বিজ্ঞান প্রজেক্ট থেকে বিশ্বমঞ্চে: চীনা রোবট অলিম্পিকের এক দশক
উৎসুক গবেষক ও ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের আয়োজনে অপেশাদারভাবে শুরু হওয়া এসব রোবট প্রতিযোগিতা বর্তমানে চীনের জাতীয় সক্ষমতা দেখানোর বড় মঞ্চে রূপ নিয়েছে।
ইউনিভার্সিটিতে সাধারণ প্রজেক্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করা চীনের বিভিন্ন রোবট প্রতিযোগিতা কেবল এক দশকের ব্যবধানে জাতীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোর বড় মঞ্চে রূপ নিয়েছে, যা বিশ্ববাজারে দেশটির আধিপত্য ও কৌশলগত অগ্রগতির স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে।
রয়টার্স লিখেছে, ক্রীড়াঙ্গনে বিষয়টিকে ‘রোবট অলিম্পিক’ নামে ডাকা হয়। তবে মানব অলিম্পিকের মতো লড়াইটা সমান প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ না হয়ে সেখানে ঝুলিতে অধিকাংশ পদক ভরছে একটি দল– চীন।
বিগত এক দশক ধরে চীনে আয়োজিত বিভিন্ন রোবট প্রতিযোগিতা প্রযুক্তি খাতের অভাবনীয় অগ্রগতির চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে। একইসঙ্গে স্পষ্ট করছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে এ কৌশলগত শিল্পটির গুরুত্ব।
উৎসুক গবেষক ও ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের আয়োজনে অপেশাদারভাবে শুরু হওয়া এসব রোবট প্রতিযোগিতা বর্তমানে চীনের জাতীয় সক্ষমতা দেখানোর বড় মঞ্চে রূপ নিয়েছে, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়।
তবে প্রদর্শনী ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাস্তবে ব্যবহারের উপযোগী রোবট তৈরির মহড়াক্ষেত্র হিসেবেও বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এখন এ প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগাচ্ছে।
শনিবার থেকে বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেইমস’। রোবটিক্স খাতের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পেছনের বিকাশ ও প্রযুক্তির বিবর্তনের ইতিহাসটি আসলে কেমন?
১৯৯৯ থেকে ২০১৪: ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা
চীনে রোবট প্রতিযোগিতার সূচনা হয়েছিল বেশ কম বাজেটে, একটি শিল্প সমিতি ও ফুজিয়ান স্থানীয় সরকারের অর্থায়নে। প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিত কেবল ইউনিভার্সিটি ভিত্তিক বিভিন্ন দল।
পরবর্তীতে আত্মপ্রকাশ করা বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর বিপরীতে এগুলোর পরিবেশ ছিল অনেকটা বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের মতো।
তৎকালীন প্রদর্শনীগুলোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল চাকাওয়ালা ছোট ছোট রোবট নিয়ে ফুটবল ম্যাচ। এসব রোবটের চলাচলে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা সীমিত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহৃত হত, যেন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা না খেয়ে বলের সন্ধান বের করতে পারে।
২০১৫: রোবোটিক্সকে ‘মুকুটের রত্ন’ ঘোষণা
২০১৫ সালে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স’, যা এ খাতটিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করার বার্তা দিয়েছিল।
এর আগের বছরই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং রোবটিক্স প্রযুক্তিকে উন্নত উৎপাদন শিল্পের ‘মুকুটের রত্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, আর সে খবর প্রকাশিত হয়েছিল চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে।
২০১৫ সালের প্রদর্শনীতে ব্যাডমিন্টন কোর্টে মোবাইল রোবটের খেলা দেখতে পান দর্শকরা। শাটলককের গতিপথ ট্র্যাক করে তা ফিরিয়ে দেওয়ার এ লড়াই দর্শকদের আনন্দ দিলেও কারিগরি দিক দিয়ে খুব বড় কোনো অগ্রগতি ছিল না।
এ ধরনের রোবটগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছিল ২০১০-এর দশকে তৈরি ডিস্টেন্স-ইমেইজ সেন্সর ও তারও পুরোনো ১৯৯০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষকদের উদ্ভাবিত অবজেক্ট ট্র্যাকিং প্রযুক্তি।
