Published : 18 Jun 2013, 06:40 AM
বরেণ্য এই নাট্যব্যক্তিত্বের মরদেহ মঙ্গলবার সকালে তার সাবেক কর্মস্থল একুশে টেলিভিশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার সহকর্মী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীরা আতিকুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
কারওয়ান বাজারে একুশে টেলিভিশন ভবন থেকে আতিকুল হকের কফিন শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয় বেলা সোয়া ১১টার দিকে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে সর্বস্তরের মানুষ সেখানে এই নাট্যকারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
আতিকুল হকের কফিনে সবার আগে ফুল দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত।
এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপাদেষ্টা এ জেড এম জাহিদুল ইসলাম, নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, রামেন্দু মজুমদার, শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সহ সভাপতি গোলাম কুদ্দুছসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের কর্মীরা শেষ শ্রদ্ধা জানান এই নাট্যকারের প্রতি।
আতিকুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, “তিনি তার সময়ে এক আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলেন যা গড়ে উঠেছিলো তার মূল্যবোধ আর মানবিকতাবোধ দিয়ে। তিনি সবার মধ্যেও বিশিষ্ট হয়ে উঠলেন তার নাটকের মাধ্যমে। আতিকুল হকের নাটক মানেই একটি বিশেষ বার্তা।”

রামেন্দু মজুমদার বলেন, “নাটকের মধ্যে তিনি একটি বিকল্প ধারা প্রবর্তন করেছিলেন। নাটক যে শুধু বিনোদন নয়, বরং এর মাধ্যমে জাতিকে সংগঠিত করা যায় সেটিও তিনি প্রমাণ করেছিলেন।”
বর্তমান সময়ের অনেক শিল্পীই আতিকুল হকের হাত ধরে উঠে এসেছেন বলে মন্তব্য করেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব।
তিনি বলেন, “আতিকুল হক সব সময় মানুষ ও সমাজের মঙ্গল কামনা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও তার গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিলো।”
প্রয়াত নাট্যকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ম হামিদ বলেন, “তিনি সব সময় সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেছেন। একজন মানুষ কতটুকু নিষ্ঠার সাথে সমাজকে উপলব্ধি করতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আতিকুল হক চৌধুরী।”
“সেনাশাসনের সময় তিনি স্বৈরাচারকে আক্রমণ করে নাটক বানিয়েছেন। কাজের জন্য বহুবার নিগৃহীত হওয়ার পরেও তিনি তার কাজের ধরন বদলাননি।”
শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার বলেন, “তিনি নাটকে সমাজের ঘাত-প্রতিঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটক লিখেছেন অকারণে নয়, শৈল্পিক মূল্যবোধ থেকে।”
‘বন্ধুর’ প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, “নাটক নিয়ে ছিলো তার পথ চলা। মূল্যবোধের জাগরণকে সামনে রেথে তিনি নাটক নির্মাণ করতেন। নতুনদের উৎসাহ দিয়ে নাটকে নিয়ে আসতেন। এতো উৎকর্ষ সাধনের জন্যই জাতি তাকে আজীবন স্মরণ করবে।”
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সোমবার রাতে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক আতিকুল হক। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
প্রোস্টেট ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে কিছুদিন আগেও হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসকরা হাল ছেড়ে দেয়ায় তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

বিকালে রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে আতিকুল হককে দাফন করা হবে বলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশন- বিটিভির অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকের নির্মাতা আতিকুল হকের বাড়ি বরিশালে। তার জন্ম ১৯৩১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভোলায় মামা বাড়িতে।
বিটিভির উপমহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন ১৯৯০ সালে আতিকুল হক অবসরে যান। এরপর তিনি বেসরকারি একুশে টেলিভিশনের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগেও তিনি ১১ বছর শিক্ষকতা করেছেন।
‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘নীলনকশার সন্ধানে’, ‘জলাশয় কতদূর”, ‘সুখের উপমা’, ‘বাবার কলম কোথায়’সহ অনেক জনপ্রিয় নাটক এসেছে আতিকুল হকের হাত দিয়ে।
১৯৬০ সালে রেডিও পাকিস্তানে যোগ দেয়ার মাধ্যমে আতিকুল হক কর্মজীবন শুরু করেন, ১৯৬৬ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে।
তার প্রযোজিত নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনের পর্দায় আসেন আবুল হায়াত, হুমায়ুন ফরীদি, শর্মিলী আহমেদ, কেয়া চৌধুরী, মিতা চৌধুরী, জুয়েল আইচ, আফরোজা বানু, মেঘনা, শম্পা রেজা, শমী কায়সার, সালমান শাহ প্রমুখ।
শ্রেষ্ঠ নাট্য প্রযোজক হিসেবে তিনি ১৯৭৬ সালে জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার পান। বাংলা একাডেমী পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বিটিভির সেরা প্রযোজকসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।