০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের ভূমিকায় বিএনপির ‘হতাশা’

“এর ভিত্তিতে তারা কী অর্জন করতে চায় আমরা জানি না।”

ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের ভূমিকায় বিএনপির ‘হতাশা’
সালাহউদ্দিন আহমদ।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Oct 2025, 09:59 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:34 PM

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমে ‘হতাশা’ ব্যক্ত করেছে বিএনপি।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এখন এখানে (সুপারিশে) এসে এই অবস্থায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে সমস্ত প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে শুধু জাতিতে বিভক্তি হবে, অনৈক্য হবে এবং এখানে কোনো ঐকমত্য হবে না। 

“এর ভিত্তিতে তারা কী অর্জন করতে চায় আমরা জানি না।”

বুধবার দুপুরে গুলশানে একটি হোটেলে বিএনপি আয়োজিত সেমিনারে তিনি বক্তব্য রাখছিলেন।

সালাহউদ্দিন বলেন, “আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকায় দেখতে চাই। তারা যেন নিরপেক্ষভাবে আচরণ করে এবং তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডে যেন জাতি আশ্বস্ত হতে পারে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, সেভাবেই যেতে হবে। আমরা ঐকমত্য কমিশনের এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে আজকে এখানে এসে হতাশা ব্যক্ত করছি।”

মঙ্গলবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেন। 

এই সুপারিশমালার বিষয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন সেদিন বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘নিষ্কৃতি’ পাওয়ার জন্য আলোচনা ও সিদ্ধান্ত ‘বহির্ভূত’ বিষয় সংযুক্ত করে সুপারিশ জমা দিয়েছে। 

তিনি বলেন, কমিশন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বদলে ‘জাতীয় অনৈক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা’ গ্রহণ করেছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলগমীরও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের দেওয়া সুপারিশমালা ‘প্রতারণামূলক’ অভিযোগ করে অবিলম্বে তা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি।

বুধবার দুপুরে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় ঐক্যমত্য কমিশনের প্রণয়ন করা সুপারিশমালা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আহ্বান জানিয়েছেন।

‘আরপিও প্রসঙ্গে’

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে সংশোধনী এনে অধ্যাদেশ অনুমোদনের বিষয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, “আমরা লক্ষ্য করেছি যে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে নির্বাচন সংস্কার সংক্রান্ত কমিশনের একটি অনালোচিত ধারা সেখানে অন্তর্ভুক্ত করে আরপিও অধ্যাদেশ পাশ করা হয়েছে, সেটা এখন অধ্যাদেশ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।” 

তিনি বলেন, জোটভুক্ত যে কোনো রাজনৈতিক দল তাদের স্বাধীনতা ছিল নিজস্ব প্রতীকে অথবা জোটের যে কোনো প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবে। হঠাৎ করে তারা (সরকার) একটা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বলে দিল যে জোটভুক্ত হলেও তাদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে।

“দেখলাম এতে আরেকটি রাজনৈতিক দল সমর্থন করে যাচ্ছে। এরকম পক্ষপাতমূলক আচরণ আমরা আশা করি না।”

‘ঐকমত্য কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সুপারিশ দিয়েছে। তার মধ্য দিয়ে আমরা কিছু সত্য আবিষ্কার করতে পেরেছি। এতদিন আমরা মনে করতাম, জাতীয় ক্ষমতা কমিশন রেফারির ভূমিকা পালন করছে বা ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকা পালন করছে। 

“কালকে যে সুপারিশ তারা সরকারের কাছে প্রদান করেছে তার মধ্যে একজন দস্তখতকারী মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাও বটে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি হিসেবে দস্তখত করেছেন। সুতরাং সেটা একদিকে সরকারেরও একটা অনুমোদন হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে তো বটেই।”

“কিন্তু রেফারিকে কখনো আমরা গোল দিতে দেখিনি।” 

‘জবরদস্তিমূলক চাপানোর চেষ্টা’

সালাহউদ্দিন বলেন, “ঐক্যমত্য কমিশনের সাথে আলোচনা সময় আমার মনে হয়েছে ঐকমত্য কমিশন, সরকার এবং আরো দুই-তিনটি দল তারা বোধহয় একপক্ষ। আমি বিপক্ষেই খেলছিলাম মনে হয়।

“সেই হিসেবে জাতির পক্ষেই আমরা দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। আমার কেন জানি মনে হয়েছে, কিছু দলের প্রস্তাব এবং ঐকমত্য কমিশনের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা জাতির উপরে জবরদস্তি আরোপ করার একটা প্রচেষ্টা লক্ষ্য করেছি।” 

