যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধে কেন গেল? ট্রাম্প-রুবিওর ভাষ্যে অমিল
এমন এক সময়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে এ বিরোধ দেখা যাচ্ছে যখন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা নিয়ে দলটির ভেতরেই সন্দেহ ক্রমশ বাড়ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানই প্রথমে হামলা চালাতে পারে এ ধারণা থেকে তিনিই মার্কিন বাহিনীকে ইরানে ইসরায়েলি হামলায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অথচ আগেরদিনই তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধ কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে ভিন্ন ভাষ্য দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সোমবার মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তেহরানে ইসরায়েলের পরিকল্পিত আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইরান মার্কিন বাহিনীর ওপরও পাল্টা হামলা চালাতে পারে এই ভয় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র হামলায় যোগ দেয়।
“আমরা জানতাম ইসরায়েল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, এর ফলে মার্কিন বাহিনীর ওপরও পাল্টা আঘাত আসতে পারে, এবং আমরা জানতাম যদি তাদের (ইরান) ওই হামলা শুরুর আগে আমরা আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে না যাই তাহলে আমরা অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হব,” বলেছিলেন তিনি।
ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে নিয়ে গেছে—ট্রাম্প মঙ্গলবার এ ধারণাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। ইরানে যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে তার প্রশাসনের এমন আলাদা আলাদা মত রিপাবলিকান সমর্থকগোষ্ঠীর ভেতর যুদ্ধ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তিকেই স্পষ্ট করছে। প্রেসিডেন্ট যে ‘অকারণে নিজের পছন্দে এ যুদ্ধ শুরু করেছেন’, ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি ট্রাম্পের অনেক সমর্থকও এখন এ কথা বলা শুরু করেছেন।
“আমিই হয়তো তাদের (ইসরায়েল) বাধ্য করেছি। আমরা এই পাগলাটে লোকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, এবং আমারই মত ছিল যে তারা আমাদের ওপর প্রথম আক্রমণ করতে যাচ্ছে। আমরা যদি (হামলা শুরু) না করতাম, তারাই আমাদের ওপর হামলা করতে যাচ্ছিল। আমি এটা দৃঢ়ভাবে অনুভব করছিলাম,” ওভাল অফিসে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সাংবাদিকদের এমনটাই বলেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য নানান যুক্তি খুঁজলেও ইরান শুরু থেকেই তাদের ওপর আক্রমণকে ‘বিনা উসকানিতে হামলা’ বলে আসছে।
যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের নয়, ইসরায়েলের—রুবিওর এ ভাষ্যকে সামনে এনে রক্ষণশীল অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকারই ইরানে হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন।
“তার কথার সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াচ্ছে, আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে আছি, কারণ ইসরায়েল আমাদের বাধ্য করেছে। তিনি কার্যত সবচেয়ে খারাপ কথাটাই বলেছেন,” রুবিওর ভাষ্য প্রসঙ্গে এক্সে ৪০ লাখ অনুসারীকে এমনটাই বলেছেন রক্ষণশীল পডকাস্টার ম্যাট ওয়ালশ।
আরেক রক্ষণশীল পডকাস্টার মেগান কেলি বলছেন, ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।
“ইরান বা ইসরায়েলের খোঁজখবর করা আমাদের সরকারের কাজ নয়। তাদের কাজ হচ্ছে আমাদের খোঁজখবর নেওয়া। এটাকে স্পষ্টতই ইসরায়েলের যুদ্ধ মনে হচ্ছে আমার,” রুবিরও মন্তব্যের আগেই এ কথা বলেছিলেন কেলি।
এমন এক সময়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে এ বিরোধ দেখা যাচ্ছে যখন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়ে দলটির ভেতরেই সন্দেহ ক্রমশ বাড়ছে।
‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ হোয়াইট হাউস
যুদ্ধে জড়ানোর কারণ নিয়ে বিতর্কে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসকেই ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ‘ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে’ উদ্যোগী হতে হয়।
তেহরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলা শুরুর তিন দিন পর মঙ্গলবার প্রথম ট্রাম্প জনসমক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। এর আগে তিনি হামলা নিয়ে দুটি ভিডিও বার্তা, বাছাই করা কয়েক সাংবাদিককে একান্ত সাক্ষাৎকার এবং হোয়াইট হাউসে সোমবার অল্প কয়েকটি মন্তব্য করেছিলেন।
কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই মার্কিন এ প্রেসিডেন্ট এখন বলছেন, ইরান হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে ছিল বলে তার ধারণা। অথচ ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলার আগে বৃহস্পতিবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ওমানের মধ্যস্থতায় ওই আলোচনা ‘ইতিবাচক দিকে যাচ্ছিল’ এবং সামনের দিনগুলোতে আরও আলোচনার পরিকল্পনা হচ্ছিল বলে ভাষ্য ইরানের।
“এটা (হামলা) এমন কিছু, যেটা করাই লাগতো,” বলছেন ট্রাম্প।
এদিকে মঙ্গলবার রুবিও ক্যাপিটল হিলে এসে তার আগের মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “মোদ্দাকথা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে কোনোভাবেই আমাদের ওপর প্রথম আঘাত হানতে দেওয়া যাবে না। এটাই আসল ব্যাপার, বন্ধুরা।”
মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসনের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সঙ্গে কনফারেন্স কলে কোন কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, বিশেষ করে জেনিভায় মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পজামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনার পরও কেন সামরিক অভিযান শুরু করতে হল, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তারা বলেছেন, উইটকফ ও কুশনার বারবার ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে তাগাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানিরা তা না মেনে তাদের দেশের উত্তরাঞ্চলে তেহরান গবেষণা চুল্লিতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার সুযোগ চেয়ে প্রস্তাব দেয়।
এর মাধ্যমে ইরানিরা কার্যত সময়ক্ষেপণের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে মার্কিন দূতদের মনে হয়, বলেন ট্রাম্প প্রশাসনের ওই দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
“(পরমাণু) বোমা বানাতে যা যা দরকার, সেসব উপকরণ হাতছাড়া করতে কোনোমতেই রাজি হচ্ছিল না,” বলেন এক কর্মকর্তা।
ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি একেবারেই শান্তিপূর্ণ, এবং তারা বোমা বানাতে কাজ করছিল না।
জেনিভা আলোচনা থেকে ফিরে উইটকফ ও কুশনার ট্রাম্পকে জানান, ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও অন্য বিশ্ব শক্তিগুলো ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিল সেরকম একটা চুক্তি হয়তো করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে পৌঁছাতেও কয়েক মাস লেগে যাবে।
পরদিনই ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন, যার ধারাবাহিকতায় শনিবার থেকে হামলা শুরু হয়।
