পিআর আন্দোলনের জবাব বিএনপি রাজপথে দেবে: সালাহউদ্দিন
“আমরা পিআর পদ্ধতির বিপক্ষে উচ্চ ও নিম্নকক্ষ সর্বত্র,” বলেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থাসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচির জবাবে বিএনপি রাজপথেই দেওয়ার কথা বলেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার দুপুরে গুলশানে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “যেকোনো রাজনৈতিক দল তার গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে, তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে মাঠে যেতে পারে, রাজপথে যেতে পারে, জনগণের সামনে যেতে পারে।
“আমরা সেটার (দাবির) বিপক্ষে। আমাদের যে বক্তব্য আমরাও সেটা মাঠে দেব, জনগণের সামনে দেব, মাঠের জবাব আমরা মাঠেই দেবো…জনগণ যেটা গ্রহণ করবে সেটা দেখা যাবে।”
পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির অবস্থান আবার পুনর্ব্যক্ত করে সালাহউদ্দিন বলেন, “আমরা পিআর পদ্ধতির বিপক্ষে উচ্চ ও নিম্নকক্ষ সর্বত্র।
“কারণ আমরা বলেছি, যাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে পিআর পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য… তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সেই বিষয়টা উল্লেখ করে জনগণের কাছে যাক। জনগণের ম্যান্ডেট যদি তারা প্রাপ্ত হয় তাহলে তারা তাদের সেই রাজনৈতিক আদর্শ বা কৌশল তখন তারা প্রণয়ন করতে পারবে, আইন প্রণয়ন করতে পারবে।”
পিআরসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি ইসলামী রাজনৈতিক দল তিনদিনের বিক্ষোভ কর্মসূচি যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে সোমবার। জাগপার একাংশও একই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আজ।
জুলাই অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
সংস্কার নিয়ে আলোচনার মধ্যে গেল ৫ অগাস্ট আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
সংস্কারের বিষয়গুলোতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরের কথা রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর।
এ নিয়ে আলোচনার চলার মধ্যে জামায়াতসহ কয়েকটি দল জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিসহ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে নামছে।
‘নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র’
সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন বলছেন, “নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, নির্বাচনকে বিলম্বিত করার জন্য অথবা বাধাগ্রস্ত করার জন্য যে কোনো রাজনৈতিক কৌশলকে এ দেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে।
“কারণ জনগণ দীর্ঘ ১৬/১৭ বছরের অবিরাম সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে। কীসের জন্য? ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য। সবশেষে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্যের মতে, এসব বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হবে যখন একটা সুষ্ঠ নিরপেক্ষ অবাধ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ হবে, রাজনৈতিক সরকার হবে।
“সুতরাং নির্বাচনের এই পথে যারাই বাধা সৃষ্টি করতে চাইবে, কৌশলে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, দলীয় উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কাজ করবে, সেটা জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি,” বলেন তিনি।
সালাহউদ্দিন বলেন, “এই সমস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির জবাব দেওয়ার জন্য আমরা রাজপথে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করতে পারি, আরেক দল শক্তি প্রদর্শন করতে পারে, কিন্তু সেই বিষয়টা নির্ধারিত হবে কোথায়? জনগণের সার্বভৌম ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়েই তো। আমরা সেখানে যাই।”
‘নির্বাহী আদেশে দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে বিএনপি’
জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “যে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা নির্বাহী আদেশে, সেটা আমরা সমর্থন করি না।
“আমরা আমাদের বক্তব্য দিয়েছি অনেক আগে যে, বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার যে বিষয়টি, সেটা নির্ধারিত হোক…লেট দি কোর্ট ডিসাইড।”
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দমন-পীড়নের অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিচার করার লক্ষ্যে মে মাসে আইন সংশোধন করে সরকার। সে সময় দলটির কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
সালাহউদ্দিন বলেন, “আমরা তো সেই কোর্টে যাওয়ার জন্য আইনটা সংশোধন করেছি। সেই আইনটা আগে ছিল না। যদিও সংবিধানের বিধানে উল্লেখ ছিল। কিন্তু সেই বিধান অনুসারে সংশ্লিষ্ট আইনে পরিবর্তনটা আগে আনা হয়নি। পরবর্তীতে আনা হয়েছে।
“এখন যেকোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অথবা আরো যেগুলো অপরাধের কথা বলা আছে যুদ্ধাপরাধসহ, এগুলো সংগঠন হিসেবে যেকোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যেতে পারে। সেইভাবে যদি সে সমস্ত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকবে, সেটা যদি আদালতে উত্থাপিত হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি সেটা নির্ধারিত হয়, সেটা নির্বাচন কমিশন মানতে বাধ্য।”
তার মতে, এর বাইরে অন্য যেকোনো প্রক্রিয়া, নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে যদি রাজনৈতিক দলের নিষিদ্ধ দাবি করা হয় তাহলে সেটা হবে একটা ভয়ঙ্কর চর্চা।
বিএনপির এ নেতা বলছেন, এখন যারা জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা চাচ্ছেন, তাদের বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে তারা সেই অভিযোগটা আদালত উত্থাপন করতে পারেন।
“আইন তো আছে, বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটা নিশ্চিত হোক।”
সালাহউদ্দিন বলেন, “আমি আপনাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি যে ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হলো, তাতে ২৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সম্ভবত অংশগ্রহণ করেছে। সংখ্যাটা এদিক-ওদিক হতে পারে। তাহলে নিষিদ্ধ যদি চাইতেই হয় স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে, ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে ২৮টা দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা দলকে নিষিদ্ধ চাইতে হবে। তাহলে নির্বাচনটা কাদেরকে নিয়ে হবে?”
তিনি বলেন, “এই দেশে যারা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে চাচ্ছে, এখন এই দাবির মধ্য দিয়ে, তাইলে তারা যদি পরে বলে যে, আমরাও নির্বাচন করব না তাহলে কি এদেশে নির্বাচন হবে?”
“উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে তাদের এই দাবির পিছনে যে, নিজেদের অতিরিক্ত সুবিধা সৃষ্টির জন্য হয়তোবা তারা আরো অনেক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ কামনা করতে পারে।”
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি বিএনপি প্রথম করেছিল দাবি করে দলটির এই নেতা বলেন, “হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের বিষয়টা এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। তারা গণহত্যার জন্য দায়ী, তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী, তারা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য দায়ী, সেই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে, সেই সরকারের যারা প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী, এমপি এবং দোসররা ছিল তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে, আরো হবে, বিচার চলছে।