তিনি দাবি করেন, যে দলিলটা প্রকাশিত হয়েছে, ওখানে ঐকমত্য কমিশনে যেভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছে এবং যে দলিলটা ১৭ অক্টোবরে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেই দলিলটা ‘হুবহু ওখানে (সুপারিশে) নেই’। শুধু আছে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব।

‘এভাবে গণভোট হলে আলোচনার কসরত কেন’

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করা সালাহউদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশমালা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। 

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সেসব বিষয়ে একমত হল, যেখানে ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে সেসব কোনো কিছু ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালায় নেই। ৪৮টা দফা সংবিধানের বিভিন্ন রকমের সংশোধনের প্রস্তাব সহকারে তারা (কমিশন) তফসিল হিসেবে সংযুক্ত করেছে…বলেছে এগুলোর উপরে গণভোট হবে।

 এই বিএনপি নেতা বলেন, “তাই যদি হয়, তাহলে ১১ মাস বা ১২ মাস ধরে এই কসরত কেন করা হল জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে?” 

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হবে সেগুলো সংকলিত করে একটা জুলাই জাতীয় সনদ করে সেটা স্বাক্ষরিত হবে এবং পরবর্তীতে সংসদ তা বাস্তবায়ন হবে, জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সভাপতি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য মনে করিয়ে দেন সালাহউদ্দিন।  

৩১ জুলাই দ্বিতীয় দফা আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, “যখন জুলাই সনদ প্রায়ই পাকাপোক্ত হল, প্রণয়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত যে সমস্ত বিষয়ে ঐকমত্য হল, সেইদিন হঠাৎ করে বলল যে, এটা বাস্তবায়নের জন্য দুই একটা দলের পক্ষ থেকে বলা হল, বাস্তবায়নের জন্য আইনি ভিত্তি চাই, বাস্তবায়নের গ্যারান্টি চাই। 

“তখন আমরা বললাম, ঠিক আছে সনদ প্রণীত হোক, বাস্তবায়নের উপায় আইনানুগ ভিত্তি, গ্যারান্টির জন্য কি করা যায় সেজন্য আরো আলোচনা হতে পারে।”

পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আলোচনার বিষয়টি তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাপন জারি এবং তার ভিত্তিতে গণভোটের প্রস্তাব বিএনপির তরফে তারা দিয়েছিলেন।

সেই গণভোট জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে হতে পারে এবং সেই গণভোট কেন একই দিনে হবে সেই যুক্তিও তারা দিয়েছিলেন তুলে ধরে তিনি বলেন, যাতে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ে, যেহেতু প্রার্থীরা ভোটারদের নিয়ে আসবে এবং একই দিনে একই খরচায় একই আয়োজন হয়ে যাবে ছোট্ট একটা ব্যালেটের মাধ্যমে।

“দুই-একটি দল বাদে বাকি সবাই এই প্রস্তাবে একমত ছিল।”

‘জুলাই সনদের প্রস্তাব গতকালের সুপারিশে নাই’

সালাহউদ্দিন বলেন, “যার ওপরে গণভোট হবে, জুলাই জাতীয় সনদ যেটা স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটা তো গতকালকের সুপারিশের মধ্যে নাই। আছে কী? যে সমস্ত প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশন এবং দুই-একটি দল দিয়েছিল, সেগুলো। সেই প্রস্তাবগুলো যেন ওনারা, সরাসরি ওই খসড়া আদেশের মধ্যে তারা অন্তর্ভুক্ত করল তফসিল হিসেবে। বলা হল, এই ৪৮ দফার উপরে গণভোট হতে হবে।

“সেই আলাপ তো হয়নি আমাদের সাথে। ঐকমত্য কমিশনে ঐকমত্য হয়েছে ‘উইথ নোট অব ডিসেন্টে সারটেইন পয়েন্টসে’ যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলো তারা নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করবে। সেই ইশতেহারে উল্লেখের পরে যদি জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয় সেগুলো তারা সেভাবে বাস্তবায়ন করবে।”

বিএনপি আয়োজিত ‘ফ্রম রুল বাই পাওয়ার টু রুল অব ল: ট্রানজিশন টু এ ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন দলের আন্তর্জতিক বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন অসীম। 

ইসরাফিল খসরু ও ফারজানা শারমিন পুতুলের সঞ্চালনায় সেখানে বক্তব্য রাখেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাফ উদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক এসইউ মহিউদ্দিন নেহাল, আইনজীবী কায়সার কামাল ও আনোয়ার হোসেন।

সেমিনারে বিভিন্ন দেশের কুটনীতিকরাও অংশ নেন।