০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

জর্জ অরওয়েল-এর ‘ফাঁসি’

মাথায় যমটুপি পরানো লোকটির দিকে তাকিয়ে থেকে আমরা তার আর্তনাদ শুনলাম – প্রতিটি আর্তনাদই যেন জীবনের বাড়তি এক একটি সেকেন্ড! আমাদের সবার মনে একই ভাবনা ছিল: উফ্!

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

Published : 21 Jun 2025, 10:50 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:14 PM

বার্মায় বৃষ্টিভেজা একটি স্যাঁতসেতে সকাল। হলুদ রাংতা কাগজের মতো ফ্যাকাশে এক তির্যক আলো জেলখানার উঁচু প্রাচীরে এসে পড়েছে। আমরা মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত কয়েদিদের কারাকক্ষগুলোর বাইরে অপেক্ষা করছি। সামনের দিকে দ্বিগুণ গরাদ দেওয়া ছোট পশুর খোয়াড়ের মতো এক সারি ছাউনি। দশ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি কারাকক্ষে একটি তক্তপোশ এবং জলপানের পাত্রই একমাত্র সম্বল। সেলগুলোর কয়েকটিতে কতিপয় পিঙ্গল-বর্ণ নির্বাক পুরুষ গরাদের ভিতরের দিকে কম্বল মুড়ি দিয়ে উবু হয়ে বসে আছে। বিচারে দোষী সাব্যস্ত এই লোকদেরকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ফাঁসি দেওয়া হবে।

এক কয়েদিকে তার সেল থেকে বের করে আনা হয়েছে। লোকটি ন্যাড়ামাথা, খুবই দূর্বল ও ক্ষুদ্রাকৃতির এক হিন্দু পুরুষ। আবছা ধরনের শীতল চাউনির লোকটির ঠোঁটের উপরে শরীরের তুলনায় অযৌক্তিকভাবে ফুলে ওঠা বেশ বড়সড় এক পুরুষ্টু গোঁফ। গোঁফটি বরং সিনেমার কোনো কৌতুক অভিনেতার মতোই ছিল। দীর্ঘদেহী ছয়জন ভারতীয় কারারক্ষী তাকে পাহারা দিচ্ছিল। তারা তাকে ফাঁসির মঞ্চের জন্য প্রস্তুত করছে। এদের মধ্যে দু'জন প্রহরী বেয়নেটযুক্ত রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। অন্যরা তাকে হাতকড়া পরিয়ে দিল। তার হাতকড়ার মধ্যে দিয়ে পেঁচিয়ে একটি করে শিকল প্রহরীদের কোমরবন্ধে লাগানো হল। কয়েদির বাহুদুটো পিঠমোড়া দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল। প্রহরীরা তার খুব কাছাকাছি ঘেষে সবসময় যত্নশীল, স্নেহপূর্ণভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে আছে। যেন সব সময় তার নড়াচড়া অনুভব করতে পারে। এ যেন অনেকটা মানুষের মুঠোয় থাকা মাছের মতো যেটি এখনও জীবিত এবং জলে ঝাঁপ দিতেও সক্ষম। কিন্তু কোনো রকমের প্রতিরোধ ছাড়াই লোকটি দড়ির কাছে তার দুর্বল বাহু দুটোকে সমর্পণ করে দাঁড়িয়ে আছে। কী ঘটতে চলেছে সে যেন তা বুঝতেই পারছিল না।

ঘড়িতে আটটা বাজলো, তখনি ভেজা বাতাসে ভর করে দূরের ব্যারাক থেকে ভেসে এলো বিউগলের হালকা করুন এক সুর। আমাদের সবার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট অস্থির চিত্তে লাঠি দিয়ে কাঁকর মাটি খোঁচাচ্ছেন। বিউগলের শব্দে তিনি মাথা তুললেন। ধূসর টুথব্রাশের ন্যায় গোঁফধারী এবং কর্কশ কন্ঠস্বরের লোকটি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন ডাক্তার। বিরক্তির সুরে তিনি বলে উঠলেন, “ঈশ্বরের দোহাই লাগে, তাড়াতাড়ি করো ফ্রান্সিস। লোকটির এতক্ষণে মারা যাওয়া উচিত ছিল। তুমি এখনো প্রস্তুত হওনি ?”

