০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

তারা মুখে বলে ‘বন্ধু’: ভারতের কড়া সমালোচনায় চিফ হুইপ

তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সরকার পর্যালোচনা করছে এবং ‘অনতিবিলম্বে’ এর ফল পাওয়া যাবে।

তারা মুখে বলে ‘বন্ধু’: ভারতের কড়া সমালোচনায় চিফ হুইপ
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Sep 2026, 04:01 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লির কথা ও কাজের ‘বৈপরীত্য’ তুলে ধরে ভারতের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সরকার পর্যালোচনা করছে এবং ‘অনতিবিলম্বে’ এর ফল পাওয়া যাবে।   

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে শুক্রবার জাতীয় সংসদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন নুরুল ইসলাম মনি।

প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে তিনি ফেলানী হত্যাকাণ্ড ও সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার প্রসঙ্গও টেনেছেন।

চিফ হুইপ বলেন, “দেশে দুইদিন পরে আন্দোলন, ঘটনা, ঝামেলা হোক—চাই কি? আচ্ছা, না চাইলে আমরা তো চেষ্টাই করব এই ঘরটা যেন ঠিক থাকে, পানি যাতে না পড়ে, এই ঘরের চাল ঠিক থাকে। এটা আমরা চেষ্টা করব। 

“এই চেষ্টা যাতে করতে না পারি, তার জন্য কিছু মানুষ পরিশ্রম করে, তারা আমাদের বন্ধু না, তারা আমাদের শত্রু। সেই বন্ধুরা কাঁটাতারের বেড়া দিছে না? দেবে, কিন্তু পরে মুখে বলে ‘বন্ধু’। সেই বন্ধুরা আমাদের ফেলানির লাশ রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখে কাঁটাতারে।”

নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “সেই বন্ধুরা আমাদের কোস্টগার্ডকে আটকে দেয়, আমাদের জাহাজ আটকে রাখে... আপনাদের মনে আছে, বাংলাদেশের জাহাজ আর বন্ধুর বাড়ির জাহাজ একসাথে যদি চিটাগাঙে বার্থিং করে, চিটাগাঙে বন্ধুর বাড়ির জাহাজ আগে খালাস হবে মাল, পরে আপনার বাড়ির জাহাজ–সঠিক বলছি?

“রাইট, একদম সঠিক! আপনার মাল বাংলাদেশের পোর্টে এলে আপনাকে বসে ডেমারেজ দিতে হবে, কিন্তু আমার বন্ধুর বাড়ির মাল খালাস হবে আগে। ১০১টা এমওইউ করেছে, ১০১টা এমওইউর মধ্যে নাই কী? আপনারা খুঁইজা দেখেন, এইরকম করেছে আমার দেশে।”

পরে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, “আমরা চুক্তিগুলা, মানে ১০১টা এমওইউ নিয়েই আলোচনা করছি এবং অনতিবিলম্বে তার ফল আপনারা পাবেন।”

দেশে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভারতের আদানি গ্রুপেরও সমালোচনা করেন তিনি।  

আওয়ামী লীগ আমলে ভারতের সঙ্গে করা এমওইউ প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “আমার এই জমিটা এইখানে, আমি একটা গাছ লাগাইলাম। আমি আপনাকে বুঝাইলাম, এই গাছে আমি পানি দেব, গাছে আমি সার দেব, গাছটা পরিচর্যা আমি করব, পোকা ধরলে ওষুধ দেব, সবকিছু আমি এই গাছে করব; কিন্তু ফল খাবে পাশের বাড়ির জমির লোক! এই জমি আপনারা দিবেন? 

