ইউক্রেইনের ‘দুর্গ বলয়ের’ প্রবেশদ্বারগুলোতে রাশিয়ার হামলা
ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলীয় সুরক্ষিত ‘দুর্গ বলয়ের’ অন্যতম প্রধান ঘাঁটি কোস্ত্যন্তিনিভকার উপকণ্ঠে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। রুশ সেনাদের ছোট ছোট দল সেখানে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছে।
রণক্ষেত্রের অন্যান্য অংশে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি মূলত স্থবির হয়ে পড়লেও ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলীয় সুরক্ষিত ‘দুর্গ বলয়ের’
অন্যতম প্রধান ঘাঁটি কোস্ত্যন্তিনিভকার দিকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে রাশিয়া।
ইতিমধ্যে শহরটির উপকণ্ঠে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে এবং রুশ সেনাদের ছোট ছোট দল সেখানে ঢোকার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে গত সপ্তাহে জানিয়েছেন ইউক্রেইনের কমান্ডাররা।
শিল্পসমৃদ্ধ দোনেৎস্ক অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ইউক্রেইনীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা ৪টি প্রধান ঘাঁটির মধ্যে কোস্ত্যন্তিনিভকা সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেইনের মাঝারি পাল্লার ড্রোন হামলায় রাশিয়ার রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হলেও জনবলের দিক থেকে মস্কোর আধিপত্যের কারণেই তারা এই অভিযান চালিয়ে যেতে পারছে।
ফিনল্যান্ডের ব্ল্যাক বার্ড কনফ্লিক্ট অ্যানালিসিস টিমের এমিল কাস্তেহেলমি বলেন, ড্রোন হামলার প্রভাব এতটা বেশি ছিল না যা রুশ বাহিনীকে আক্রমণ স্থগিত করতে বাধ্য করবে। ফলে পশ্চাদভাগে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পরও নির্দিষ্ট কিছু সেক্টরে রাশিয়া তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
কোস্ত্যন্তিনিভকার দখল করতে পারলে রুশ বাহিনী উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি শক্তিশালী অবস্থান পাবে,যা বর্তমানে তাদের অভিযানের মূল লক্ষ্য। তবে এই শহরটি দখল করা পোক্রোভস্ক বা আভদিভকার মতো দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জোর দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পুরো দোনেৎস্কের নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে আসতে হবে। ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে দোনেৎস্কের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা এখনও ইউক্রেইনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গত সপ্তাহে পুতিন দাবি করেছিলেন যে, রাশিয়া কোস্ত্যন্তিনিভকার দখলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যুদ্ধপূর্ব প্রায় ৭০,০০০ জনসংখ্যার এই শহরে এখন মাত্র ২,০০০ মানুষ অবশিষ্ট রয়েছেন।
তবে কিইভের ১৯তম আর্মি কোরের জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা পুতিনের এই দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, তাদের সেনারা রুশ সেনাদের প্রতিহত করছে।
ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলীয় অপারেশনাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল ভিক্টর নিকোলিউক গত বৃহস্পতিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান জনবল ও সম্পদ দিয়ে কোস্ত্যন্তিনিভকার রক্ষা করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ তাদের ২৩ জুনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, ইউক্রেইনের জন্য পরিস্থিতি খারাপ হলেও রুশ বাহিনীর এই অনুপ্রবেশ কোনও দ্রুত অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট নয়।
তবে ওপেন সোর্স ম্যাপিং গ্রুপ ডিপস্টেটের ইউক্রেইনীয় বিশ্লেষক মিকুলা বলেন, রুশ বাহিনী শহরটিকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করায় কিইভকে প্রতিরক্ষার জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এখন কিইভকে হয় প্রতিরোধ আরও বাড়াতে হবে, না হয় পিছু হটতে হবে। কাস্তেহেলমি মনে করেন, শহরটির পতন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মস্কোর সেনারা দুর্গ অঞ্চলের উত্তর প্রান্তেও চাপ বাড়াচ্ছে, যার ফলে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে নিয়মিত বিমান ও ড্রোন হামলার হুমকিতে রয়েছে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক শহর।
ওই এলাকার সেনারা জানিয়েছেন, কোস্ত্যন্তিনিভকা থেকে উত্তর দিকের সড়কে কামানের গোলা, ড্রোন এবং গাইডেড বোমায় অবকাঠামো বিধ্বস্ত থাকায় ইউক্রেইনীয় সরবরাহ রুটগুলো মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে।
ড্রোন ও মাইন থেকে সড়কটি সুরক্ষিত রাখতে টহল দিচ্ছে দেশটির জাতীয় পুলিশের ‘প্রেডিটর’ রাইফেল ব্রিগেড। তীব্র রোদে সড়কের ওপর ড্রোন প্রতিরোধী জালে আটকে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার কেবলগুলো জ্বলজ্বল করছে।
এখন তথাকথিত ‘কিল জোনের’ ভেতরে খাবার, পানি ও রসদ সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্বয়ংক্রিয় গ্রাউন্ড রোবট, পাশাপাশি সেনারা দ্রুতগতির কোয়াড বাইকেও যাতায়াত করছেন।
৩৪ বছর বয়সী সেনা সদস্য ওলেক্সান্দর কোসমিন বলেন, রুটটি এতটা বিপজ্জনক যে সাধারণ যানবাহনে মৃত ও আহতদের সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব, সবকিছু পায়ে হেঁটেই করতে হচ্ছে।
কাছাকাছি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও ভেঙে পড়েছে। প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে দ্রুঝকিভকা শহরের বাসিন্দারা লড়াই কাছাকাছি চলে আসায় ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে একটি ভ্যানে রুশ ড্রোনের আঘাতে এক দম্পতি নিহত হয়েছেন।
ক্রাইমিয়ায় যাতায়াতের সরবরাহ লাইনে ইউক্রেইনীয় আক্রমণ এবং তেল খাতে দীর্ঘপাল্লার হামলার কারণে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যাহত হলেও কোস্ত্যন্তিনিভকার চারপাশে তাদের এই ধীর অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে।
অধিকৃত কৃষ্ণসাগর উপদ্বীপে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে এবং ব্যক্তি ও ব্যবসার কাছে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষক মিকুলা জানান, সামগ্রিকভাবে রণক্ষেত্রে রুশ বাহিনী অতিরিক্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং ফ্রন্টলাইন হামলায় প্রায়শই মাত্র ১ বা ২ জন সেনা অংশ নিচ্ছে। তবে ক্রেমলিন-নিযুক্ত দোনেতস্কের প্রধান ডেনিস পুশিলিন রয়টার্সকে বলেন, আরও শহর দখলের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার কট্টরপন্থিরা পুতিনকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট শান্তি প্রক্রিয়া বর্জন করে মস্কোসহ বিভিন্ন স্থানে ইউক্রেইনীয় হামলার জবাবে যুদ্ধ আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