২০২৩: ল্যাব থেকে বাসা-বাড়িতে বিস্তার
২০২৩ সাল নাগাদ ‘ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স’ নামিদামি প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য নতুন উদ্ভাবন তুলে ধরা ও সাড়া ফেলার মূল মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
ঠিক এ সময়েই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে বিশ্ববাজারে চীনের সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। চীনা কোম্পানি শাওমির রোবট কুকুর ‘সাইবারডগ’ দেখার জন্য ভিড় জমান দর্শকরা।
শখের বশে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত এসব সাইবারডগের দাম নির্ধারিত হয় প্রায় দেড় হাজার ডলার। বিপরীতে, বস্টন ডায়নামিক্সের চার পায়ের রোবট ‘স্পট’-এর বাজারমূল্য ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি।
২০২৫ থেকে ২০২৬: প্রাথমিক হোঁচট থেকে দীর্ঘ লাফ
২০২৫ সালের এপ্রিলে বেইজিংয়ে বিশ্বের প্রথম রোবট হাফ-ম্যারাথনে মানুষের পাশাপাশি দৌড়াতে দেখা যায় বিভিন্ন হিউম্যানয়েড রোবটকে।
জরুরি প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ নিতে ওই সময় রোবটের পাশেই দৌড়াচ্ছিলেন ইঞ্জিনিয়াররা। তবে দৌড় শুরু করা রোবটের সামান্য অংশই শেষ সীমান্ত স্পর্শ করতে পেরেছিল।
কিছু রোবট শুরুর দাগেই ভেঙে পড়ে, আবার কিছু রোবট কেবল কয়েক মিটার গিয়েই সীমানা প্রাচীরে আছড়ে পড়ে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানেই চিত্র বদলে যায়।
বেইজিংয়ের দ্বিতীয় হাফ-ম্যারাথনে কোনো রকম মানুষের সহযোগিতা ছাড়াই একা একা ফিনিশিং লাইনে দৌড়ে গিয়ে পৌঁছে ‘ইউনিট্রি এইচ১’ নামের রোবট।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ২০২৬ সালের এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ১০০টিরও বেশি রোবট দলের মধ্যে ৪৭টি দল সফলভাবে প্রতিযোগিতা শেষ করেছে।
এর মধ্যে নজরে এসেছে চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা কোম্পানি ‘অনার’-এর তৈরি ‘ফ্ল্যাশ’ -এর পারফরম্যান্স। কোনো সহায়তা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেবল ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হাফ-ম্যারাথন শেষ করে রোবটটি, যা কেবল এক মাস আগে মানুষের গড়ে তোলা বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও প্রায় সাত মিনিট দ্রুততর।
বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি কর্মকর্তারা এ দ্রুত উন্নতির পেছনে ভর্তুকি ও খুচরা যন্ত্রাংশের কম খরুচে অথচ শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থাকে মূল কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন।
এ অগ্রগতির পেছনে রাষ্ট্রের সরাসরি অবদান ছিল। রোবোটিক্স খাতের জন্য ২০২১ সালে বেইজিংয়ের দেওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় ভর্তুকি, গবেষণায় কর ছাড় ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল চীনকে ‘রোবোটিক্স প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে গড়ে তোলা।
২০২৬ ও পরবর্তী সময়: সূক্ষ্ম কাজের চাবিকাঠি এখন ‘হাতে’
২০২৬ সালে আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেইমস’-এ নতুন করে রোবটের ‘হাত’-এর কার্যকারিতা পরীক্ষার এক চ্যালেঞ্জ যোগ হয়েছে।
এই ধাপে স্ক্রু আঁটসাঁট করা, বোতলের মুখ খোলা বা চিমটা দিয়ে পুঁতি তোলার মতো সূক্ষ্ম কাজে রোবটের গতি ও নির্ভুলতা যাচাই করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের মতো সূক্ষ্ম অনুভূতি ও স্পর্শ নিয়ে কাজ করতে পারে এমন হিউম্যানয়েড রোবট বানাতে ‘হাতের’ প্রযুক্তিগত নকশা তৈরি করাই সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ।
প্রতিযোগিতায় এ ধরনের কাজের অন্তর্ভুক্তি প্রতিযোগিতাপূর্ণ রোবট শিল্পের সবচেয়ে বড় বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে আসছে, বিশেষ করে পরীক্ষাগারে তৈরি নমুনা যে বাস্তবেও কার্যকর তা প্রমাণ করা।
