অ্যান্ড্রয়েড ফোনে কি আদৌ অ্যান্টিভাইরাস লাগে?
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যৌক্তিক হতে পারে।
পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসির একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগের পতনের মধ্য দিয়ে থার্ড-পার্টি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারের সেই সোনালী দিনও যেন ইতিহাস হয়ে গেছে।
নর্টন, ম্যাকাফি বা অ্যাভাস্টের মতো পরিচিত নামগুলো বিশ্বজুড়ে উইন্ডোজ পিসি ব্যবহারকারীদের কাছে একসময় নিত্যদিনের সুরক্ষাকবচ ছিল। তবে প্রযুক্তির বিবর্তনে মানুষ যেভাবে পিসি ছেড়ে স্মার্টফোনে ঝুঁকেছে, সেভাবে মোবাইল ফোনে অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টলের মতো কোনো তাড়াহুড়া বা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
এর কারণটা অবশ্য বেশ সাধারণ, আধুনিক অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনগুলোতে আলাদা করে কোনো অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহারের তেমন কোনো প্রয়োজন পড়ে না বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ব্যবহারকারীর হাতের স্মার্টফোনটি যে কোনো ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার আক্রমণের বাইরে। পার্থক্য কেবল একটাই, ফোনটিকে নিরাপদ রাখার পুরো দায়িত্ব এখন কেবল ব্যবহারকারীর ঘাড়েই চেপে থাকে না।
অ্যান্ড্রয়েডের মতো যে কোনো আধুনিক মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমেই এখন ডিভাইস কেনার পর থেকেই প্রাথমিক পর্যায়ের নিরাপত্তা বা ‘আউট-অফ-দ্য-বক্স’ সিকিউরিটি সিস্টেম যুক্ত থাকে।
সাধারণ কাজের ক্ষেত্রে অপারেটিং সিস্টেমের বিল্ট-ইন এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাই যথেষ্ট বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। তবে একজন ব্যবহারকারী ঠিক কী ধরনের কাজের জন্য তার ডিভাইসটি ব্যবহার করছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই নির্ভর করে অতিরিক্ত কোনো সুরক্ষা অ্যাপ দরকার আছে কি না।
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যৌক্তিক হতে পারে।
ম্যালওয়্যার ও সাইবার ঝুঁকি
অন্যান্য সব প্রযুক্তি পণ্যের মতো অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমও ভাইরাস, ম্যালওয়্যার বা নিরাপত্তা ঝুঁকির বাইরে নয়। তবে কম্পিউটারের পাশাপাশি মোবাইল ডিভাইসের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নতুন হুমকিও এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেমন, ক্ষতিকর ‘পুশ নোটিফিকেশন’ বা স্প্যাম মেসেজ। ২০২৫ সালের এক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কেবল তিন মাসের ব্যবধানে এ ধরনের হামলা তিনগুণ হয়েছে। একইসঙ্গে মোবাইল গ্রাহকদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে ‘স্পাইওয়্যার’ বা নজরদারি সফটওয়্যারের ব্যবহার।
তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের স্বস্তি দিয়ে অ্যান্ড্রয়েডে রাখা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ও শক্তিশালী প্রোটেকশন ব্যবস্থা। এ নিরাপত্তাবলয়ের প্রধান হাতিয়ার ‘গুগল প্লে প্রটেক্ট’, যা ক্ষতিকর অ্যাপ থেকে ফোনকে দূরে রাখতে প্রথম সারির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
গুগলের দেওয়া তথ্য অনুসারে, কেবল ২০২৫ সালেই প্লে স্টোর থেকে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ নতুন ক্ষতিকর অ্যাপ ব্লক করেছে মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি। প্লে প্রটেক্ট প্রযুক্তিটি ফোনে যে কোনো অ্যাপ ইনস্টলের সময় ও ইনস্টল করার পরও নিয়মিতভাবে স্ক্যান করে। কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি ধরা পড়লে অ্যাপটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোন থেকে মুছে ফেলা হয়।
ফোনের নিরাপত্তা জোরদার করতে ‘স্যান্ডবক্সিং’ নামের প্রযুক্তি ব্যবহার করে অ্যান্ড্রয়েড। যার মাধ্যমে প্রতিটি অ্যাপকে নির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত ‘ইউজার আইডি’ দেওয়া হয়, যা অ্যাপগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে কাজ করতে বাধ্য করে।