সাদা ড্রিল স্যুট এবং সোনালী ফ্রেমের চশমা চোখে দক্ষিণ ভারতীয় প্রধান কারাধ্যক্ষের নাম ফ্রান্সিস। তিনি তার কালো হাতটি নেড়ে খুশিতে টগবগিয়ে বলে উঠলেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার, সবকিছুই সন্তোষজনকভাবে প্রস্তুত হইছে। জল্লাদ অপেক্ষা করতেছে। আমরা আগাইয়া যাইতে পারি।"

“আচ্ছা, তাহলে জলদি এগিয়ে যাও। এই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েদিরা তাদের সকালের জলখাবার খেতে পাবে না।”

আমরা ফাঁসির মঞ্চের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। রাইফেল কাঁধে দুইজন কারাপ্রহরী কয়েদির দুপাশ বরাবর এগিয়ে চলল। আরও দু'জন প্রহরী তার হাত এবং কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গা ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল তারা যেন যুগপৎভাবে তার শরীরটাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অবশিষ্ট আমরা অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেট এবং সমমর্যাদার কর্মকর্তারা তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। আমরা দশ গজের মতো এগিয়ে যাওয়ার পর বিনা নির্দেশে বা কোনো সতর্ক সংকেত ছাড়াই শোভাযাত্রাটি থেমে গেল। একটি ভয়ানক কাণ্ড ঘটে গেল। কোত্থেকে কিভাবে জানি না, সংরক্ষিত স্থানটিতে হঠাৎ এসে একটি কুকুর উদয় হল। কুকুরটি লাফ দিয়ে আমাদের মাঝখানে এসে পড়ল এবং তীব্রস্বরে ঘেউঘেউ শুরু করে দিল। এতগুলো মানুষকে একসাথে দেখে বন্য হুংকারে আমাদের চারপাশে লাফিয়ে লাফিয়ে তার মস্ত শরীরটাকে ঝাঁকাতে লাগলো। বিশাল আকারের একটি আধা টেরিয়ার দো-আঁশলা পশমী কুকুর। এক মুহূর্তের জন্য এটি সামনের দুই পা তুলে আমাদের চারপাশে উদ্ধতভাবে লাফালো। এর পর কেউ থামানোর আগেই কুকুরটি দ্রুতগতিতে কয়েদির কাছে পৌঁছে গিয়ে লাফ দিয়ে তার গাল চাটতে চেষ্টা করল। আমরা সবাই চমকে গিয়ে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম, এমনকি কুকুরটিকে পাকড়াও করতেও ভুলে গেলাম।

“এই জঘন্য কুত্তাটাকে এখানে কে ঢুকতে দিয়েছে? কেউ একজন এটাকে আটকাও! ”- ক্রুদ্ধস্বরে হাঁক ছাড়লেন জেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট।

রক্ষীদল থেকে বিচ্ছিন্ন জনৈক কারাপ্রহরী কুকুরটির ওপর কদাকারভাবে চড়াও হল। কিন্তু কুকুরটি সবকিছুকে খেলার অংশ হিশেবে নিয়ে নাগালের বাইরে গিয়ে তিড়িংবিরিং নাচতে শুরু করে দিল। এক তরুণ ইউরেশীয় কারারক্ষক এক মুঠো কাঁকর তুলে কুকুরটিকে ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করল, কিন্তু ওটা পাথরগুলোকে পাশ কাটিয়ে আবারও আমাদের পিছু নিল। কুকুরটির অবিরত চিৎকার কারাগারের অভ্যন্তর জুড়ে হাহাকারের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। প্রহরীদ্বয়ের মুঠোয় থাকা কয়েদির দৃষ্টি একদম নিরাসক্ত, যেন এরকমটি মৃত্যুদণ্ডেরই অন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা। কয়েক মিনিটের মধ্যে কেউ একজন কুকুরটিকে আটকাতে সক্ষম হল। তারপরে আমার রুমাল তার গলা বন্ধনীতে বেঁধে চাপাস্বরে কাৎরাতে থাকা কুকুরটিকে নিয়ে আরও একবার সরে গেলাম।

