মানসিক স্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষা প্রশ্নে আদালতে কোণঠাসা জাকারবার্গ
এ মামলা শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির পক্ষ থেকে মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম ডিজাইনে আমূল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
টিনএজারদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক মামলায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের একের পর এক কড়া জেরার মুখে পড়েছেন মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গ।
বুধবার বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানির বিরুদ্ধে চলা ঐতিহাসিক এক মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন মেটা প্রধান। মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করছে কি না তা যাচাইয়ে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না মেটা।
জাকারবার্গ দাবি করেছেন, মেটা এখন কমবয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্তের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, “আমি সব সময় চেয়েছি, আমরা যাতে এই পর্যায়ে আরও আগেই পৌঁছাতে পারি।”
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অনেকেই নিজের বয়স নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেয়। জাকারবার্গ বলেছেন, কোম্পানি যাদের চিনতে পারে তাদের অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দেয়।
এ দাবির বিপরীতে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, “আপনি কি আশা করেন যে, নয় বছরের একটি শিশু সব নিয়মকানুন পড়ে দেখবে? এর ওপর ভিত্তি করেই কি আপনি শপথ করে বলছেন, ১৩ বছরের কম বয়সীদের অনুমতি দেওয়া হয় না?”
বয়স যাচাইকরণ নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ার পর জাকারবার্গ এক পর্যায়ে বলেছেন, “আমি বুঝতে পারছি না বিষয়টি কেন এত জটিল মনে হচ্ছে। আমি মনে করি দায়িত্বশীল কোম্পানির উচিত তাদের পরিষেবা ব্যবহারকারী মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করা।”
জেরার মুখে তার কথা বলার ধরন ও মিডিয়া ট্রেইনিং নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কিছুটা রসিকতা করে জাকারবার্গ বলেছেন, “অনেকেই জানেন যে, আমি আসলে এ কাজে (কথা বলায়) খুব একটা দক্ষ নই।”
আদালতে মেটা প্রধানের পাশে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা ‘মেটা রে-ব্যান এআই চশমা’ পরে ছিলেন। তবে আদালতে বিচারক সতর্ক করে বলেছেন, এ ডিভাইস দিয়ে কেউ যদি ভিডিও রেকর্ড করেন তবে তাকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা হবে।
নিউ ইয়র্ক পোস্ট প্রতিবেদন লিখেছে, আদালতে প্রবেশের সময় মেটাল ডিটেক্টরে তল্লাশির সময় একজন নিরাপত্তা রক্ষী জাকারবার্গকে প্রশ্ন করেছেন তার কাছে কোনো ধাতব বস্তু আছে কি না। উত্তরে জাকারবার্গ বলেছেন, “আমার গলায় একটি সোনার চেইন আছে।”
বাদীপক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের সামাজিক মাধ্যমকে এমনভাবে ডিজাইন করেছে, যাতে ব্যবহারকারীরা এতে আসক্ত হয়ে পড়েন।
তারা জাকারবার্গকে প্রশ্ন করেন মেটার বিভিন্ন পণ্য তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি করতে পারে সে সম্পর্কে তিনি জানতেন কি না। আইনজীবীরা এরইমধ্যে মেটার কিছু অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশ করেছেন, যা তাদের এই দাবিকে সমর্থন করে।
প্রথমবারের মতো জুরির সামনে শিশু নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে জবাবদিহি করতে হল জাকারবার্গকে। দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল আইন ব্যবহার করে দায়মুক্তি পেয়ে আসছিল, যেখানে বলা আছে ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কোনো কনটেন্টের জন্য প্ল্যাটফর্মকে দায়ী করা যাবে না।
তবে এবার আইনজীবীরা নতুন এক কৌশল নিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিগত কোনো কনটেন্টের বদলে অ্যাপের ‘ক্ষতিকর ডিজাইন’কে দায়ী করছেন তারা, যাকে এখন পর্যন্ত মেটার পুরানো আইনি প্রতিরক্ষা ঠেকাতে পারেনি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে শুরু হওয়া এ প্রথম মামলাটি ‘কেজিএম’ ছদ্মনামের এক ২০ বছর বয়সী তরুণীকে নিয়ে। তার দাবি, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি তার বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যার চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
কেজিএমের এ মামলাটি প্রায় ২০টি ‘বেলওয়েদার’ বা পরীক্ষামূলক মামলার একটি, যার মাধ্যমে জুরির প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হচ্ছে। টিকটক ও স্ন্যাপ এ প্রাথমিক মামলায় সমঝোতা করে নিলেও অন্যান্য শত শত মামলায় এখনও অভিযুক্ত হিসেবে রয়েছে সামাজিক মাধ্যম কোম্পানি।
এ মামলায় ইনস্টাগ্রাম সিইও অ্যাডাম মোসেরি সাক্ষ্য দেওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর জাকারবার্গ এ জবানবন্দি দিলেন। সামাজিক মাধ্যম আসক্তির বিজ্ঞানভিত্তিক ভিত্তি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে মোসেরি বলেছিলেন, ব্যবহারকারীরা ‘ক্লিনিক্যালি আসক্ত’ হতে পারেন না।
শিশুদের অতিরিক্ত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকে ‘সমস্যাদায়ক ব্যবহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মোসেরি, যা অনেকটা “আপনার ভালো লাগে বলে বেশি সময় ধরে টিভি দেখার মতো”।
মনোবিজ্ঞানীরা এখনও সামাজিক মাধ্যম আসক্তিকে আনুষ্ঠানিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও অনেক গবেষকই তরুণদের মধ্যে এর বাধ্যতামূলক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ পেয়েছেন এবং বিশ্বজুড়ে আইনপ্রণেতারাও এর আসক্তি তৈরির সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দুই বছর আগেও শিশু নিগ্রহ সংক্রান্ত এক উত্তপ্ত শুনানিতে জাকারবার্গ এ ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন সেনেট ফ্লোরে শোকসন্তপ্ত অভিভাবকদের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সে সময় ক্ষমা চেয়ে শিশুদের সুরক্ষায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জাকারবার্গ।
তবে সেসব পরিবার মেটার পদক্ষেপে আশ্বস্ত হতে পারেনি এবং হননি। এখন আদালতের কাছে প্রতিকারের আশা করছে পরিবারগুলো।
এ মামলা শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির পক্ষ থেকে মোটা অংকের ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম ডিজাইনে আমূল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
