০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

মুক্তিযুদ্ধ তো ‘রোমান্টিক’ ছিল না, বললেন ফরহাদ মজহার

“আপনারা যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে মিত্র গণ্য করেছেন, আমরা তো তখন তাদেরকে দখলদার ভেবেছিলাম,” বলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ তো ‘রোমান্টিক’ ছিল না, বললেন ফরহাদ মজহার
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নিজের ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত ‘মুখোমুখি ফরহাদ মজহার’ অনুষ্ঠানে কথা বলেন ফরহাদ মজহার।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Aug 2026, 11:08 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:26 PM

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে ‘রোমান্টিক’ গল্প শোনানো হয়, তা ‘রোমান্টিক’ ছিল না বলেছেন লেখক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার।

তিনি বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের যে রোমান্টিক গল্প শোনানো হয়, এটা তো রোমান্টিক ছিল না। তরুণদের বলব, যুদ্ধের কথা বলবেন না এত তাড়াতাড়ি। যুদ্ধের চেয়ে সমাজ পরিবর্তনের পথ বেছে নিতে হবে সততা ও ধৈর্যের সঙ্গে।”

রোববার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নিজের ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত ‘মুখোমুখি ফরহাদ মজহার’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন এই লেখক।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমাদের অত্যন্ত ‘হিরোইক স্ট্রাগল’ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই পুরো গল্পটা বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা মুছে ফেলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবতা ছিল আরও তিক্ত।”

উদাহরণ টেনে এই কলামিস্ট বলেন, “আমার চোখের সামনে গল্প দেখেছি—একজন বিহারী ছেলে, যে বাংলা বলতে পারত না, সে তো কমিউনিস্ট ছিল। তাকে তিনটে বাঁশ দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে মুজিববাদীরা। 

“একটা বাঁশ দিয়ে শোয়াইছে, আর দুইটা বাঁশ দিয়ে চেপে গলার রক্ত দিয়ে, মেরুদণ্ড ভেঙে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই ইতিহাস ভুলে যাবেন না।”

মিত্রবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে ফরহাদ মজহার বলেন, “আপনারা যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে মিত্র গণ্য করেছেন, আমরা তো তখন তাদেরকে দখলদার ভেবেছিলাম। ডেমরাতে যখন ভারত মালামাল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন স্বভাবতই আমরা তার বিরোধিতা করেছি।”

তিনি বলেন, “ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশ থেকে ট্রাক ভরে জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছিল, যার বিরোধিতা আমরা করেছি। এমনকি তখনকার বামপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মুজিববাদীরা বিদেশ থেকে যে অস্ত্র ও রসদের দুটি ট্রাক এনেছিল, আমরা তাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম।”

রাজনীতিতে বিচক্ষণতার ‘অভাব’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই লেখক বলেন, “আমি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার মারাত্মক অভাব দেখতেছি। তারা বাংলাদেশকে সিরিয়া বানিয়ে ফেলবে। আপনারা এখন যে যুদ্ধে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, এটা কিন্তু সিরিয়া হবে।”

ভারতের ‘সাংস্কৃতিক ন্যারেটিভ’ নিয়ে সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, “ভারতের নারেটিভে, তাদের ইতিহাসের মধ্যে আপনি অনুপস্থিত। সত্যজিৎ রায় বা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় কোনো মুসলমান চরিত্র নেই। দিল্লির ইতিহাসে বাংলাদেশ বলে কিছু নেই—ওটা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ। পলিটিক্যাল নারেটিভ কীভাবে আপনাকে দীর্ঘকাল গোলাম করে রাখে, তা বুঝতে হবে।”

পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির দাবি করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কম করে হলেও ২০০-৩০০ বছর এগিয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে। আমরা যা চিন্তা করতে পারি, ওই চিন্তা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগত ও রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় আছে।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব তুলে ধরে ফরহাদ মজহার যোগ করেন, “এখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হওয়ার পরেই দিল্লিতে ‘ককাস’ হয়, তার আগে হয় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পুরো উপমহাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা যদি আগামী দিনে বুদ্ধিবৃত্তিক ও চেতনার কাজে মনোযোগী হই, তবে বড় ঘটনা ঘটাতে পারব।”