২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

নয়াপল্টনে প্রস্তুত বিএনপির সমাবেশ মঞ্চ

বিএনপির পাশাপাশি সমমনা রাজনৈতিক জোটগুলোও এদিন ঢাকায় সমাবেশ করবে। যুগপৎ এই কর্মসূচি থেকে আসবে ‘সরকারপতনের আন্দোলনের এক দফা’ ঘোষণা।  

নয়াপল্টনে প্রস্তুত বিএনপির সমাবেশ মঞ্চ

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে পাশাপাশি কয়েকটি ট্রাক রেখে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী মঞ্চ।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Jul 2023, 12:01 PM

Updated : 12 Jul 2023, 12:56 PM

নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে বিএনপির সমাবেশে যোগ দিতে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছেন নেতাকর্মীরা।

বিএনপির পাশাপাশি সমমনা রাজনৈতিক জোটগুলোও এদিন ঢাকায় সমাবেশ করবে। যুগপৎ এই কর্মসূচি থেকে আসবে সরকারপতনের আন্দোলনের ‘এক দফা’ ঘোষণা।  

বুধবার বেলা ২টায় বিএনপির সমাবেশ শুরুর কথা থাকলেও নেতা-কর্মীরা দলীয় কার্যালয়ের সামনে আসতে শুরু করেন সকাল থেকে। 

তাদের হাতে ব্যানার-ফেস্টন, মাথায় লাল-সবুজ পট্টি বাঁধা, আর মুখে শ্লোগান- ‘ফয়সালা হবে কোন পথে, রাজপথে রাজপথে’।

সকাল সাড়ে ১০টায় নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সামনে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি কয়েকটি ট্রাক রেখে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী মঞ্চ। পেছনে টানানো হয়েছে বিশাল ব্যানার, তাতে লেখা ‘গণতন্ত্রের ঘাতক, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও সর্বনাশা অনাচারে লিপ্ত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পদত্যাগ এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যুগপৎ ধারায় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের ১ দফা যৌথ ঘোষণার সমাবেশ’।

নয়া পল্টন সড়কের এক পাশ বন্ধ হয়ে গেছে সকাল ৯টা থেকে। অন্য অংশে ধীরে ধীরে গাড়ি চলছে। বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান পরিবেশ করে নেতা-কর্মীদের উৎসাহ দিচ্ছেন।

মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান সকাল থেকে কার্যালয়ে সমাবেশের কার্যক্রম তদারকি করছেন।

তিনি বলেন, “আমাদের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আসতে শুরু করেছে। স্মরণকালের সমাবেশ আমরা প্রত্যাশা করছি। এই সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে আমরা শেষ করতে পারব বলে আশাবাদী।”

দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আমাদের কাছে খবর আসছে, বিভিন্ন জায়গায় যানবাহন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ না আসতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন জায়গায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মানুষের জোয়ার ওরা ঠেকাতে পারবে না। দেখবেন আজকে সমাবেশ মহাসমুদ্র হয়ে উঠবে দুপুরেই।”

মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপির সমাবেশের পাশাপাশি সরকার বিরোধী আন্দোলনে শরিক জোট গণতন্ত্রমঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, সমমনা গণতান্ত্রিক পেশাজীবী জোট এবং এলডিপি, গণফোরাম-পিপলস পার্টি, লেবার পার্টি, গণঅধিকার পরিষদের দুই অংশ বিভিন্ন স্থান থেকে একই আন্দোলনের এক দফার ঘোষণা দেবে।

নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিজয়নগর-কাকরাইল থেকে শুরু করে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত সড়কে সমাবেশ হবে জানিয়েছেন মহানগর বিএনপির নেতারা।

সমাবেশ ঘিরে পুরো এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। নয়া পল্টন সড়কের বিভিন্ন গলিতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ দেখা গেছে। কাকরাইল ও মতিঝিল মডেল থানার কাছে পুলিশের বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রাখা হয়েছে।

সমাবেশের আগের দিন মঙ্গলবার রাতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক ‘জরুরি’ সংবাদ সম্মেলনে এসে রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, বিএনপির সমাবেশের দিন পেছানোর ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়।

তিনি বলেন, ‘‘বিএনপির প্যাড ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে একটি ভুয়া বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘বিএনপির সমাবেশ আগামীকাল ১২ জুলাই বুধবারের পরিবর্তে ২২ জুলাই শনিবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো যার যার অবস্থানে থেকে সমাবেশ করবে’; যা সম্পূর্ণরূপে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও জনমনে সংশয় সৃষ্টি করার অপচেষ্টা মাত্র।

