শরীয়তপুরে এবার পদ্মার ডান তীর রক্ষাবাঁধে ভাঙন, ৫ বাড়ি বিলীন
জাজিরার উকুল উদ্দিন মুন্সিকান্দি এলাকায় বুধবার ভোরের দিকে ভাঙন দেখা দেয়। এতে ওই এলাকার ১৫০ মিটার অংশ নদীতে চলে যায়।
পদ্মায় স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও বেড়েছে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা এলাকায়।
এতদিন পদ্মা সেতু প্রকল্পের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড রক্ষাবাঁধ ভাঙলেও এখন নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে ডান তীর রক্ষাবাঁধ প্রকল্প এলাকায়।
বুধবার রাতে দুটি প্রকল্প এলাকার অন্তত আড়াইশ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে পাঁচ পরিবারের বসতবাড়ি হারিয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো জানায়, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে পদ্মা সেতু থেকে মাঝিরঘাট হয়ে পূর্ব নাওডোবা আলমখার কান্দি জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার পদ্মা সেতু প্রকল্পের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড বাঁধ নির্মাণ করে সেতু কর্তৃপক্ষ। এতে ব্যয় হয় ১১০ কোটি টাকা।
গত বছরের ৩ নভেম্বর থেকে বাঁধের নাওডোবা ইউনিয়নের মাঝিরঘাট এলাকার ধস শুরু হয়। ১৬ নভেম্বর বিকাল পর্যন্ত বাঁধটির প্রায় ১০০ মিটার ধসে পড়ে নদীতে। এতে কংক্রিটের সিসি ব্লকগুলো তলিয়ে যায় পানিতে।
এ ছাড়া এলাকাটির আশপাশে দেখা দেয় ফাটল। পরে বাঁধটির সংস্কারে দায়িত্ব দেওয়া হয় পাউবোকে। গত বছর ওই বাঁধের যে ১০০ মিটার অংশ বিলীন হয়েছিল, সেখানে দুই কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বালুভর্তি জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলার কাজ শুরু হয়।
তবে ঈদের দিন থেকে এখন পর্যন্ত সাতবার বাঁধটি ভাঙনের কবলে পড়েছে। এতে কমপক্ষে ৫৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ ছাড়া দুই শতাধিক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সরিয়ে নেন। পাশাপাশি ভাঙন ঠেকাতে এক লাখ জিওব্যাগ ডাম্পিং করেছে পাউবো।
সূত্র জানায়, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৮৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় নয় কিলোমিটার পদ্মা সেতু ডান তীর রক্ষাবাঁধ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এর মধ্যে বাঁধের ৩৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় জাজিরার উকুল উদ্দিন মুন্সিকান্দি এলাকায় বুধবার ভোরের দিকে ভাঙন দেখা দেয়। এতে ওই এলাকার ১৫০ মিটার অংশ নদীতে চলে যায়।
তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচটি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও ১০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নেয়। এ অবস্থায় উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে দিন পার করছেন ওই এলাকার মানুষ।
জাজিরার উকুল উদ্দিন মুন্সিকান্দি এলাকার বাসিন্দা হাসু বিবি। বুধবার রাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে নিশ্চিত মনেই ঘুমাচ্ছিলেন নিজ বসতঘরে। হঠাৎ করেই ভাঙন দেখা দেয় তার বাড়ির পেছনে। কিছু না বোঝার আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় তার বসতঘর।
তখন কোনোমতে জীবন নিয়ে বের হতে পারলেও হারিয়েছেন মাথাগোঁজার ঠাঁইসহ সহায়-সম্বল। এমন দশায় পরিবার নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন তিনি।
একই এলাকার নার্গিস বেগম বলেন, “‘আমার ঘরবাড়ি সব নদীতে ভাইঙা নিয়া গেল। কিছুই সরাইতে পারলাম না। লোকজন ডাক দেওয়ার আগেই সব নদীতে তলাইয়া গেল। কোনোমতে জানডা লইয়া বাহির হইছি। কই যামু, কী খামু আল্লাহ জানে।”
একই দশা ওই এলাকার আয়নাল মাদবর, রুবেল মাদবর, মাহাবুব মাদবরের। তারাও হারিয়েছেন বসতঘর। আবার অনেকে ভাঙন আতঙ্কে সরিয়ে নিচ্ছেন ঘরবাড়ি।
তাদের অভিযোগ, তিন দিন আগে মৃদু ভাঙন দেখা দিলে পাউবোকে জানানো হয়। তারপরও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়েছেন তারা।
ইসাহাক মাদবর বলেন, “চাইছিলাম একটা বেড়িবাঁধ, যাতে বাপের কালের জমিজমা লইয়া বাঁচতে পারি। কিন্তু বেড়িবাঁধের প্রকল্প শুরু হলেও আমাগো এদিকে একটুও কাজ করে নাই ঠিকাদারের লোকজন। আইজ আমাগো ঘরবাড়ি, জায়গা-জমি সব নদীতে তলাইয়া গেল। আমরা এখন আর কার কাছে কী চামু?”
চাঁন মিয়া মাদবর নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “কিছুই বাইর করতে পারি নাই। কিছুই ধরতে পারলাম না। যা আছিলো সব নদীতে লইয়া গেল। কয়েকদিন আগে ভাঙন দেখা দিলে পাউবোকে জানাইছি। তারা আইসা দেইখা গেছে। কিন্তু জিও ব্যাগ ফালায় নাই। তারা যদি সেদিন কাজ করতো, তাহলে আমাগো ঘর বাড়ি যাইতো না।”
এ ব্যাপারে পাউবো শরীয়তপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মাদ তারেক হাসান বলেন, “পদ্মা সেতু প্রকল্পের কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং অব্যাহত রয়েছে। ডান তীর নদী রক্ষাবাঁধ প্রকল্পের ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে। কালকের মধ্যে কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।”
