২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

আমজাদ আল মামুনের গল্প: ছায়া

তবে আয়নাটা আজ অদ্ভুত। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখে ভয় নেই, বরং মৃদু এক তৃপ্তি। ঠোঁটে হালকা হাসি। পলা হাত বাড়িয়ে আয়নাটা ছুঁতে গেল, ঠিক তখনই আয়নার ভেতরের মেয়েটা ফিসফিস করে বলল, আমি তোমার হয়ে যাবো। তুমি ক্লান্ত, পলা। এখন আমি থাকবো।

আমজাদ আল মামুন আমজাদ আল মামুন

Published : 23 Aug 2026, 01:26 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:59 PM

রাতটা ছিল নিঃশব্দ। জানালার ওপারে আকাশটা যেন এক থালা অন্ধকার, তারার আলোও নিভে গেছে। পলা বসেছিল নিজের ঘরে, বাতির ম্লান আলোয়। ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন তার বুকের ভেতরের এক অজানা শূন্যতাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

বাইরে হালকা বাতাস বইছিল, কিন্তু পর্দাটা নড়ছিল না। বাতাসটা যেন জানালা পর্যন্ত এসে থেমে গেছে তারপর ফিরে গেছে কোনো অদৃশ্য ভয় পেয়ে।

পলা জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিল। মনে হলো, ওর চোখের দৃষ্টি একটু অপরিচিত, ঠান্ডা। যেন ওর ভেতরে অন্য কেউ বসবাস করছে। নিজের মুখের ভেতরেও আজ অন্য কারো ছায়া লেগে আছে।

সে কফির কাপ হাতে নিল। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল সাদা সর্পিল হয়ে, যেন কোনো নিঃশব্দ প্রার্থনা আকাশে উড়ে যাচ্ছে। কফির তিতকুটে গন্ধটা নাকের ভেতর ছড়িয়ে পড়তেই এক অদ্ভুত ক্লান্তি ভর করল শরীরে।

বাইরে শহরের দূরের সাইরেন, কারো হর্নের ক্ষীণ শব্দ সবকিছু যেন পলার কাছ থেকে অনেক দূরে, অন্য কোনো জগতে ঘটছে। এই ঘরটাই যেন এখন এক ভাসমান দ্বীপ, যেখানে সময়ও থেমে আছে।

মোবাইলটা নিঃশব্দে কাঁপল। পর্দায় নাম ভেসে উঠল—“রুদ্র”।

পলা তাকিয়ে রইল, ফোনটা ধরল না।

ফোনটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলেও যেন ঘরের বাতাসে রুদ্রর কণ্ঠ ভাসতে লাগল

‘তুমি ঠিক আছো তো, পলা?’

সে কানে হাত দিল, কিন্তু কণ্ঠটা মাথার ভেতরেই বাজতে থাকল।

পলা ধীরে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

আয়নাটা আজ কিছুটা ঝাপসা, তবুও দেখা যায় ওখানে একজন দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে একদম ওর মতো, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত হাসি।

পলার বুক ধক করে উঠল।

“তুমি কে?” ওর ঠোঁট নড়ল, কিন্তু আওয়াজ বেরোল না।

প্রতিফলনের মেয়েটা একটু হাসল, মাথা কাত করল

যেন বলছে, তুমি আমাকে ভুলে গেছো?

এক ঝটকায় কোথা থেকে বাতাস এলো, জানালার পর্দা হালকা কাঁপল। বাতাসে ধুলো উড়ল, মোমবাতির আলো কেঁপে উঠল, আর ঠিক তখনই প্রতিফলনটা যেন এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল আবার ফিরে এলো, কিন্তু চোখদুটো এখন আরও গাঢ়, আরও জীবন্ত।

পলা চোখ বন্ধ করে ফেলল। ভেতরে মনে হলো কেউ ফিসফিস করছে একটা মৃদু, অস্পষ্ট কণ্ঠ, যেটা চেনা অথচ অচেনা।