ফাঁসির মঞ্চ তখনো প্রায় চল্লিশ গজ দূরে। আমি কয়েদির উদোম বাদামী পিঠটি আমার সামনে দিয়ে এগিয়ে যেতে দেখলাম। সে তার হাত বাঁধা অবস্থায় অপটু অথচ বেশ দৃঢ় পদক্ষেপে হেঁটে চলেছে। সেইসব ভারতীয়দের মতো নতজানু হয়ে যারা কখনই হাঁটু সোজা করে না। প্রতিটি পদক্ষেপে তার পেশীগুলি সুন্দরভাবে টানটান হয়ে উঠছিল। তার মাথার টিকির আগায় বাঁধা গিট্টুটি উপরে নীচে দুলছিল। তার পা দুটো ভেজা বালিতে ছাপ তৈরি করে এগিয়ে চলল। প্রহরীরা কাঁধ আঁকড়ে ধরে থাকা সত্ত্বেও সে পথিমধ্যে একটি জলাবদ্ধ ডোবা এড়াতে একপাশে কিছুটা সরে গিয়েছিল।

অদ্ভূত বিষয়! অথচ সেই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত আমি বুঝতাম না যে একজন সুস্থ ও সচেতন মানুষকে এইভাবে শেষ করে দেওয়ার কী মানে হতে পারে! কয়েদিকে জলাবদ্ধ গর্ত এড়িয়ে একপাশে সরে যেতে দেখেই অনুধাবন করলাম গোপন রহস্যটি। জানতে পারলাম তাজা একটি জীবনকে শেষ করে দেওয়ার অবর্ণনীয় অবিচারের বিষয়টি। মানুষটির মরার বয়স হয়নি। তিনি আমাদের মতোই প্রাণবন্ত ছিলেন। তার শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করছিল – অন্ত্রসমূহ খাদ্য পরিপাক করছিল, ত্বক নতুন করে তৈরি হচ্ছিল, নখ গজাচ্ছিল, শরীরে নতুন কোষ তৈরি হচ্ছিল। তাবৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অহেতুক পরিশ্রম করে যাচ্ছিল। যখন তিনি পাটাতনের উপর থেকে সেকেন্ডের এক দশমাংশ সময়ে শূন্যে ঝুলে পড়লেন, তার নখ তখনও বেড়ে চলেছিল। হলুদ কাঁকর এবং ধূসর দেয়াল দেখার স্মৃতি তার মস্তিষ্ক তখনও মনে রেখেছে, পূর্বাভাস দিয়েছে, যুক্তি দিয়েছে – এমনকি জলাবদ্ধ গর্ত সম্পর্কেও সতর্ক করেছে। তিনিসহ আমরা সমভিব্যহারে ছিলাম। একসাথে চলাফেরা, দেখা, শ্রবণ, অনুভব, একই জগতকে বোঝা। অথচ মিনিট দুইয়ের ব্যবধানে হঠাৎ টুপ করে আমাদের মধ্য থেকে একজন চলে যাবে - মনহীন, পৃথিবীহীন হয়ে যাবে!

