২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতে প্রথম পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোমাচ্ছন্ন ৩২ বছর বয়সী হরিশ রানার জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে আদালত।

ভারতে প্রথম পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Mar 2026, 10:00 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:08 PM

ভারতে প্রথমবারের মতো পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যুর (প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া) অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। ৩২ বছর বয়সী হরিশ রানার জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রত্যাহারের অনুমতি দিল আদালত। 

গাজিয়াবাদের বাসিন্দা হরিশ রানা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোমাচ্ছন্ন (পারমানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট)। মাথা থেকে পা অসাড়। সামান্য নড়াচড়ার ক্ষমতাও নেই। বিছানাই তার একমাত্র আশ্রয়। 

তার পরিবার তাকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে চেয়ে শীর্ষ আদালতে তার পরোক্ষ নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আবেদন করেছিলেন।

সব দিক খতিয়ে দেখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার হরিশ রানার পরিবারের আবেদন মঞ্জুর করেছে।

চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন হরিশ। পেয়িং গেস্ট হিসাবে একটি বাড়ির পাঁচতলায় থাকতেন। আচমকা দুর্ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালে।

যে বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়ির পাঁচতলা থেকে পড়ে যান নিচে। গুরুতর আঘাত পান মাথায়। প্রাণ বাঁচলেও অক্ষম হয়ে পড়েন। দুর্ঘটনার পর থেকে স্নায়ুর অসুখে ভুগছেন। শরীরের শতভাগই পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

চিকিৎসার ভাষায়, তরুণ হরিশ রানা কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগে আক্রান্ত। লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে কৃত্রিম উপায়ে শ্বাসপ্রশ্বাস চলে। নাকে নল দিয়ে তরল খাবার যায়। 

ছেলের এই ‘অমানবিক’ কষ্ট চোখের সামনে সহ্য করতে না পেরে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন হরিশ রানা বাবা-মা। তার সেরে ওঠার কোনও আশা নেই জেনেই কোর্টের কাছে নিষ্কৃতি-মৃত্যুর আর্জি জানিয়েছিলেন তারা।

 এ বছর জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনের শুনানি হয়। অবশেষে হরিশের জীবনদায়ী ব্যবস্থা খুলে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

আদালত জানিয়েছে, দু’টি কারণের উপর ভিত্তি করে তারা হরিশের নিষ্কৃতি-মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে। এক, হরিশের চিকিৎসা ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি এবং দ্বিতীয়, রোগীর পক্ষে কোনটা সবচেয়ে ভালো। 

একইসঙ্গে আদালত জানিয়েছে, একজন ডাক্তারের দায়িত্ব রোগীর চিকিৎসা করা। ‘যখন রোগীর সেরে ওঠার আশা থাকে না তখন সেই দায়িত্বের আর কোনও অর্থ থাকে না। 

প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি, দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে, “এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবারসহ সব চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন রোগীর জন্য মঙ্গলের।”

ভারতে ২০১১ সালে অরুণা শানবাগ মামলার পর পরোক্ষো স্বেচ্ছা বা নিস্কৃতি মৃত্যুকে কিছু শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতি দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। যদিও তখন ভারতে নিষ্কৃতিমৃত্যু ছিল অবৈধ।

তবে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট পরোক্ষে নিষ্কৃতিমৃত্যু (প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া)-কে আইনি বৈধতা দেয়। এরপর হরিশ রানার ক্ষেত্রেই প্রথমবার পরোক্ষোভাবে নিষ্কৃতিমৃত্যু ঘটানোর বিষয়টি অনুমোদন পেল।

প্যাসিভ ইউথেনেসিয়া আর অ্যাকটিভ ইউথেনেশিয়া কী?

‘প্যাসিভ ইউথেনেসিয়া’ বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু মানে কোনও মানুষকে অসহনীয় যন্ত্রণা বা নিরাময়হীন অসুস্থতা থেকে মুক্তি দেওয়া। 

এক্ষেত্রে জীবনদায়ী চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হলে রোগী স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। 

এই পদ্ধতিতে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে চিকিৎসা ব্যবস্থা চলছে- যেমন: লাইফ সাপোর্ট, ফিডিং টিউব, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আর প্রত্যক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু বলতে চিকিৎসকের ইচ্ছাকৃতভাবে রোগীর মৃত্যু ঘটানোকে বোঝায়। 

এ পদ্ধতিতে সাধারণত ওষুধ প্রয়োগ করে একজন দুরারোগ্য বা মারাত্মকভাবে অসুস্থ রোগীর জীবন শেষ করে দেওয়া হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আজকের রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, মর্যাদার সঙ্গে যেমন বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তেমনি বিশেষ পরিস্থিতিতে মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুরও অধিকার আছে। 

এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ভারতের স্বেচ্ছামৃত্যু আইন নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূচনা করতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকেই।