কেমন চলছে প্রাচীনতম টেলিকমের আধুনিক পথচলা?
টেলিগ্রাফ মেশিনের যুগ বহু আগে শেষ হলেও যুক্তরাজ্যজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান নিশ্চিত করাই এখনও বিটি গ্রুপের মূল কাজ।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্রডব্যান্ড, মোবাইল সেবা এবং অধিকাংশ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মূল অবকাঠামোর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত বিটি গ্রুপ। তবে এর ইতিহাস বাসা-বাড়িতে টেলিফোন যন্ত্রটি ছড়িয়ে পড়ার বহু আগের।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, বিটির এ শেকড় মূলত ছড়িয়ে রয়েছে ১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ কোম্পানি’র সঙ্গে।
উইলিয়াম ফাদারগিল কুক ও চার্লস হুইটস্টোনের উদ্ভাবিত বৈদুতিক টেলিগ্রাফ প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে কুক নিজে ও ব্যবসায়ী জন লুইস রিকার্ডো মিলে এ কোম্পানিটি গড়ে তোলেন।
১৮৫৫ সালে ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ কোম্পানি ‘ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ কোম্পানি’র সঙ্গে একীভূত হয়ে গঠিত হয় ‘ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ কোম্পানি’।
পরবর্তীতে ১৮৭০ সালে তৎকালীন সরকারি ডাক বিভাগ বা ‘জেনারেল পোস্ট অফিস’ তা অধিগ্রহণ করে। ফলে বিটি গ্রুপ যে ১৮৪৬ সালকে তাদের প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে দাবি করে তা প্রায় দুই শতক ধরে কোনো একক কোম্পানির টিকে থাকার কারণে নয়; বরং তাদের ঐতিহাসিক মূলধারার সূত্রে পাওয়া।
কেবল বিটি গ্রুপই এত পুরানো ঐতিহ্যের একমাত্র টেলিকম কোম্পানি নয়। সুইডেনের ‘টেলিয়া’র সূচনা ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এক সরকারি টেলিগ্রাফ সংস্থার হাত ধরে, ‘টেলিকম ইজিপ্ট’ ১৮৫৪ সালে তাদের প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন প্রতিষ্ঠার সময়কাল বলে এবং নরওয়ের ‘টেলেনর’ ১৮৫৫ সালের নরওয়েজিয়ান টেলিগ্রাফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে তাদের পথচলা হিসাব করে।
ফ্রান্স এ ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে। ১৭৯৪ সালেই তাদের সরকারি অপটিক্যাল টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্কের সূচনা হয়েছিল। তবে সমস্যা হচ্ছে, এসবের কোনোটিকেই সরাসরি একে অপরের সঙ্গে পাশাপাশি রেখে তুলনা সম্ভব নয়।
বিটির মতোই এসব কোম্পানির ইতিহাসও বিভিন্ন সময়ে সরকারি সংস্থা, প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও পরবর্তীকালে বাণিজ্যিক কোম্পানিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে।
এ কারণেই বিশ্বের ‘সবচেয়ে পুরানো’ টেলিকম কোম্পানি নির্বাচন করা কেবল কয়েকটি জন্মতারিখ মেলানোর চেয়ে বেশি জটিল আর বিতর্কিত।
বহু চড়াই-উৎরাই পার করা বিটি’র পথচলা
ভিক্টোরিয়ান আমলের ব্রিটেনে একেবারে নতুন এক প্রযুক্তির সূচনাপ্রাতে ব্রিটিশ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার কাঠামো ঠিক যেমনটি হওয়ার কথা ছিল পরিস্থিতি হয়েছিল তেমনই।
দেশজুড়ে যখন হঠাৎ করে হাজারও তারের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল তখন আইনপ্রণেতারা বুঝে উঠতে পারছিলেন না এগুলো নিয়ে কী করা উচিত।
সেই সুযোগে বিভিন্ন কোম্পানি নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক নেটওয়ার্ক তৈরি করছিল, যেমন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি করছিল এবং গ্রাহক দখলের লড়াইয়ে নেমেছিল।
১৮৬০-এর দশকের শেষদিকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আলোচনা শুরু হয়, সরকার কি এসব টেলিগ্রাফ কোম্পানিকে কিনে নিয়ে পুরো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ডাক বিভাগের অধীনে দিয়ে দেবে কি না। তবে সবাই এই প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন না।