ফাঁসির মঞ্চটি ছিল কারাগারের মূল মাঠটি থেকে আলাদা একটি ছোট উঠানের ওপারে। স্থানটি কাঁটাযুক্ত লম্বা আগাছায় পরিপূর্ণ। একটি চালার নিচে, তিন দিকে খাড়া ইটের গাঁথুনির ওপর পাটাতন আচ্ছাদিত ছিল ফাঁসির মঞ্চটি। পাটাতনের উপরে দুটি আনুলম্বিক কড়িকাঠকে সংযোগকারী একটি খুঁটিতে ফাঁসির রজ্জুটি দুলছিল। জেলের সাদা পোশাকধারী পক্ককেশ দণ্ডিত আসামির জন্য জল্লাদ তার যন্ত্রের পাশে অপেক্ষা করছিল। আমরা প্রবেশ করার সাথে সাথে সে আমাদেরকে অবনত মস্তকে অভ্যর্থনা জানালো। ফ্রান্সিসের এক নির্দেশে দুজন কারারক্ষী কয়েদিকে আগের চেয়ে আরও ঘনিষ্ঠভাবে আঁকড়ে ধরল। কিছুটা টানতে টানতে এবং কিছুটা ঠেলতে ঠেলতে ফাঁসির মঞ্চের কাছে নিয়ে তাকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে সাহায্য করল। এরপর জল্লাদ হাত উঁচিয়ে বন্দীর গলায় দড়ি বেঁধে দিল।

পাঁচ গজ দূরে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কারারক্ষীগণ ফাঁসির মঞ্চের চারপাশে এসে বৃত্তাকারে দাঁড়াল। তারপর যখন ফাঁসির দড়িটার গেরো এঁটে দেয়া হল, কয়েদি তার দেবতার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে লাগল। সে তখন এক উচ্চকিত চিৎকারে  "রাম! রাম! রাম! রাম!"-  বলে প্রার্থনা বা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। আবেদনটি ছিল সঙ্কটকালীন কিন্তু তা মোটেও ভয়ঙ্কর ছিল না। চিৎকারটি ছিল অবিচল ছন্দময়, প্রায় ঘণ্টাধ্বণির মতো। কুকুরটি ঘেউ ঘেউ শব্দে তার উত্তর দিল। ফাঁসির মঞ্চে দায়িত্বরত জল্লাদ ময়দার থলের মতো একটি ছোট সুতিকাপড়ের ব্যাগ এনে বন্দীর মাথা ঢেকে দিল। সেই কাপড়টি ভেদ করে বিরামহীন আর্তনাদ তবুও বহাল রইল -“রাম! রাম! রাম! রাম! রাম! রাম!"

জল্লাদ ফাঁসির মঞ্চের উত্তোলক দন্ডটির কাছে এসে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল। মনে হয় মিনিটখানেক কেটে গেল। কয়েদির কাছ থেকে স্থির, একাগ্র চিৎকার ভেসে আসছে, "রাম! রাম! রাম!"  এক মুহূর্তের জন্যও কখনো ছন্দপতন হল না।  জেল সুপারিনটেনডেন্ট তার বুকে থুতনি গুঁজে দাড়িয়ে নিবিষ্টমনে লাঠি দিয়ে মন্থরগতিতে মাটি খোঁচাচ্ছিলেন। সম্ভবত, তিনি কয়েদির চিৎকার গুনছিলেন, একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পর্যন্ত - পঞ্চাশবার অথবা সম্ভবত একশত পর্যন্ত। সবারই মুখের রং পাল্টে গেছে। ভারতীয়রা বাজে কফির মতো ধূসর হয়ে গিয়েছিল, আর দু-একটা বেয়নেট দুলছিল। পাটাতনের উপর দড়ি এঁটে বাঁধা, মাথায় যমটুপি পরানো লোকটির দিকে তাকিয়ে থেকে আমরা তার আর্তনাদ শুনলাম – প্রতিটি আর্তনাদই যেন জীবনের বাড়তি এক একটি সেকেন্ড! আমাদের সবার মনে একই ভাবনা ছিল: উফ্! মানুষটিকে তাড়াতাড়ি ঝুলিয়ে দাও, এর সমাপ্তি হোক, এই বীভৎস শব্দ থেমে যাক! 

অকস্মাৎ সুপারিনটেনডেন্ট মনস্থির করে ফেললেন। মাথা উঁচু করে হাতের লাঠিটি দ্রুত গতিতে ঘোরালেন এবং একটু তীব্রভাবেই গর্জন করে উঠলেন, "চলো!"

একটা ঝনঝন আওয়াজ, তারপর শুনশান নীরবতা। কয়েদির অন্তর্ধান হল এবং দড়িটি নিজেই মোচড় খাচ্ছিল। আমি কুকুরটিকে ছেড়ে দিলাম। এটি ছুটে ফাঁসির মঞ্চের পিছনে গেল কিন্তু সেখানে পৌঁছেই এটি দ্রুত থেমে গেল। ঘেউ ঘেউ শব্দ করে পিছু হটল। এরপর কুকুরটি চত্বরের এক কোণে আগাছার মধ্যে আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে সভয়ে আমাদের পানে তাকিয়ে রইল। আমরা ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে কয়েদির শবদেহ সযত্নে নিরীক্ষণ করলাম। আনতশির শবদেহটি তার পায়ের আঙ্গুলশুদ্ধ সোজা নীচের দিকে ঝুলছিল। পাথরসম মৃতদেহটি তখনও অতি মন্থরগতিতে ঘূর্ণায়মান।

সুপারিনটেনডেন্ট তার লাঠি হাতে অকুস্থলে পৌঁছে নগ্ন শবদেহের গায়ে খোঁচা দিলেন, এটা সামান্য একটু নড়ে উঠল। সুপারিনটেনডেন্ট বললেন, “ সব ঠিক আছে" । একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি ফাঁসির মঞ্চের নিচ থেকে সরে এলেন। তার মুখমণ্ডলের মেজাজী ভাবটি আচমকা তিরোহিত হল। তিনি তার কব্জিতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকালেন। “ আটটা বেজে আট মিনিট। ঠিক আছে, আজকের সকালের জন্য এতটুকুই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!"

কারারক্ষীগণ বেয়নেট খুলে ফেলে দূরে সরে গেল। কুকুরটি নিজের বাজে আচরণের বিষয়ে সচেতন হয়ে প্রশান্ত ভঙ্গিতে তাদের অনুসরণ করল। আমরা ফাঁসি চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে এলাম। দণ্ডাদেশ পাওয়া সেলগুলোতে অপেক্ষমাণ কয়েদিদের পার হয়ে কারাগারের বড় কেন্দ্রীয় চত্বরে চলে এলাম। লাঠি হাতে সজ্জিত কারারক্ষীদের অধীনে কয়েদিরা ইতোমধ্যে তাদের সকালের জলখাবার গ্রহণ করছিল। তারা প্রত্যেকে হাতে একটি করে টিনের থালা নিয়ে লম্বা সারিতে বসে আছে। তখন দুইজন কারারক্ষী বালতিতে ভাত বয়ে নিয়ে হাতায় করে বিতরন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। ফাঁসি কার্যকর করার পরের এই দৃশ্যটি বেশ ঘরোয়া এবং আনন্দদায়ক বলে মনে হল। কাজটি সম্পন্ন হওয়াতে আমাদের মনে একটি বিশাল স্বস্তি বয়ে আনল। কেউ কেউ গান গাইতে, দৌড় থেকে বিরতি নিতে চাপাহাসিতে প্রবৃত্ত হল। আচমকা সবাই আনন্দে আগড়ম-বাগড়ম বকতে শুরু করে দিল।

ফিরে আসার সময় আমার পাশে পাশে হাঁটতে থাকা ইউরেশীয় তরুণটি মাথা নেড়ে তার সুপরিচিত হাসি দিয়ে বলল: “ আপনি কি জানেন স্যার, (সে মৃত ব্যক্তির পানে ইঙ্গিত করল) আমাদের বন্ধুবর তার আপীল খারিজ হয়ে গেছে শুনেই ভীষণ আতংকে সেলের মেঝেতে প্রস্রাব করে দিয়েছিল। অনুগ্রহ করে আমার একটা সিগারেট নিন, স্যার। আপনি কি আমার নতুন কেনা রুপোর সিগারেট কেসটির প্রশংসা করবেন না, স্যার? উৎকৃষ্ট ইউরোপীয় শৈলীতে নির্মিত সিগারেট কেসটি দুই টাকা আট আনা দিয়ে ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা থেকে কিনেছি।”

