১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

১৫ আগস্ট এবং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রমঃরূপান্তর

সুব্রতশংকর ধর সুব্রতশংকর ধর

Published : 15 Aug 2021, 10:31 AM

Updated : 03 Oct 2022, 11:24 AM


চিত্রকর্ম: শিল্পী শাহাবুদ্দিনের চিত্রকর্মে বঙ্গবন্ধু

সেই শৈশব থেকে জেনে এসেছি, ভোর বেলার পাঠ মনে থাকে বেশি। ঢাকা কলেজে পড়ি তখন। সামনে পরীক্ষা। তাই ভোর বেলা উঠে পড়তে শুরু করেছি। তখনই টানা গুলির শব্দ। পিলখানার কাছে বলে গুলির শব্দে আমরা হোস্টেলবাসীরা মোটামুটি অভ্যস্ত। কিন্তু এই শব্দ অন্যরকম। তাছাড়া পিলখানা থেকে গুলির শব্দ আসতো আরও একটু পরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেল সেই দুঃসংবাদ– বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, সেই সাথে তাঁর সমস্ত পরিবারকেও। খুনীরা নিজ কণ্ঠেই ঘোষণা করেছে। 'বাংলাদেশ বেতার' ততক্ষণে 'রেডিও বাংলাদেশ' হয়ে গেছে 'রেডিও পাকিস্তান' এর আদলে। সেই ভয়ংকর ঘোষণার ফাঁকে ফাঁকে বাজানো হচ্ছে উর্দু গান, পাকিস্তানি শিল্পীদের। মেজর ডালিম এক ফাঁকে বাংলাদেশকে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' হিসেবেও ঘোষণা দিলো। খন্দকার মোশতাক তাঁর সেদিনের ভাষণ শেষ করলেন 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' বলে। মনে হলো, বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু বদলে গেছে। মনে হয়েছিল, হয়তো ভুল করেই, বুঝি মুক্তিযুদ্ধই নিহত হয়েছে, নিহত হয়েছে সেই সংস্কৃতি, যার জন্য এত আন্দোলন, যার হাত ধরে এগিয়েছে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম।

ধারণাটা ভুল ছিল, সন্দেহ নেই। ওই বয়সে আমার মুক্তিযুদ্ধ-ভাবনা ছিল একরৈখিক। তেমন করে তত্ত্ব-তালাশও করা হয় নি যে মুক্তিযুদ্ধের গর্ভেই নিহিত ছিল নানান প্রবণতা। এই মুক্তিযুদ্ধে কৃষক গেছেন তাঁর কাঁধের হাল নামিয়ে, টঙ্গীতে যে শ্রমিক কাজ করতেন তিনি যুদ্ধে গেছেন মেশিন বন্ধ করে দিয়ে, অনেক সৈনিক গেছেন দেশের জন্য লড়বেন বলে, কেউ কেউ গেছেন না গিয়ে উপায় ছিল না বলে। যে মধ্যবিত্ত রাজনীতিবিদ পাকিস্তানি রাজনীতিতে তাঁর তেমন সম্ভাবনা দেখেন নি, তিনিও যুদ্ধে গেছেন যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনার কথা ভেবে। সমাজতন্ত্রী গেছেন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে, পুঁজিপতি ভেবেছেন তাঁর পুঁজির বিকাশে সহায়ক হবে বাংলাদেশ; যে সম্প্রদায় পাকিস্তানে নিগৃহীত ছিলো, নিপীড়িত ছিল, সে যুদ্ধে গেছে এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। যুদ্ধে গেছেন রফিক আজাদ, আনিসুজ্জামান। আবার সেই যুদ্ধেই গেছেন সৈয়দ আলী আহসান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁদের সবার একরকম স্বপ্ন ছিলো না। স্বপ্ন ছিলো বিশ্বাস অনুগা্মী। আবার বিশ্বাস ছিলো প্রত্যেকের সংস্কৃতি ভাবনার অনুগামী। বিশ্বাসে বিশ্বাসে যুদ্ধ ছিলো সেই মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেই। হয়তো সংগোপনে, বিশেষত যখন মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রতীতিগুলোর একটা সংহত রূপ দাঁড়াতে শুরু করেছে যাকে অস্বীকার করে আর মুক্তিযুদ্ধে থাকা চলে না। তাই ভেতরের যুদ্ধটা আরও গভীরে চলে যায়। দৃশ্যমান থাকে না ততটা।