১৮৬৮ সালে পার্লামেন্টের বিতর্কের সময় তৎকালীন এমপি জর্জ গোশেন এ চিন্তাকে ‘হাস্যকর’ বলে বর্ণণা করেছিলেন।
তার ভাষ্য, ডাক বিভাগ গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের মধ্যে কখনো ‘টেলিগ্রামের চাহিদা বা ক্ষুধা’ তৈরি করতে পারবে না। কারণ তারা অনেক কম খরচে চিঠি পাঠাতেই অভ্যস্ত।
তবে সেই বিরোধিতায় কান না দিয়ে পার্লামেন্ট বিলে অনুমোদন দেয়। রাজ্য নিয়ন্ত্রণের অধীনে এনে বিভিন্ন টেলিগ্রাফ ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৭০ সালে ‘ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ কোম্পানি’ পোস্ট অফিসের বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়।
পরবর্তীতে টেলিফোন পরিকাঠামোও একই পথ অনুসরণ করে। ১৯১২ সালে ‘ন্যাশনাল টেলিফোন কোম্পানি’কে পোস্ট অফিস ব্যবস্থার অংশ করে নেওয়া হয়। এরপর ১৯৮০ সালে ‘পোস্ট অফিস টেলিযোগাযোগ’ বিভাগটির নতুন নাম হয় ‘ব্রিটিশ টেলিকম’।
অবশেষে ১৯৮১ সালে ‘ব্রিটিশ টেলিকমিউনিকেশন্স’ আনুষ্ঠানিকভাবে পোস্ট অফিসের সব টেলিকম ও ডেটা-প্রসেসিং কার্যক্রমের দায়িত্বভার নেয়।
এরপর ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকার নবগঠিত ‘বিটি পিএলসি’র সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে।
কাজেই, ১৮৪৬ সাল থেকে আজকের বিটি গ্রুপের পথচলা যে কোনো সহজ-সরল বা সরলরেখার ইতিহাস নয় তা স্পষ্ট!
বর্তমান যুগের বিটি রূপরেখা
টেলিগ্রাফ মেশিনের যুগ বহু আগে শেষ হলেও যুক্তরাজ্যজুড়ে তথ্যের আদান-প্রদান নিশ্চিত করাই এখনও বিটি গ্রুপের মূল কাজ। আধুনিক বিটি তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড বিটি, ইই ও প্লাসনেট-এর পাশাপাশি বিভিন্ন কর্পোরেট সেবা পরিচালনা করে।
এর বাইরে কোম্পানিটি ‘ওপেনরিচ’-এর মালিক, যা যুক্তরাজ্যের প্রধান ল্যান্ডলাইন ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের মূল অবকাঠামো কোম্পানি।
আদি টেলিগ্রাফ ব্যবসায়ের আসল চেতনা যদি আধুনিক বিটির কোনো অংশের মধ্যে টিকে থাকে তবে তা সম্ভবত এই ‘ওপেনরিচ’।
সাধারণ গ্রাহকদের কাছে সরাসরি সেবা বিক্রির বদলে ওপেনরিচ বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তামার তার ও ফাইবার কেবল নেটওয়ার্কের দেখভাল করে। সেখান থেকেই শত শত টেলিকম ও ব্রডব্যান্ড কোম্পানি গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার জন্য সংযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছে।
যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘অফকম’-এর সংস্কার প্রস্তাবের পর থেকে ওপেনরিচ বিটি থেকে আলাদা হয়। যার নিজস্ব পর্ষদ, কর্মী, ব্যবস্থাপনা ও কৌশল রয়েছে। অবশ্য অফকম বিটিকে এর পূর্ণ মালিকানা ছাড়তে বাধ্য না করায় কোম্পানিটি এখনও বিটি গ্রুপের অধীনেই রয়েছে।
মোবাইল সেবাও আধুনিক বিটির রূপান্তরের আরেক বড় অংশ। ২০১৬ সালে ‘ইই’ অধিগ্রহণ শেষ করার পর বিটি তৎকালীন যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় মোবাইল নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ পায়।
বর্তমানে ইই’র ফাইভজি+ নেটওয়ার্ক দেশটির প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। এ ছাড়া বিটি তাদের ব্রডব্যান্ড গ্রাহকদের জন্য ২০২৬ সালে আবারও ফিরিয়ে এনেছে ‘বিটি মোবাইল’ সেবা।
১৮৪৬ সালে বিটির গোড়াপত্তন করা উইলিয়াম কুক হয়ত আজকের এ ডিজিটাল রূপ দেখে কিছুই চিনতে পারতেন না, তবে দেশজুড়ে ছড়ানো তারের বড় জাল দেখে হয়ত কিছুটা সান্ত্বনা পেতেন।
৩০ জুনের তথ্য অনুসারে, ওপেনরিচের ফুল-ফাইবার নেটওয়ার্ক এখন যুক্তরাজ্যের ২ কোটি ৩৪ লাখের বেশি ভবনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে সংযোগ চালু রয়েছে ৯৪ লাখ গ্রাহকের।