“সুপরিকল্পিতভাবে সমাবেশকে নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এই অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার ও সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের স্বাক্ষর দেখিয়ে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে যা ডাঁহা জালিয়াতি।”

রিজভী বলেন, ‘‘আমি সুস্পষ্টভাবে আবারও আপনাদের সামনে বলতে চাই, বুধবার ১২ জুলাই নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দুপুর ২টায় দলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কোনও ধরনের অপপ্রচারে জনগণ বিভ্রান্ত হবে না।”

২৩ শর্তে সমাবেশের অনুমতি

গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে জনসভা থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত, নির্দলীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ ১০ দফা ঘোষণা করেন। এখন সেই আন্দোলনের কর্মসূচি আসছে এক দফায়।

একই দিনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও সমাবেশ করবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির ব্যানারে; সেই ‘শান্তি সমাবেশ’ হবে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ ফটকে।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরে মতপার্থক্য চলার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা যখন ঢাকায়, তখন এই দুই সমাবেশ হচ্ছে।

সমাবেশের আগের দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর দুই পক্ষকে অনুমতি দেওয়ার কথা জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ, সেই সঙ্গে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজকে পুলিশ কমিশনারের পক্ষে কমিশনারের স্পেশাল অ্যাসিসট্যান্ট সৈয়দ মামুন মোস্তফা সমাবেশের অনুমতিপত্র পাঠান।

তাতে দুই দলকে ব্যানারের আড়ালে লাঠি-রড বহন না করা, রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য না দেওয়াসহ ২৩টি শর্ত দেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএমপি।

দুই দলের দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে নয়া পল্টনের বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে (পুলিশ হাসপাতাল ক্রসিং থেকে নাইটিংগেল মোড় পর্যন্ত মধ্যবর্তী স্থানে) এবং আওয়ামী লীগকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন স্থানে।

শর্তগুলো হল-

  • এই অনুমতিপত্র স্থান ব্যবহারের অনুমতি নয়, স্থান ব্যবহারের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।

  • স্থান ব্যবহারের অনুমতিপত্রে উল্লেখিত শর্তাবলী যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

  • অনুমোদিত স্থানেই সমাবেশের যাবতীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

  • নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (দৃশ্যমান আইডি কার্ডসহ) নিয়োগ করতে হবে।

  • স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলের চারদিকে উন্নত রেজ্যুলেশনযুক্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

  • নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশে আগতদের হ্যান্ড হেন্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে (ভদ্রোচিতভাবে) চেকিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।

  • নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সমাবেশস্থলে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

  • শব্দ দূষণ প্রতিরোধে সীমিত আকারে মাইক- শব্দযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে, কোনক্রমেই অনুমোদিত স্থানের বাইরে মাইক- শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

  • অনুমোদিত স্থানের বাইরে প্রজেক্টর স্থাপন করা যাবে না।

  • অনুমোদিত স্থানের বাইরে, রাস্তায় বা ফুটপাতে কোথাও লোক সমবেত হওয়া যাবে না।

  • আজান, নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় সংবেদনশীল সময় মাইক- শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

  • ধর্মীয় অনুভূতির উপর আঘাত আসতে পারে এমন কোন বিষয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন বক্তব্য প্রদান বা প্রচার করা যাবে না।

  • সমাবেশের কার্যক্রম ব্যতিত মঞ্চকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

  • সমাবেশ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে লোকজন সমবেত হওয়ার জন্য আসতে পারবে।

  • অনুমোদিত (২টা থেকে ৫টা) সময়ের মধ্যে সমাবেশের সার্বিক কার্যক্রম শেষ করতে হবে।

  • কোনো অবস্থাতেই মূল সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না ।

  • আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কার্যকলাপ করা যাবে না।

  • রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কার্যকলাপ ও বক্তব্য প্রদান করা যাবে না।

  • উস্কানিমূলক কোনো বক্তব্য প্রদান বা প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না।

  • কোনো ধরনের লাঠি-সোটা বা ব্যানার-ফেস্টুন বহনের আড়ালে লাঠি, রড ব্যবহার করা যাবে না।

  • আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও কোনো বিরুপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে।

  • উল্লেখিত শর্তাবলী যথাযথভাবে পালন না করলে তাৎক্ষণিকভাবে এই অনুমতির আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে।

  • জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষ কোন কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে এই অনুমতি আদেশ বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন।