্রিকায় পাঠালে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর ভাষা সম্পর্কে  মুগ্ধতার সাথে প্রশংসা করেছেন। মন্দির গল্পটির জন্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার পেলেও নীরব ছিলেন।  কোনো আবেগ প্রকাশ করেননি। শরৎচন্দ্র বারবার প্রেমে পড়েছেন। এতে তার কোনো যাচাই-বাছাই ছিল না- সেকি নর্তকী, বাঈজি, নাকি অন্য কেউ। এরকম নীরদা নামে একজনের প্রতি প্রেমের কারণে তাঁকে পুলিশের পিটুনিও খেতে হয়েছে। জাত  বোহেমিয়ান বলে কোথাও ঠাঁই হয়নি। কখনো প্রতারিত হয়েছেন; বারবার মানুষের কাছ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ জন্য অনেকেই বলেছেন ভবঘুরে শ্রীকান্ত যেন তিনি নিজে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় তিনি রেঙ্গুনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। বিষ্ণু লিখেছেন, ‘শ্রীকান্তের মতোই ছোট্ট একটা লোহার ট্রাঙ্ক, যৎসামান্য বিছানা-পত্র নিয়ে শরৎ যখন জাহাজ-ঘাটায় পৌঁছল, তখন লোকে লোকারণ্য।’ [পৃ ৫৭] 

রেঙ্গুনে পাবলিক ওয়ার্কস একাউন্টস-এ ৫০ টাকা বেতনের চাকরিতে যোগদান করেন। তবে সেখানে তিনি বেশিদিন কাজ করেননি। অবসরে রেঙ্গুনস্থ বাঙালিদের সোশ্যাল ক্লাবে তিনি গান পরিবেশন করতেন। শরতের গান শুনে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে শিবনাথ কি শরতের প্রতিচ্ছবি? এ পর্যায়ে শেষ প্রশ্ন উপন্যাসের শিবনাথ চরিত্রের মিল পাওয়া গিয়েছে শরৎচন্দ্রের সাথে। বিষ্ণুরও জিজ্ঞাসা হলো, ‘শিবনাথের মদ্যপায়ী মাতাল হওয়ার জন্য কলেজ থেকে বিতাড়িত, বেশ্যালয়েও সে মাঝে মাঝে যায়, তথাপি সে উঁচুদরের গায়ক, তাই এতগুলি সব গুণ থাকা সত্ত্বেও বড় বড় মজলিসে তার ডাক পড়ে।’ [পৃ ৬১] 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বই, সঙ্গীত, প্রকৃতি, প্রাণীবান্ধব ছিলেন। এ বিষয়ে বিষ্ণু প্রভাকর করেকটি উদাহরণ দিয়েছেন। ‘‘পাখি পোষা শরতের নেশা ছিল। একটা ময়না ছিল, আদর করে তাকে মোনা বলে ডাকত। একদিন হঠাৎ পাখিটি মরে গেল। নিজের সন্তান মরে গেলে যেমন দুঃখ হয়, শরৎ ঠিক ততটাই দুঃখ পেয়েছিল। এরপর একটা সিঙ্গাপুরী নূরী পাখি জোগাড় করে, ভালোবেসে তার নাম দেয় ‘বাটু বাবা’। তাকে রাতবিরেতে খাওয়াত। বন্ধুরা বলত, ‘পাখি কি রাত্তিরে খায়?’’ [পৃ ৮৭]  এছাড়াও তিনি কুকুর পুষতেন। ‘কলকাতার রাস্তায় প্রকাশ্যে কুকুর নিয়ে বেড়াতে বেরুত। ছোট্টা একটুখানি দাড়ি, মাথায় অবিন্যস্ত চুল, মোটা ধূতি, পায়ে চটি, গায়ে চাইনিজ কোট, যে কেউ দেখে নিতে পারত এ- লোক কখনোই শহুরে নয়।’ [পৃ ৯১]

তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে পথের দাবী প্রকাশের এ-বছর শতবর্ষ। তিনি যখন এ উপন্যাস রচনা করেন তখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। তখন রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি যুগান্তর, অনুশীলন, শ্রীসংঘ ইত্যাদির সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম ছিল সাড়া জোগানো। এসব সংগঠন ছিল কমিউনিস্ট বামপন্থার অনুসারী। এর আলোকেই তাদের বিপ্লবী বলা হতো। তিনি সরাসরি কোনো সংগঠনের সাথে জড়িত না থাকলেও স্বদেশি, স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করতেন। উল্লেখ্য যে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে তিনি খুব আহত বোধ করেছেন। অন্যদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসুসহ অনেকের সাখে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। একইকারণে তিনি বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ রাখতেন। পথের দাবী উপন্যাস লেখার আগে ও পরের লেখাগুলোতে স্বদেশি আন্দোলন ও উপনিবেশিত মানুষের সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন দেখিয়েছেন খুব নিষ্ঠার সাথে। ফলত পথের দাবী উপন্যাস সেই বিপ্লবী সংগ্রামেরই প্রতিবিম্ব। 

পথের দাবী লেখার আগে বিপ্লবের সপক্ষে রচিত সাহিত্য পাঠ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। ম্যাক্সিম গোর্কির মাসহ অন্য লেখাও পাঠ করছেন এবং নোট নিয়েছেন। এপর্বে শরৎচন্দ্র ব্যক্তি হিসেবে অনেক সংহত ও সংযমী। তাঁর চিন্তা ও ভাবনা বিবর্তিত হয়েছে। গোর্কি পাঠের পর তিনি বলেছেন, ‘এই গল্পগুলিতে জীবনের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গী দেখতে পাওয়া যায়। গোর্কির নতুন ভাবধারা, নতুন শৈলী, নতুন রকমের টেকনিকে লেখা, মানবতার প্রতি যেন নতুন বাণী বহন করে এনেছে।’ [পৃ ১৭৩] 

পথের দাবী প্রকাশিত হলেও প্রকাশক সন্দেহ করেছেন যে, এটা ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে। অবশেষে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সহায়তা ও উসকে দেওয়ার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এ সম্পর্কে বিষ্ণুর মন্তব্য হলো, ‘‘শিল্প এবং চরিত্রসৃষ্টির সংযমের ক্ষেত্রে ‘পথের দাবী’-র মহত্ব ততটা নেই। যতটা আছে রাজনৈতিক জীবনের একটি অস্পৃশ্য অনন্যতাকে সজীবরূপে গড়ে তোলার চেষ্টার মধ্যে। সে-চেষ্টা প্রায়ই আয়াসসাধ্য হয়েছে। এই আয়াসই হয়েছে এর দুর্বলতা। কিন্তু তবুও নিজের সমস্ত দুর্বলতার মধ্যেও ‘পথের দাবী’-র সব্যসাচীর নির্মল চরিত্র ভারতের জনমনকে চিরদিন আকৃষ্ট এবং প্রভাবিত করে চলবে।’’ [পৃ ২০৪]

তিনি আরো দেখেছেন, তাঁর সাহিত্য সকলের কাছেই ছিল গ্রহণযোগ্য। শরৎ ভেতরে কোনো অহঙ্কার পোষতেন না। সাধারণ পাঠকের সাথেও ছিল তাঁর সম্পর্ক। বিষ্ণু প্রভাকরের নিষ্ঠা ছিল নিন্দা, অপমান ও বাজারি গল্পের ভেতর থেকে রক্তমাংসের মানুষ শরৎচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মানুষ ও লেখক শরৎচন্দ্রকে আবিষ্কার করেছেন। ফলে আমরা একজন চঞ্চল, সৃজনশীল, তৃষিত লেখক শরৎচন্দ্রকে দেখি। তাঁর তৃষ্ণা যেন কখনো শেষ হয় না। হাসপাতালের বিছানায়ও সেই একই চিৎকার; কোথাও বিশাল শূন্যতা, হাহাকার বুকে তিনি ছটফট করেছেন। কিছুই বুঝতে দেননি। যেমন সারাজীবন এক রহস্য, ছদ্মাবরণে নিজেকে আড়াল করেছেন। বিষ্ণু প্রভাকর লিখেছেন ১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি হাসপাতালে ভীষণ কাতর ছিলেন কী এক অজানা কষ্টে। মৃত্যুর আগের রাতে আর্তনাদ করেছেন। কেউ বলতে পারে না, তাঁর না বলা কথা কী ছিল। অব্যক্ত শব্দ ও কী এক তৃষ্ণায় শরৎচন্দ্র মারা যান। এক সময় শরৎচন্দ্র একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমার জীবনটা আগাগোড়াই যেন একটা মস্ত উপন্যাস। যখন মরব- ফরসা খাতা রেখে যাব যার মধ্যে কালির আঁচড় এক জায়গাও থাকবে না।’ নিজের স্বীকারোক্তির সাথে শরৎচন্দ্রের লেখকজীবন মিলে যায়। বিষ্ণু প্রভাকর ছন্নছাড়া মহাপ্রাণের এ সাদা পাতাই আবিষ্কার করেছেন। 

#