“আমাদের দেশে আমরা লোন নিছি, লোনের সুদসহ টাকা ফেরত দেব। আমার মাটির উপর রাস্তা যাবে, আমার গাড়ি উঠতে পারবে না; এই মাটি কাটবে, আমার মাটি, আমার দেশ, আমার দেশের উপর যে রাস্তা যাবে, সেই রাস্তায় আমার গাড়ি উঠতে পারবে না। আবার লোন আছে রাস্তা করার জন্য, সেই লোনের টাকা পরিশোধ করতে হবে—এই চুক্তি হয়েছে এবং এদেশে চলছে।”

চিফ হুইপ বলেন, “বাস্তবে আমরা এরকম জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমাদের কেউ শত্রু নাই, সবাই আমাদের বন্ধু; কিন্তু আমাদের দেশ আগে। এজন্য তারেক রহমান সাহেব বলেছেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য ভারত যে আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন নুরুল ইসলাম মনি। 

তিনি বলেন, “তারেক সাহেব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, একটা স্বাধীন দেশকে এতটুকু মর্যাদা আপনারা দেবেন না? এতটুকু মর্যাদা আপনার কাছে আশা করি না?” 

‘আপনি মুসলিম ল’র বিরোধিতা করেন না কেন?’

সংবাদ সম্মেলনে নুরুল ইসলাম মনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া আইন নিয়ে কথা বলেন। তার কথায় আসে বিরোধী দলের ভূমিকার কথাও।

৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিন জন করে সদস্য রাখা হয়েছে বলে তথ্য দেন চিফ হুইপ।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল, ২০২৬ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, “তারা দোহাই দিয়েছে শরিয়া আইনের। আপনাদের কাছে প্রশ্ন করতে চাই, শরিয়া আইন সরকার চালু করবে, এমন কোনো কথা ইশতেহারে লেখা নাই। আমি অনেকবার দেখেছি, আপনারাও দেখবেন,  শরিয়া আইন হবে এমন কোনো বাক্যই নাই।

“‘শরিয়া আইন চালু করবে না’, এমন দোহাই দিয়েই কিন্তু বিলটার বিরোধিতা করছে।”

তিনি বলেন, “সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নিয়ে তাদের ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেবে—এটা হতে পারে না। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করতেই আইনটি করা হয়েছে।”

গত কয়েক বছরে শিক্ষিত সন্তানদের হাতে বাবা-মায়ে নিগৃহীত হওয়ার কথাও তুলে ধরেন চিফ হুইপ।

তিনি বলেন, “বাবা-মা তাদের সম্পদ ভোগ করবেন। বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ যা করেছেন, ট্রেজারি বেঞ্চ মর্মাহত হয়েছে। যাদের সঙ্গে কথা বলেছি সবাই মর্মাহত হয়েছে।

“আপনার বাবাকে, আপনার মাকে আপনি কীভাবে সম্মান করবেন–সেটা আপনি বুঝবেন।”

জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “শরিয়া আইনের বিরোধিতা করছেন, আপনি মুসলিম ল’র বিরোধিতা করেন না কেন?... আপনি কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন কেন। সবই তো মানেন।

“জ্ঞানত আমাদের সকলের মনে হয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বুদ্ধি দিয়ে মনে হয়েছে, এটা করার জন্য।”

বিরোধী দলের সঙ্গে মতপার্থক্য নিয়ে একজন সাংবাদিকের করা এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, “আমাদের মতপার্থক্য হয় নাই। মতপার্থক্য বাড়েও নাই।”

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে নুরুল ইসলাম মনির ভাষ্য, “তিনি একটা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করছেন–“একাত্তর সালের যুদ্ধ, সাতচল্লিশ সাল, তারপর মাঝখানে ভাষা আন্দোলনে গেছে…তারপরে উনি কিন্তু জিয়াউর রহমান সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করেন নাই; 

“তারপরে এরশাদে আসছেন। এরশাদের পর তিনি চব্বিশের গণআন্দোলনে আসছেন, একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।”

চিফ হুইপ বলেন, “আমাদের সম্পর্কে কোনো ঘাটতি হয় নাই। এটা হল এক, আর দুই হল, বরং আমরা আরো ক্লোজ হয়েছি। ক্লোজ হয়েছি কেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপনারা লং মার্চ করলে যদি সমস্যা সমাধান হত, তাইলে তো আমরাই লং মার্চ করতাম।’

“আমরা এটা বলি নাই যে আপনারা লং মার্চ করছেন, এতে বিরাট ক্ষতি হইছে, আপনারা কোনো উসকানি দিচ্ছেন, আপনারা কাউকে ঢুকানোর চেষ্টা করছেন।”

গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেন চিফ হুইপ।