‘বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানে শ্রীমঙ্গলে পাঠাভ্যাস গড়ার উৎসব
আটটি গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন ৮০ জন বিজয়ী। আগামী ১০ অক্টোবর তাদের নাম ঘোষণা করে পুরস্কৃত করা হবে।
‘বই পড়ি, মন গড়ি’ স্লোগানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার এক ব্যতিক্রমী কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ উৎসব শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী ও গৃহিণীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
শ্রীমঙ্গল বই পড়া উৎসব-২০২৬-এর প্রধান সমন্বয়ক ও শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসবের নির্বাহী পরিচালক দেবাশীষ দাশ বলেন, উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বই পড়ার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু প্রায় তিন মাস ধরে ধাপে ধাপে বই পড়ানো এবং উন্মুক্ত বিভাগে সাধারণ পাঠকদের অংশগ্রহণ- সব মিলিয়ে আয়োজনটির ব্যাপ্তি আরও বড় হয়ে ওঠে।
তিনি জানান, গত ২১ জুলাই শুরু হওয়া প্রথম ধাপ ‘মুকুল পর্বে’ অংশ নেয় মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।
সেখান থেকে বাছাই করে দ্বিতীয় ধাপে ‘ফুল পর্বে’ নির্বাচিত করা হয় ১ হাজার ৯৫৭ জনকে। এর পর সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর ‘ফল পর্বে’ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৭৬০ জন।
তাদের মধ্য থেকেই আটটি গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন ৮০ জন বিজয়ী। আগামী ১০ অক্টোবর তাদের নাম ঘোষণা করে পুরস্কৃত করা হবে।
দেবাশীষ দাশ বলেন, এটি কেবল প্রতিযোগিতা নয়; মোবাইল ফোন ও স্ক্রিননির্ভরতার সময়ে নতুন প্রজন্মকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনার একটি সামাজিক আন্দোলন। কে বিজয়ী হলো তার চেয়ে বড় বিষয় একজন শিক্ষার্থী বই পড়েছে এবং নতুন একটি বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, উৎসবের প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিফিনের সময়ে। যে সময়ে অনেক শিক্ষার্থী আড্ডা কিংবা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকত, এখন সেই সময়ের একটি অংশ বই পড়ায় কাটছে। এ বিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরিগুলোর সচল করার নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী বলেন, একসময় শিক্ষার্থীদের বই পড়ার আগ্রহ কমে গিয়েছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানের পাঠাগারও প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিল। বইপড়া উৎসবের পর পাঠাগারে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও বইয়ের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
শ্রীমঙ্গল উত্তরণের কর্ণধার ও শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের মতে, শিক্ষার্থীদের আচরণেই পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কেউ ইতিহাস পড়ছে, কেউ বিজ্ঞান, কেউ ভ্রমণকাহিনী কিংবা বিশ্বসাহিত্য।
শ্রীমঙ্গল শহীদ সাজ্জাদ বিজিবি পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌলি জানায়, উৎসবের কারণে সে শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
শ্রীমঙ্গল নটরডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী শোভাদিত্য বিশ্বাসও জানায়, পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার প্রতি তার আগ্রহ বেড়েছে।
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরীও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় উৎসাহ দিয়েছেন। প্রতিটি ক্যাটাগরির সেরা পাঠককে ল্যাপটপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলও শ্রীমঙ্গলের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের বই পড়তে উৎসাহ দেন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভ্রমণ ও বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, পুরস্কার পাবে ৮০ জন; কিন্তু এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে সেই হাজারো শিক্ষার্থী, যারা বই হাতে নিয়েছে এবং হয়তো বই পড়াকে নিজেদের জীবনের অভ্যাসে পরিণত করবে।