আমাদের অনেকেই হেসে উঠল – কিন্তু এ বিষয়ে কাউকেই নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল না।

সুপারিনটেনডেন্টের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ফ্রান্সিস বাচালের ন্যায় আঞ্চলিক সুরে বকবক করছিলেন। “ আইচ্ছা স্যার, সবই অত্যন্ত সন্তোষজনকভাবে শেষ হইয়া গেছে। কম সময়েই ঝামেলা পার হইল । ভালোই হইল। এমনটা সবসময় হয় না – কি বলবো! আমি এমনও কিছু ঘটনা জানি যে, ডাক্তার ফাঁসির মঞ্চের নীচে গিয়া বন্দীর পা টাইন্যা ধইরা জান কবজ করতে বাধ্য হইছিল। কী জঘন্য ব্যাপার!"

সুপারিনটেনডেন্ট বললেন “বিষয়টি অস্বস্তিকর, তাই না? খুবই খারাপ।“

“ হ্যাঁ স্যার, যখন তারা অবাধ্য হয়ে ওঠে তখন আরও খারাপ হয়! একজন কয়েদির কথা আমার মনে আছে। আমরা যখন তাকে বের করে আনতে গিয়েছিলাম তখন সে শক্ত করে খাঁচার গরাদ আঁকড়ে ধরেছিল। আপনি হয়তো এটাকে ব্যর্থতা বলবেন স্যার, তাকে ছাড়িয়ে আনতে ছয়জন কারারক্ষীর প্রয়োজন হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন মিলে কয়েদির পা ধরে টানছিল। আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা  করেছিলাম। আমরা বললাম, "প্রিয় সাথী, আপনি আমাদের জন্য যে সমস্ত যন্ত্রণা এবং সমস্যার সৃষ্টি করছেন তা একটু ভেবে দেখুন!" কিন্তু না, সে কিছুই শুনতে নারাজ! উফ্! তার জন্য প্রাণান্তকর কষ্ট করতে হয়েছিল!”

লক্ষ্য করে দেখলাম আমি বেশ জোরে হাসছি। সবাই হাসছিল। এমনকি সুপারিনটেনডেন্টও সহনশীল ভঙ্গিতে হাসছিলেন। তিনি বেশ উদারভাবে বললেন,

“তোমরা সবাই বাইরে এসে মদ্যপান করলে ভালো হবে, আমি গাড়িতে একটি হুইস্কির বোতল পেয়েছি। এখন আমরা এটার সদ্ব্যবহার করতে পারি।"

আমরা জেলখানার জোড়া মহাতোরণ পেরিয়ে রাস্তায় এলাম। "তার পা ধরে টানছে!” -একজন বর্মী ম্যাজিস্ট্রেট হঠাৎ চিৎকার করে ঠাট্টার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আমরা সবাই আবার হাসতে শুরু করলাম। সেই মুহূর্তে ফ্রান্সিসের উপাখ্যানটি যারপরনাই মজার বলে মনে হয়েছিল। এরপর স্থানীয় এবং ইউরোপীয়রা সবাই মিলে আমরা বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে মদ্যপান করলাম। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত লোকটির শবদেহ একশ গজ দূরে পড়ে ছিল।

(১৯৩১ সালের আগস্ট মাসে দ্য অ্যাডেলফি সাময়িকীতে প্রথম প্রকাশিত | ১৯৪৬ সালে 'দ্য নিউ স্যাভয়' সাময়িকীতে পুনর্মুদ্রিত)