সেইসব যুদ্ধের পরম্পরা একদিন এনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টে। ১৫ আগস্ট—যেদিন 'বাংলাদেশ বেতার' হয়ে যায় 'রেডিও বাংলাদেশ,' উর্দু গানের তালে তালে অনেকের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। 'জয় বাংলা' হয়ে যায় 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ'। তারপর পাকিস্তানি হানাদারদের আর পাকিস্তানি বলা হয়নি দীর্ঘকাল, শুধু 'হানাদার' বলা হতো। বঙ্গবন্ধুকে আর 'বঙ্গবন্ধু' বলা হতো না। এই পরিবর্তনকে তখন মনে হয়েছিল বুঝি ওই সময়ের কোন প্রতীকী পরিবর্তন। তা তো নয়। এর শেকড় পৌঁছে গেছে অনেক গভীরে, গেল ৪৫ বছরে।

আমরা তো জানি, পঁচাত্তরের কাছাকাছি সময়েই দাবি উঠেছিলো জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, আপাতদৃষ্টে ভূখণ্ডকেন্দ্রিক, কিন্তু মূল প্রেরণায় ধর্মাশ্রয়ী। আরও গভীরে যার মূল উদ্দিষ্ট বাঙালির অখণ্ড সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্নতা। একদিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত, তারা ভাঙচুর করছে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তিগুলো—সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা অচিরেই নির্বাসিত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরও দায়মুক্তি দিতে দেরি হলো না। পাশাপাশি চললো বৌদ্ধিক ভাঙচুর। সর্বত্র তখন উচ্চকন্ঠে শোনা যেতে লাগলো 'এ আমার নয়, ও আমার নয়', রবীন্দ্রনাথ নয়, শরৎচন্দ্র নয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম তথাকথিত বাম বৌদ্ধিক গোষ্ঠির প্রায়-সংঘবদ্ধ পুনর্মূল্যায়নে হলেন পরিত্যক্ত। উনিশ শতকের কোন প্রাপ্তিই আর আমার নয়। যে বাংলা গদ্য নির্মিত হয়েছিলো সে সময়, তাকে আতশকাচের নিচে ফেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চেয়েছেন যে এই ভাষাটি আমাদের নয়, 'অন্য' কারও। সেই 'অন্য' বা 'অপর' কিন্তু বাঙালিই, তবুও সে আমার নয় এই কথাটিই জোরে-শোরে বলার চেষ্টা করা হয়েছে পঁচাত্তর থেকেই। সেই তথাকথিত বৌদ্ধিক ধারাটি আজও ক্রিয়াশীল, সম্ভবত আরও জোরে-শোরে। একেবারে গভীর থেকে এই প্রবণতা্র ধারক-বাহকরা নির্ভেজালভাবে সাম্প্রদায়িক, তা সেইসব সঙ বহিরঙ্গে যে রঙই মেখে আমাদের সামনে আসুক না কেন, আমরা তাদের চিনি। কেউ কেউ আবার সম্প্রতি নিজেদেরকে চিনিয়েও দিয়েছে, আমাদের বেশি কষ্ট করে রঙ সরিয়ে চিনে নিতে হয়নি।