ফলে একটি অ্যাপ চাইলেই ব্যবহারকারীর ফোনের অন্য কোনো অ্যাপের তথ্যে নজরদারি করতে পারে না। পাশাপশি নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট ও পারমিশন ব্যবস্থার কারণে ব্যবহারকারীর গ্যালারি, কনট্যাক্ট ও ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা সংরক্ষিত থাকে।
কোনো অ্যাপ যদি অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্যের এক্সেস চায়, তবে প্লে প্রটেক্ট তা নিয়ে সতর্ক বার্তা পাঠায় এবং দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা বিভিন্ন অ্যাপের পারমিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেয়।
অ্যান্ড্রয়েডের এ নিরাপত্তা বলয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত আধুনিক এবং এতে যোগ হচ্ছে এআই প্রযুক্তি। ব্যাংক বা কোনো কোম্পানির ভুয়া প্রতিনিধি সেজে ফোন করা প্রতারকদের ঠেকাতে ‘ফোন কল স্পুফিং প্রটেকশন’ সিস্টেম চালুর কাজ চলছে।
এ ছাড়া অ্যাপের কোনো সন্দেহজনক আচরণ যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করতে কাজ করছে এআই। অফিশিয়াল স্টোরের বাইরে থেকে অ্যাপ ইনস্টল বা ‘সাইডলোডিং’ ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে গুগল।
খুব শিগগিরই কেবল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যবহারকারীদের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে প্লে স্টোরের বাইরের অ্যাপ ইনস্টলের সুযোগ থাকবে, যেখানে ডেভেলপারদের বাধ্যতামূলক পরিচয় যাচাইয়ের মুখে পড়তে হবে।
স্মার্টফোনে অ্যান্টিভাইরাস সত্যিই কি সবার জন্য প্রয়োজন?
বেশিরভাগ সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে আলাদা করে কোনো অ্যান্টিভাইরাস অ্যাপ ব্যবহারের দরকার নেই বললেই চলে। ক্ষতিকর ও সন্দেহজনক অ্যাপ থেকে সুরক্ষা দিতে সিস্টেমে আগেই ইনস্টল করা থাকে গুগলের প্লে প্রটেক্ট।
অনলাইনে নিরাপদ ট্রাফিকের জন্য সাধারণ একটি ভিপিএন অ্যাপই যথেষ্ট। ডিজাইনগত দিক থেকেই অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপগুলোকে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি ডেটা আদান-প্রদান করতে দেওয়া হয় না।
পাশাপাশি পারমিশন বা অনুমতি নেওয়ার কড়াকড়ি থাকায় ব্যবহারকারী নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন কোনো অ্যাপ ফোনের কোন তথ্যে প্রবেশ করতে পারবে। তবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাসের কারণে অনেক ব্যবহারকারী বিশেষ নজরদারির আওতায় পড়তে পারেন।
এ নজরদারির কারণ হতে পারে অপরিচিত বা অনিরাপদ সাইট থেকে অ্যাপ নামানো বা গুগলের প্লে প্রটেক্ট অপশনটি বন্ধ রেখে ফোন ব্যবহার করা। এসব কারণে ফোনে ম্যালওয়্যার বা ভাইরাসের আক্রমণের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
এ ধরনের বিশেষ পরিস্থিতিতে ফোনের সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কোনো বিশ্বস্ত থার্ড-পার্টি অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করা যৌক্তিক হতে পারে। বাজারে নর্টন এখনও সেবা দিয়ে যাচ্ছে, যারা ভাইরাসের সুরক্ষার পাশাপাশি ভিপিএন, ক্ষতিকর বিজ্ঞাপন ব্লক ও সন্দেহজনক এসএমএস ফিল্টারের মতো সুবিধাও দেয়।
যে কোনো নিরাপত্তা প্রযুক্তির চেয়ে সচেতনতাকেই প্রধান প্রতিরোধক হিসেবে মনে করেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। যেসব অভ্যাস স্মার্টফোনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে সেগুলো এড়িয়ে চলাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
কার্যকর এসব সমাধানের মধ্যে রয়েছে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোন কলের বিষয়ে সতর্ক থাকা, পরিচিত কারো অ্যাকাউন্ট থেকে আসা সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা বা যে কোনো বার্তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে দেখা।
সব মিলিয়ে ফোনে আলাদা অ্যান্টিভাইরাস অ্যাপ না থাকা কোনো অপরাধ বা ত্রুটি নয়। অনেকেই মনে করেন বর্তমান যুগে এর কোনো বাস্তব প্রয়োজনীয়তাই নেই। তবে, এর সঠিক উত্তর নির্ভর করে ব্যবহারকারী নিজে কীভাবে তার ডিভাইসটি ব্যবহার করছেন তার ওপর।
তবে স্বস্তির বিষয়, অ্যান্ড্রয়েডের বিল্ট-ইন বা স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বেশিরভাগ গ্রাহক অজান্তেই প্রতিদিন সুরক্ষিত থাকেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিত্যনতুন সাইবার হুমকি ঠেকাতে এ প্রযুক্তিও আরও উন্নত হচ্ছে।