রাতটা যেন জমে উঠছিল ধীরে ধীরে, গাঢ় কালো কফির মতো।

কোনো এক জায়গা থেকে একটা বিড়াল ডাকল, তারপর নীরবতা।

পলা নিজের বুকের ভেতরে হাত রাখল তার হৃদস্পন্দন অদ্ভুতভাবে ধীর। মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের শরীরের ভেতরে নেই, বরং বাইরে থেকে তাকিয়ে আছে নিজের দিকে।

জানালার ওপাশে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। কাচে ফোঁটা পড়ল টুপটুপ করে, কিন্তু শব্দগুলোও যেন অন্যরকম বৃষ্টির নয়, যেন কোনো গোপন ভাষা।

পলা কফির কাপটা রেখে দিল টেবিলে। ধোঁয়া থেমে গেছে, কিন্তু হালকা তাপ এখনও আছে।

সে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। বাইরের শহরটাও যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস, যা পলার বুকের ভেতরের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিশে গেল নিঃশব্দে।

রাত গভীর হচ্ছিল। দূরের আলো নিভে যাচ্ছিল একে একে, যেন শহর ঘুমিয়ে পড়ছে, শুধু পলা জেগে আছে নিজের ছায়ার সঙ্গে মুখোমুখি।

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ। তবু বারান্দার কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা জল এখনও নিচে পড়ছে, যেন কোথাও কেউ অগোচরে কাঁদছে। পলা দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। রাত গভীর হয়েছে। শহরের আলোয় ছায়াগুলো এখন আর আলাদা করে বোঝা যায় না সব একাকার, এক ভেজা কুয়াশায় গলে গেছে।

তার হাতে এক কাপ কফি। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। সে কফিটা নামিয়ে রাখল, তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখটা শুকনো, চোখে কালি, ঠোঁটে চিরে যাওয়া ফাটল। কিন্তু আজকাল আয়নাটা তার চোখে অদ্ভুত লাগে। যেন ওই কাচের ভেতর কেউ আছে, নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

কিছুদিন হলো, পলার ভেতরে পরিবর্তন আসছে। অফিসে কাজের ফাঁকে সে নিজের কণ্ঠ শুনতে পায় একটা ফিসফিস, খুব নিচু স্বরে। কখনো মনে হয়, কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। কখনো শোনে, কেউ বলছে “ওদের বলো না।” সে তাকিয়ে দেখে চারপাশে কেউ নেই।

প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো কাজের চাপ। রাত জেগে রিপোর্ট বানানো, ক্লায়েন্টের মিটিং, ডেডলাইন সব মিলে মাথা ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু একদিন সে বুঝল ব্যাপারটা শুধু ক্লান্তি নয়।

সেদিন সকালে অফিসে ঢোকার সময় লিফটে সে এক মহিলাকে দেখেছিল কালো শাড়ি, চোখে কালো সানগ্লাস, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। মহিলা নিচু স্বরে বলল,

তুমি ওদের বিশ্বাস করো না, পলা।

পলা চমকে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই দেখল, লিফটে সে একাই আছে। আয়নার প্রতিবিম্বে আর কেউ নেই।

সেদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার সময় বাসের জানালার পাশে বসে ছিল সে। ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি থেমে আছে। রাস্তার পাশে হঠাৎ চোখে পড়ল কালো শাড়ি পরা একই নারী, সেই লাল লিপস্টিক। দূর থেকে তাকিয়ে হাসছে। ঠোঁট নাড়ছে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই।

সেই রাতেই শুরু হয় বিভ্রম।

পলা ফোনটা হাতে নিয়ে বসেছিল। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু কাকে বলবে? নাকি ডাক্তার দেখাবে?

পরদিন দুপুরে সে গেল এক সাইকিয়াট্রিস অরুণ সান্যালের চেম্বারে। আগে থেকেই পরিচয় আছে ডাক্তারের সঙ্গে পলার l দেয়ালে নীল রঙের আলোছায়া, টেবিলে সাজানো কয়েকটা মেডিক্যাল বই, ডাক্তার নরম গলায় বললেন,

তুমি কবে থেকে এমন অনুভব করছো?

পলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

মনে হয়... আমার সঙ্গে কেউ থাকে। সবসময় না, কিন্তু হঠাৎ মনে হয় কেউ আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমি দেখি না, কিন্তু টের পাই।

ডাক্তার কলম ঘুরিয়ে নোট লিখলেন।

তুমি কি কখনো নিজের কণ্ঠ শুনতে পাও, কিন্তু জানো না সেটা তোমারই কণ্ঠ?

পলা ধীরে মাথা নাড়ল।

হ্যাঁ। মাঝে মাঝে। আমার নাম ধরে ডাকে।

ডাক্তার বললেন,

এটাকে বলে অডিটরি হেলুসিনেসন, মাঝে মাঝে প্যারানয়েড ডিলুসনের এর অংশ হিসেবেও আসে। তুমি ভয় পাও?

পলা বলল,

ভয় পাই না, কিন্তু অদ্ভুত লাগে। যেমন... আমি জানি সবকিছু বাস্তব, তবু মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই। যেন একটা ছায়া সারাক্ষণ পাশে হাঁটে।

ডাক্তার হালকা হেসে বললেন,

তুমি জানো, ছায়া আসলে আমাদের অবচেতন মন। কখনো কখনো সেটা কথা বলে, কারণ আমরা নিজের সঙ্গে কথোপকথন করতে ভুলে যাই।

পলা চুপ করে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল,

তাহলে যদি সেই ছায়াটা আমার চেয়ে বেশি জানে? যদি সে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে?

ডাক্তার চুপ করে গেলেন। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করছে। ঘরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

তিনি ধীরে বললেন,

তুমি ওষুধ শুরু করো, আর কিছুদিন নিয়মিত থেরাপি নাও।

কিন্তু থেরাপি শুরুর পরের সপ্তাহেই পলার জীবনে আরও অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল।

রাতে ঘুমের মধ্যে সে জেগে উঠত, দেখে দরজা খোলা। ল্যাম্প জ্বলছে। তার ডায়েরি টেবিলের ওপর খোলা। পৃষ্ঠার ওপর লেখা “আমি এখানে আছি।”

সে ভেবেছিল, হয়তো ঘুমের ঘোরে নিজেই লিখেছে। কিন্তু হস্তাক্ষরটা তার নয়।

একদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে দেখল তার গলায় আঁচড়ের দাগ। মনে পড়ছে না, কবে কীভাবে হলো। অফিসে গিয়েও মাথা ঘুরছিল। সহকর্মীরা বলল,

তুমি খুব চুপচাপ হয়ে গেছো, পলা।

পলা শুধু হাসল। বলল,

ভালো আছি।

কিন্তু সে জানত, ভালো নেই।

রাতে সে আবার শুনতে পেল সেই কণ্ঠ 

ওদের বলো না। ওরা বুঝবে না।

পলা বিছানা থেকে উঠে জানালার দিকে গেল। নিচে নিস্তব্ধ রাস্তা। একটা বিড়াল হাঁটছে ধীরে। কুয়াশার মতো আলোয় রাস্তা ঝাপসা। হঠাৎ আয়নার পাশে ছায়াটা নড়ল।

সে ধীরে ফিরে তাকাল, কেউ নেই।

তবে আয়নাটা আজ অদ্ভুত। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখে ভয় নেই, বরং মৃদু এক তৃপ্তি। ঠোঁটে হালকা হাসি। পলা হাত বাড়িয়ে আয়নাটা ছুঁতে গেল, ঠিক তখনই আয়নার ভেতরের মেয়েটা ফিসফিস করে বলল,

আমি তোমার হয়ে যাবো। তুমি ক্লান্ত, পলা। এখন আমি থাকবো।

পলার হাত কেঁপে উঠলো l চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

সেই রাতের পর অফিসে কেউ পলাকে দেখেনি। তার ফ্ল্যাটের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।

পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঢোকে। টেবিলে এক কাপ কফি ঠান্ডা হয়ে আছে। চেয়ারে খোলা ডায়েরি শেষ পৃষ্ঠায় লেখা,

“আমি এখন ভালো আছি। সে চলে গেছে। এখন শুধু আমি, ছায়া।”

ঘরে দুটো কফির কাপ ছিল।

একটার ধোঁয়া এখনো সামান্য উড়ছে।