কিন্তু এই প্রবণতা যে আমাদের কাছে একেবারেই অপরিচিত, তা তো নয়। আমরা তো জানি ভাষা সংস্কার, বাংলা ভাষাকে রোমান হরফে লেখার চেষ্টা, রবীন্দ্রনাথ বর্জনের অপচেষ্টা—এ সবই তো হয়েছিলো সেই পাকিস্তানি আমলেও। তখনকার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেইসব প্রবণতাকে পরাজিত করেই আমরা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, এবং ভুল করে ধরে নিয়েছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্থায়ীভাবে তাদের পরাজিত করেছি। আসলে কোন পরাজিত শক্তিই নির্বংশ হয় না। তাদেরও থাকে নিজস্ব ইতিহাসের এক অন্তঃস্রোত। একটা গভীর ফাটলের পথ ধরে সেই অন্তঃস্রোত উপরে উঠে আসে সুবিধাজনক সময়ে। ১৫ আগস্ট তাদের সেই সুযোগটি করে দিয়েছিলো। গেল ৪৫ বছরে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সেই ধারা প্রায় অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্তার লাভ করেছে।

এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির তিনটি কর্মক্ষেত্র বিশেষভাবে লক্ষণীয়—তিনটিরই অভিন্ন এবং প্রাথমিক লক্ষ্য বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের বোধকে প্রভাবিত করা, ধর্মভিত্তিক আত্মপরিচয়ের বোধকে প্রধান করে তোলা, যে আত্মপরিচয়ের বোধ থেকে একদিন মানুষ যুদ্ধে গিয়েছিলো, তা থেকে সরিয়ে আনা। কিন্তু সে প্রাথমিক লক্ষ্য। চূড়ান্ত লক্ষ্য অবশ্যই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল তাদের পক্ষে যারা এই ধর্মাশ্রিত আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক শক্তি।

প্রথম ক্ষেত্রটি হলো, যা খানিকটা আগেই বলেছি, বৌদ্ধিক। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিন্ন ঐতিহ্যকে তারা খারিজ করে দেয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় যার উৎপত্তি, শুধু তাই আমাদের সম্পদ? না, তাও নয়। সেখানে আহমদ শরীফ থাকবেন না, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক থাকবেন না। থাকবেন না আরও অনেকেই। তাদের অপরাধ আছে। অপরাধ হলো, এই লেখকদের লেখায় সেইসব খারিজ-করা সীমান্তের ওপারের 'অন্য' সাহিত্যের একটা পারম্পর্য আছে, অবিভাজিত বাঙালিত্বের প্রেরণা আছে, অতএব এরা বর্জনীয়। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো এদের খারিজ-তালিকাটি বিশাল, সংরক্ষণ-তালিকাটি প্রায় অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়। সত্যিকার সংরক্ষণ-তালিকাটি পুরোপুরি সামনে এলে এখনও ঠিক সামলাতে পারবেন না বলেই খারিজ কর্মকাণ্ডেই তাদের একনিষ্ঠ মনোযোগ। সংরক্ষণ-তালিকা থেকে দুয়েকজনকে মাঝে মাঝে সামনে ঠেলে দেন প্রায়-নিরস্ত্র অবস্থায়, তখন আবার নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগে যায়।

