২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

সৌদিতে আগুনে নিহত ১৬: বাড়ি আসার প্রস্তুতির মধ্যেই নিভল শ্যামলের জীবন

পাঁচ দিন পরেই বাড়ি ফিরে মেয়ের বিয়ের দেওয়ার কথা ছিল রাজশাহীর বাঘমারার শ্যামল মাঝির।

রাজশাহী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 10 Aug 2026, 08:53 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:33 PM

রাজশাহীর বাগমারার সৌদি আরব প্রবাসী শ্যামল উদ্দীন মাঝির ফেরার কথা ছিল চলতি মাসের ১৪ তারিখে। সেভাবেই প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। স্ত্রীকে বলেছিলেন, এবার বাড়ি এসে মেজ মেয়েকে বিয়ে দেবেন।

পরিবারের এই আনন্দের আবহের মধ্যেই রোববার কারখানায় কাজ করার সময় আগুন কেড়ে নেয় শ্যামলের জীবন। রোববার পরিবার সেই খবর পায়।  

তারপর থেকেই শ্যামলের বাড়িতে বিরাজ করছে শোকাবহ পরিবেশ। খবর পেয়ে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তারা শ্যামলের স্ত্রী রশিদা বিবি, তিন কন্যাসহ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে আসেন। কিন্তু তাদের চোখেও ছিল জল।  

রশিদা বিবি বিলাপ করছিলেন, “বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে মানুষের ঋণের টাকা পরিশোধ করার পর বাড়ির কাজ শুরু করেছিল। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করবে এবং মেয়েকে বিয়ে দেবে এ কথা আমাকে রাতেই জানিয়েছিল। কিন্তু সকালে তার সঙ্গে কাজ করা লোকজন ফোন করে জানায়, আগুনে পুড়ে সে মারা গেছে।”

“হায় আল্লাহ এখন আমার মেয়েদের কী হবে? আমি কার কাছে যাব। আমাদের মেয়েদের কে দেখবে?”

পরিবার জানায়, জীবিকার তাগিদে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ২০১৯ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শ্যামল উদ্দীন। ধীরে ধীরে ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। এরপর দেশে থাকা পরিবারের জন্য চার কক্ষের একটি পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তবে বাড়িটির নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি।

শ্যামল উদ্দীন মাঝির তিন মেয়ে। বড় মেয়ে শামীমা আক্তারের বিয়ে হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়ে নাদিয়াকে বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। 

পরিবারের সদস্যরা বলেন, মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন শ্যামল।

কাঁদতে কাঁদতে রশিদা বিবি বলছিলেন, “মেয়েদের সুখের জন্যই সে বিদেশে গিয়েছিল। কত স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। আমরা চাই, দ্রুত আমার স্বামীর মরদেহ দেশে এনে দাফনের ব্যবস্থা করা হোক।”

বড় মেয়ে শামীমা আক্তারও বাবার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা বাবার মরদেহ দ্রুত দেশে চাই। বাবাকে শেষবারের মত দেখতে চাই এবং গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে চাই।”

ঝিকরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, শ্যামল উদ্দীন মাঝির মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দাফনের ব্যবস্থা করতে পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তিনি নিয়মিত নিহতের পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, শ্যামল উদ্দীন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। বিদেশে গিয়ে পরিশ্রম করে একটি বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। বাড়িটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। তার কোনো ছেলে সন্তান নেই, তিনটি মেয়ে রয়েছে। 

সৌদি আরবে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনেরই বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। দুজনের বাড়ি পাশের নাটোর জেলার নলডাঙ্গায়। অপরজনের বাড়ি আত্রাই লাগোয়া রাজশাহীর বাগমারায়।

আত্রাইয়ের নিহতরা হলেন—উজনপই গ্রামের ফরিদ ,ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন, গন্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামানিক, একই গ্রামের বজলুর প্রামানিকের ছেলে কলিমউদ্দিন, গুফফার প্রামানিকের ছেলে মোহন ও সুমন; একই থানার মিনহাজ, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ গ্রামের শাহিন; খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল, একই গ্রামের মজনুর ছেলে মজিদুল, সাদনগর গ্রামের সাগর।

নলডাঙ্গার দুজন হলেন—দিঘীরপাড় গ্রামের শামিম এবং খাজুরা গ্রামের সাকিব।

আরও পড়ুন:

সৌদিতে ১৬ বাংলাদেশি নিহত: শোকস্তব্ধ গন্ডগোহালী, চারজনের স্বপ্ন পুড়ল আগুনে

রিয়াদে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু: বেঁচে গেছেন কেবল একজন

সৌদিতে সোফা কারখানার আগুনে নিহতদের ১৬ জনই বাংলাদেশি