রাঙামাটিতে মানুষের বাগানে হাতির আনাগোনা, ক্ষতি মেনেও সহাবস্থান
বাগানের গাছ ভাঙে, ফল খায়, কখনো ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত করে- তবু হাতিকে আক্রমণ করেন না স্থানীয়রা।
রাঙামাটির বরকল উপজেলায় মানুষের বাগানে নিয়মিত আসছে বন্য হাতির পাল। বাগানের গাছের পাতা ও ফল খাওয়ার পাশাপাশি কখনো ঘরবাড়িও ভাঙছে হাতি। এতে ক্ষতি হলেও হাতিকে তাড়াতে বা আক্রমণ করতে চান না স্থানীয়রা।
টর্চের আলো, টিনের শব্দ ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এক দশকের বেশি সময় ধরে উপজেলা বরুনাছড়িতে মানুষ ও হাতির সহাবস্থান চলছে বলে জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ।
বরুনাছড়ির আম, লিচু ও আমলকির বাগানে ১০ থেকে ১২টি হাতির বিচরণ রয়েছে। এসব বাগানের গাছপালা ও ফল হাতির খাবার। আবার বাগানের পাশেই কাপ্তাই লেক থাকায় হাতিদের পানিরও সংকট হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দা পারভীন বেগমের বাড়ির পাশের লিচু বাগানে বর্তমানে চারটি হাতি রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রায় পাঁচ দিন ধরে হাতিগুলো ওই এলাকায় অবস্থান করছে।
বাগানের ভেতর ঘুরে ঘুরে হাতিগুলো লতা-পাতা খাচ্ছে। লিচু গাছের ডাল ভাঙছে এবং পাশে থাকা বাঁশের পাতাও খাচ্ছে। প্রয়োজন হলে কাপ্তাই লেক থেকে পানি পান করছে।
পারভীন বেগম বলেন, “আমার বাগানে হাতি বেশ কয়েকদিন ধরে আছে। আমরা তাদের উত্ত্যক্ত করি না। তারা বাগানে বিভিন্ন ধরনের খাবার খায়। লেকেও পানি আছে।”
হাতির কারণে বাগান ও ঘরের ক্ষতির কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “হাতি আমলকি ও পেয়ারা গাছ ভাঙে, রান্নাঘর ভেঙে ফেলাইছে। হাতির ভয়ে রাতে ১০টা-১১টা থেকে ভোর ৩টা-৪টা পর্যন্ত সজাগ থাকা লাগে। আমরা হাতিকে আক্রমণ করি না। টর্চের আলো দিলে হাতি দূরে সরে যায়।”
আরেক বাসিন্দা জাফর উদ্দিন বলেন, সপ্তাহে এক থেকে দুইবার তার বাড়িতে হাতি আসে। কখনও কখনও ঘরে ঢুকে দরজাও ভেঙে ফেলে।
তিনিও হাতিকে আক্রমণ করেন না। টর্চের আলো দিয়ে হাতি তাড়ান। শব্দ করলেও হাতি চলে যায়।
মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে বরকল ও লংগদু এলাকায় এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগ।
হাতির অবস্থান জানানো, স্থানীয়দের সতর্ক করা এবং হাতির কারণে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়তা করাই এই দলের কাজ।
এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বাবু বলেন, “কোনো এলাকায় হাতি ঘরবাড়ি বা বাগানের ক্ষতি করলে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাচালংমুখ বনশুল্ক ও পরীক্ষণ ফাঁড়িকে জানাই। ইআরটির সদস্যরা যারা বিপদের সম্মুখীন হয়, যত সাধ্য আমরা সহায়তা করার চেষ্টা করি।”
হাতি তাড়ানোর জন্য বিভিন্ন যন্ত্র ও বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি উচ্চস্বরের শব্দ ব্যবহার করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “মানুষের দ্বারা এখানে হাতি আক্রান্ত হয় না।”
বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ে হাতির আবাসস্থল কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে হাতি। তবে বরকলের বন ও কাপ্তাই লেকের পানির সহজলভ্যতার কারণে এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে হাতির বিচরণ রয়েছে।
একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার এবং অন্তত ১০০ লিটার পানি প্রয়োজন। বনের খাবার ও লেকের পানি সহজে পাওয়ায় বরুনাছড়িতে হাতিগুলো টিকে আছে বলে বনবিভাগের কর্মকর্তারা জানান।
চলতি বছর বন্য হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বনবিভাগের কাছে ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বনবিভাগ।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন লংগদু ও বরকল এলাকায় এশিয়ান হাতিগুলো বিচরণ করে। এই এশিয়ান হাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বিচরণ করছে। তাদের করিডোর দিয়ে যাতায়াতের কারণে বিভিন্ন সময় মানুষের ফসলহানিসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এসব সমস্যা আমরা দ্রুত নিরসনের চেষ্টা করি। কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও চেষ্টা করছি।”
হাতি ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয়দের টর্চ, হুইসেল ও ঢোলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, হাতি চলাচলের সময় কী করণীয়, তা জানাতে প্রচারপত্র, ব্যানার ও সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় স্কুল, জনসাধারণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে।
রফিকুজ্জামান বলেন, “সভাগুলোতে আমরা সবাইকে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছি যে, হাতি রক্ষা করতে হবে, বন রক্ষা করতে হবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। হাতি ও হাতির আবাসস্থল সুরক্ষার জন্য যা করণীয়, সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”
তিনি বলেন, “স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকেও আমরা যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছি। আমরা আশা করছি, হাতিগুলোকে যদি সর্বাধিক সুরক্ষা দিতে পারি, তাহলে তাদের বংশবিস্তার হবে। ওই এলাকার বনাঞ্চলও সমৃদ্ধ হবে এবং জীববৈচিত্র্য ক্রমান্বয়ে আরও বৃদ্ধি পাবে।”