তাদের মনোযোগের এবং ক্ষোভের আরেকটি জায়গা প্রমিত বাংলা। এর 'অবৈধতা' প্রমাণের জন্য তারা একটা খণ্ডিত ইতিহাসকেও সামনে হাজির করেন, যার মূল প্রেরণাটি দৃশ্যমানভাবেই সাম্প্রদায়িক। বাংলা গদ্যের শরীর নির্মাণে যে 'কৃতিত্ব'টুকু তারা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সংস্কৃত পণ্ডিতদের দেন তার সবটুকুই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অথবা সেই সময়ের সামগ্রিক ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠারও আগে ইংরেজ প্রাচ্যবিদদের যে পক্ষপাত তৈরী হয়েছিলো বাংলা ভাষা সম্পর্কে, এবং সেই পক্ষপাতই যে বাংলা গদ্যের শরীর নির্মাণে সংস্কৃতের প্রভাবকে প্রধান করে তুলেছে, সেই আলোচনায় তাদের যেতে দেখি না। সেই পক্ষপাত ব্যক্ত করেছেন হ্যালহেড ১৭৭৮ সালে, হেনরি পিটস ফর্স্টার ১৭৯৯ তে, উইলিয়াম কেরি ১৮০১ সালে। এই পক্ষপাতের একটি কারণ তৎকালীন ইংরেজ পণ্ডিতদের বিশ্বাস যে বাংলা ছিল সংস্কৃতের দুহিতা ভাষা। পক্ষপাতের দ্বিতীয় কারণটি ব্যাখ্যা করা যায় বিরাজমান ক্ষমতা-সম্পর্ক এবং ভাষার সাথে তার মিথষ্ক্রিয়ার আলোকে। তাহলে আমরা এও বুঝতে পারবো কেন ভারতচন্দ্রের কবিতায় এত আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার, যা পরে ক্রমে ভাষা থেকে অপসৃত হয়েছে। ১৮০১ এর পর রাম রাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার, রাজীবলোচন চট্টোপাধ্যায় কিংবা গোলকনাথ শর্মা বাংলাকে সংস্কৃতানুগ করার সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিয়েছেন– এমন ভাবনা একেবারেই স্বকপোলকল্পিত।

কিন্তু সে কথা তো বলা যাবে না। কারণ, তাতে সাম্প্রদায়িক প্রকল্পটি নিয়ে সামনে এগুনো যায় না। তাই তারা ইতিহাস দেখেন ১৮০১ সাল থেকে, ১৭৭৮ সাল থেকে নয়। হ্যাঁ, ইতিহাসে সব উপাদানই আছে হয়তো, বেছে বেছে সেইসব উপাদান দিয়েই তারা ইতিহাসকে সাজায় যা তাদের অন্বিষ্ট ব্যাখ্যার অনুগামী, যা একটি ধর্মাশ্রিত আত্মপরিচয়ের বোধকে সামনে বাড়িয়ে দেয় এবং তার সাথে সংগতিপূর্ণ একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
তবে এই দলের বাইরেও হ্রস্ববুদ্ধি কিছু মানুষ আছেন যারা প্রায় গায়ের জোরে প্রমিত বাংলার বিকল্প একটি 'পূর্ব বাংলার গদ্য' বানিয়ে ফেলতে চান। সেটি যে কী তা কিছুতেই স্পষ্ট হয় না। হবেও না। কারণ, এই অবিমৃশ্যকারী উদ্যোগ ইতিহাস-সম্মতও নয়, বিজ্ঞান-ভিত্তিকও নয়। ভাষা বদলায়। ১৮০১ সালের ভাষা উনিশ শতকেই আর থাকে নি। পশ্চিম বঙ্গের ভাষা আর বাংলাদেশের ভাষার মধ্যেও ক্রমশ বৈভিন্ন্য তৈরী হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে। কিন্তু এই ধীর গতি তাদের পছন্দ নয়। হুড়োহুড়ি করে করে ফেলতে হবে। আবারও সেই সমস্যা—খারিজ আগে, নির্মাণ পরে। এতে যে নৈরাজ্যটি তৈরী হয় তাতে আপত্তি নেই তাদের।

দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হলো—জনসংস্কৃতিকে প্রভাবিত করা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাতাবরণে ধর্মাশ্রিত আত্মপরিচয়কে রাজনীতিকীকরণ। বাংলার চিরায়ত উৎসব-পার্বণগুলো যখন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন গ্রামে-গঞ্জে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন মাহফিল, যা যতখানি না ধর্মীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রচারের অন্যতম প্লাটফর্ম। এর প্রভাব যে কত গভীরে গিয়ে পৌঁছেছে তার খানিকটা আভাস পাওয়া যায় এসব অনুষ্ঠানে জনসমাগম দেখে, মানুষের অংশগ্রহণের প্রকৃতি দেখে। স্বীকার করতে হবে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই প্রবণতা যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আমাদের উদ্দিষ্ট যদি হয় একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তাহলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে মানুষ যা চায় তাকে উপেক্ষা করা যায় কি? আবার একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো যাক। এই মানুষ একদিন পাকিস্তান চেয়েছিলেন ১৯৪৬-৪৭ এ, তারাই আবার বাংলাদেশ চেয়েছিলেন ১৯৭১ এ। তারাই যদি চান আবার সাম্প্রদায়িকতার উত্থান, তাহলে আমাদের দেখা দরকার কোন প্রক্রিয়ায় তারা এই রাজনৈতিক অনুভবে এসে পৌঁছেছেন। যারা একাত্তরে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, তাদের কেউ কেউ এমনি এমনি ২০২১ এ এসে সাম্প্রদায়িক হয়ে যান নি। তার পেছনে রাজনীতি ক্রিয়াশীল ছিল, সে রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে আদর্শের জয় হয়েছিল তার পরিপন্থী। সেই রাজনীতি গভীরভাবে ক্রিয়াশীল হয়েছে পঁচাত্তরের পর থেকে। এর বিরুদ্ধে যুদ্ধটা জারি রাখতে হবে। নইলে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ থাকে না। পাকিস্তানের মত কিছু একটা হয়। কিংবা তার চেয়েও খারাপ কিছু। একটা শক্তি তাই চায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর কোন রণকৌশল নেই।

তৃতীয় ক্ষেত্রটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত, যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বলে দাবি করেন, তাদের মধ্যে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে আপসকামিতা। তার সবচেয়ে বড় নির্ভুল প্রকাশ আমরা দেখতে পাই ২০১৩ সালের ৬ মার্চের পর হেফাজতে ইসলামের সাথে তাদের রাজনৈতিক সংযোগে। আওয়ামী লীগ হয়তো সেটি রণকৌশল হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু এটিও সত্যি, হেফাজতও এটিকে রণকৌশল হিসেবেই দেখে। শেষ বিচারে হেফাজত কখনোই আওয়ামী লীগের মিত্র নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগকে দিয়ে তার কাজগুলো ঠিক করিয়ে নেয়, ধীরে ধীরে। পাঠক্রমে পরিবর্তন, কওমী মাদ্রাসার ডিগ্রির স্বীকৃতি, সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে ভাস্কর্য অপসারণ–এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে একটি বিশেষ দিকে ঠেলে নেয়ার বিভিন্ন সোপান। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গার জলে ফেলে দেয়ার কথা না বললে হয়তো আরও অনেক দূর যেতো। আমরা জানি না হেফাজতের সাথে বর্তমান বিচ্ছিন্নতা কোন স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা কি না। দেন দরবার তো চলছেই। এই আপাতসান্নিধ্যে আওয়ামী লীগ তার সম্ভাব্য বিপদটুকু দেখতে পেলেই তার মঙ্গল।

মূল কথাটি হলো—পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে ক্রমঃরূপান্তর ঘটেছে, তা ক্রমশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বিপদগ্রস্ত করছে। অথচ এর বিরুদ্ধে কোন কার্যকর রণকৌশল নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বৌদ্ধিক সমাজ আজ আর বিশেষ কথা বলেন না। ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক শক্তির সাথে আওয়ামী লীগের মিত্রতার সম্পর্ক হয়তো তার অভিমানের কারণ। অথচ প্রতিপক্ষ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা মাঠ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশকে ধরে রাখতে চাই, নাকি ১৫ আগস্টের পর থেকে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে দানবের মত, তাকেই প্রশ্রয় দেবো? তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ থাকবে? বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ? সম্ভবত নয়।