মালিকের চোখের পলক মিলিয়ে পলক ফেলে কুকুর: গবেষণা
মানুষ ও কুকুরের পরস্পরের দিকে এ তাকিয়ে থাকার বিষয়টি কেবল সাধারণ কোনো দর্শনের চেয়েও গভীর কিছু হতে পারে।
কুকুরের চোখের দিকে তাকালে হয়ত কখনও একরকম বিভ্রান্ত চাহনির দেখা মেলে, যেখানে মালিককে চোখের পলক ফেলতে দেখলে কুকুরের মধ্যেও ঘন ঘন পলক ফেলার প্রবণতা বাড়ে– এমনই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, মানুষ ও কুকুরের পরস্পরের দিকে এ তাকিয়ে থাকার বিষয়টি কেবল সাধারণ কোনো দর্শনের চেয়েও গভীর কিছু হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ যখন কুকুরদের দিকে তাকায় তখন এরা চোখ বড় বড় করে এক ধরনের করুণাভরা মায়াময় রূপ নেয়। কুকুরের মস্তিষ্ক মানুষের আনন্দের মুখাবয়ব চেনার পাশাপাশি ক্ষোভ বা কষ্টের মুখ থেকে ভয়ের অনুভূতিও আলাদা করতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, আগে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছিল, মানুষ ও কুকুর হয়ত একইসঙ্গে পলক ফেলে ও পরিচিত কোনো ট্রেইনারের চেয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের সময় কুকুররা বেশি পলক ফেলে।
তবে মানুষের পলক ফেলা কুকুরের পলক ফেলার ফ্রিকোয়েন্সি বা হারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে কি না– তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে রয়ে গিয়েছিল।
ইতালির ‘ইউনিভার্সিটি অফ পারমা’র অধ্যাপক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. কিয়ারা কানোরি বলেছেন, “আমরা এখানে পরীক্ষামূলকভাবে মানুষের চোখের পলক ফেলাকে আলাদা করতে চেয়েছিলাম এবং বাস্তব এক সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সময় সচরাচর ঘটে যাওয়া অন্যান্য বিষয় থেকে এটাকে আলাদা করতে চেয়েছিলাম, যা আগে কখনও হয়নি।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘রয়াল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স’-এ।
এ গবেষণায় কানোরি ও তার সহকর্মীরা বলেছেন, তারা বিভিন্ন জাতের ৩৫টি কুকুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছেন, যেখানে এদের দুই ধরনের ভিডিও ফুটেজ দেখানোর পাশাপাশি তা রেকর্ড করে বিশ্লেষণ করা হয়।
৪০ সেকেন্ডের দুটি ভিডিওতেই তিনজন মানুষকে একে একে দেখানো হয় কুকুরের মালিক ও দুজন অপরিচিত ব্যক্তি। একটি ভিডিওতে মানুষেরা প্রতি তিন সেকেন্ডে একবার করে পলক ফেলছিলেন আর অন্য ভিডিওতে তারা পলক না ফেলে সোজা তাকিয়ে ছিলেন।
গবেষণার ফলে দেখা গেছে, পর্দায় থাকা মানুষদের পলক না ফেলার তুলনায় তাদের পলক ফেলার দৃশ্য দেখার সময় কুকুরেরা ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলেছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কুকুররা কেবল তখনই এদের পলক ফেলার হার বাড়িয়েছিল যখন তাদের মালিককে পলক ফেলতে দেখাছিল। এক্ষেত্রে অপরিচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি।
গবেষক কানোরি বলেছেন, “গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে, সঙ্গী বা সঙ্গিনী সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা এখানে বেশ প্রভাব ফেলেছে।”
কুকুর এদের মালিকদের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে ছিল বলেই যে এমন ফল এসেছে তা নয়। কুকুররা মানুষের পলক ফেলার সঙ্গে ঠিক একই সময়ে মেপে মেপে পলক মেলাচ্ছিল– এমন কোনো প্রমাণও গবেষক দলটি পায়নি।
কানোরি বলেছেন, এ গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে, চোখের সুরক্ষা ও তা আর্দ্র রাখার মূল উপায় হিসেবে ব্যবহৃত পলক ফেলার বিষয়টি হয়ত এক ধরনের সামাজিক গুরুত্বও পায়।
“আমরা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে, কোনো বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই কুকুর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পলক ফেলে।
“এমনটা মনোযোগ বা সংযুক্তির সূক্ষ্ম বার্তা প্রকাশ ও অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে, বিশেষ করে সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীর সঙ্গে মেলামেশার সমন্বয়ে সাহায্য করতে পারে।”
কানোরি বলেছেন, মালিকদের উচিত হবে না একক কোনো পলককে কোনো নির্দিষ্ট বা স্থির অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া।
“আমাদের গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, প্রতিবার পলক ফেলার সময় কুকুর যেন কিছু ‘বলতে’ চাইছে। আমাদের গবেষণা বলছে, বাহ্যিকভাবে সাধারণ ও স্বয়ংক্রিয় বলে মনে হওয়া আচরণটি সামাজিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রভাব ফেলতে পারে।
“কুকুরদের অন্যান্য ব্যক্তিদের পলক ফেলার প্রতি সংবেদনশীল মনে হয় এবং কার সঙ্গে পারস্পরিক সংযোগ ঘটছে তার ওপর নির্ভর করে তাদের নিজেদের পলক ফেলাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।”
‘ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনা’র ড. লরা কুয়ায়া এ গবেষণার ফলাফলকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, গবেষণা নকশাটি কুকুর চোখের পলককে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে কি না তা জানানোর চেয়ে মানুষের পলক ফেলাকে তারা কীভাবে দেখে তা নিয়ে বেশি তথ্য দিয়েছে।
এ গবেষণায় তিনি যুক্ত ছিলেন না।
“তার পরও এ গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে, আমাদের মুখের বিভিন্ন সূক্ষ্ম সংকেত, যেমন চোখের পলক ফেলার প্রতি আমাদের কুকুরগুলো কতটা সামাজিকভাবে সংবেদনশীল।
“পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায় সামাজিক পরিস্থিতিতে কুকুরদের সঙ্গে মেলামেশার সময় মানুষের পলক ফেলার আচরণও পরিবর্তিত হয় কি না গবেষকদের তা মেপে দেখতে পারলে আমি বেশ আগ্রহ পাব।”
