০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ বছরের তেল চুক্তি: বিশ্লেষকরা হতবাক, বিরোধীরা ক্ষুব্ধ

এই চুক্তির মাধ্যমে মূলত ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে ট্রাম্পের পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হল।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ বছরের তেল চুক্তি: বিশ্লেষকরা হতবাক, বিরোধীরা ক্ষুব্ধ
ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Sep 2026, 03:08 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

কারাকাসে গত জানুয়ারিতে মার্কিন এলিট বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবে এবং আগামীতে দেশটির তেল বিক্রির বিষয়টি দেখভাল করবে।

বিবিসি লিখেছে, বুধবার কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে বিশাল এক তেল চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মূলত ট্রাম্পের সেই পরিকল্পনাই বাস্তবায়িত হল।

এই চুক্তির আওতায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানি ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রের ওপর ১০০ বছরের জন্য একচেটিয়া অধিকার পেয়েছে। এসব তেলক্ষেত্রে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা দেশটির মোট প্রমাণিত তেল মজুদের এক-পঞ্চমাংশের বেশি।

বিবিসি লিখেছে, চোখ কপালে তোলার মত এই পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে দুই দেশের সরকারই এ চুক্তিকে নিজেদের জন্য ‘লাভজনক’ বলে দাবি করেছে।

ডনাল্ড ট্রাম্প একে বিশ্বের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ একে ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসবে এবং ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর ও রাজস্ব আয় হবে।

তবে অনেকেই এ চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক ইরান ও ভেনেজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ দূত এলিয়ট আব্রামস বলেছেন, এটি একটি ‘ভয়ানক’ চুক্তি।

“রদ্রিগেজ বিনা কারণে জাতীয় সম্পদের ২০ শতাংশ দিয়ে দিয়েছেন। আমি মনে করি, তিনি কেবল ওয়াশিংটনের নির্দেশ পালন করছেন।"

এই চুক্তির শর্তগুলো এতটাই একপেশে যে এটি অনেকটা ‘ঔপনিবেশিকতার দুঃস্বপ্নের’ মত বলে মন্তব্য করেন আব্রামস।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের প্রকাশ করা একটি ফ্যাক্ট শিটে চুক্তির কাঠামোগত কিছু বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মার্কিন সরকার ভেনেজুয়েলায় শেভরনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি 'নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনারস (ন্যাবেপ)' এর সঙ্গে কাজ করবে।

চুক্তির একটি বিস্ময়কর দিক হল, ন্যাবেপের পরিচালনা পর্ষদের যে কোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের ‘ভিটো ক্ষমতা’ থাকবে এবং পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে অবশ্যই মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনায় তেলের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় পশ্চিম এশিয়ার বাইরে তেল উৎপাদন বাড়লে পেলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভোক্তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক খবর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বারগাম ফক্স বিজনেসকে বলেন, এই চুক্তি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ‘ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্র’ পশ্চিম এশিয়ার থেকে সরিয়ে ফের পশ্চিম গোলার্ধের দিকে নিয়ে আসছে।

হোয়াইট হাউস বলছে, এই চুক্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর 'মনরো ডকট্রিন'কে পুনর্প্রতিষ্ঠা করেছে; যার মূল লক্ষ্য দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য নিশ্চিত করা।

ট্রাম্প দুই-তিন বছরের মধ্যে এই চুক্তি থেকে লাভের কথা বললেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল খাতের যে দশা, তাতে মুনাফা আসতে অন্তত এক দশক সময় লাগতে পারে।

হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের লুইস পাচেকো বিবিসিকে বলেন, ৩০ বছর আগের উৎপাদন ক্ষমতায় ফিরে যেতে ভেনেজুয়েলাকে আগামী আট বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, "যারা অতীত অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় তেলের সম্ভাবনা নষ্ট করেছে, তাদের হাতেই কি এই অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হবে?"

বিরোধীদের ক্ষোভ ও হতাশা

এই চুক্তিতে চরম হতাশ ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলো। মাদুরো সরকারের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এমন দ্রুত সখ্যে তারা ক্ষুব্ধ।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিয়া কোরিনা মাচাদো প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা না করলেও অনেকেই মুখ খুলেছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ্য করে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো হাউসম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, "আপনারা ভেনেজুয়েলার জনগণকে মুক্ত করার পরিবর্তে আমাদের নিপীড়কদের সঙ্গে মিত্রতা বেছে নিয়েছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বদলে আপনারা একটি অবৈধ ও নিপীড়ক সরকারের সঙ্গে সম্পদ দখলের অসাংবিধানিক পথ বেছে নিয়েছেন।"

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসইউভি ডেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন দিলেও অনেক কট্টর সমাজতান্ত্রিক এ চুক্তিকে ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন।

প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরোধিতা করার পর তাদের কাছে মনে হচ্ছে, রদ্রিগেজ দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ পুরনো শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজের আমলের তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেস বলেছেন, “এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঔপনিবেশিকতার দরজা খুলে দিচ্ছে।”

চাভেজের আমলের সঙ্গে বর্তমান চুক্তির পার্থক্যটি স্পষ্ট করতে ২০০৮ সালের একটি ঘটনার কথা সামনে এনেছে বিবিসি।

ওই বছরের শুরুতে চাভেজ তার সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘আলো প্রেসিদেন্তে’ সম্প্রচার করেছিলেন অরিনোকো নদীর অববাহিকায় সাবেক এক্সনমোবিল তেলক্ষেত্র থেকে।

তখন ওই অঞ্চলে এক্সনমোবিলের কিছু সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার পর চাভেজ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “লাগাম এখন আমাদের হাতে রয়েছে এবং আমরা আর কখনো তা ছেড়ে দেব না।”

ওয়াশিংটনপন্থি আগের সরকারগুলো ভেনেজুয়েলাকে ‘গ্রিংগোদের জাতিতে’ পরিণত করেছিল বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু তার উত্তরসূরিদের হাত ধরেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই বিশাল চুক্তি হল, যা দেশটির অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।