ব্যাংকারদের বেতন কমানোর বিকল্প তো আছে!
বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি সম্প্রতি সকল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বরাবর ব্যাংক কর্মীদের ১৫ শতাংশ বেতন কমানো, ইনক্রিমেন্ট-বোনাস-পদোন্নতি বন্ধ করাসহ ১৩ দফা পরামর্শ জারি করেছে। তিনটি ব্যাংক ইতিমধ্যে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় সব বেসরকারি ব্যাংকই ধারাবাহিক ভাবে মুনাফা অর্জন করে আসছে। প্রভিশন সংরক্ষণ এবং কর দেওয়ার পরেও মালিকপক্ষ বর্তমানে ন্যূনতম ১০ শতাংশ, অতীতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ডিভিডেন্ড পেয়েছেন। এ মুনাফা অর্জনের পেছনে ব্যাংক কর্মীদের প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা মেধা, শ্রম, সততা এবং নিরলস আন্তরিক সেবার প্রয়াসই মুখ্য রাখে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সব খাতের মতই ব্যাংকিং খাতও চাপের মধ্যে পড়েছে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমলেও কোন ব্যাংক কেবল করোনাকালীন ব্যবসা কমার কারণে লোকসানে চলে যাওয়ার মত কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ব্যবসা শুরুর দিনই যেমন কোনও ব্যাংক লাভে থাকে না, আবার ৩ বা ৬ মাসের ক্রান্তিকালও কোনও ব্যাংকের চূড়ান্ত লাভ-ক্ষতি নিরূপণ করতে পারে না। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবশ্যই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ব্যাংকের এক বছরের লাভ-ক্ষতির ওপর কর্মীদের বেতন-ভাতা ওঠানামা কখনো করেনি এবং তা যৌক্তিকও নয়। বিভিন্ন ব্যাংকের বেতন কাঠামোও ভিন্ন, যা ব্যাংকগুলোর বিগত দিনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতি বছর সরকারী হিসেবেই ৬/৭ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এই মূল্যস্ফীতির বিপরীতে ব্যাংকারসহ অন্যান্য চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখে। ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা প্রতিবছর বেতন কমারই নামান্তর। একইভাবে পদন্নোতি বন্ধ রাখলে কর্মীদের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে সেবা এবং কর্মীপ্রতি আয় কমবে এবং সার্বিকভাবে ব্যাংকের লাভের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। শ্রম আইন ২০০৬ এর ২৩১(১) এবং ২৩৩(১)(ছ) অনুযায়ী ব্যাংকের গ্রস প্রফিটের ৫শতাংশ সকল কর্মী সমহারে প্রাপ্য। গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মামলার রায় এ ক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করা যায়। আজ পর্যন্ত কোনও ব্যাংক শ্রম আইনের এ ধারা বাস্তবায়ন করেনি। এর বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতিমালায় প্রফিট বোনাস দিয়ে থাকে। এই বোনাস বন্ধ করলেও যে সব ব্যাংক মুনাফা অর্জন করবে, তাদের মুনাফায় শ্রম আইনের আওতায় কর্মীদের মুনাফার অংশের ন্যায্য প্রাপ্য অস্বীকার করা যাবে না।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষিত হলেও দেশে একদিনের জন্যও ব্যাংকিং সেবা বন্ধ থাকেনি। ব্যাংকাররাও অন্যান্য সম্মুখসারীর পেশাজীবীদের কাতারে চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তথ্যমতে ২৫ জন ব্যাংকার মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০-রও বেশি। এ প্রেক্ষিতে বেতন কমানোর ঘোষণা চরম অমানবিক। তাছাড়া দেশের অন্যতম সুগঠিত পেশা খাতের বেতন কমানোর ফলে অন্যান্য বেসরকারি খাতের কর্মীদের ও বেতন কমানোর প্রবণতাকে উৎসাহিত করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
বিভিন্ন ব্যাংকের চলমান প্রধান কার্যালয় নির্মাণকাজ সম্পর্কে বিএবি নিশ্চয়ই অবগত আছে। সরকার এবং বিএবি ঘোষিত ডিপোজিটের সর্বোচ্চ সূদ হার ৬ শতাংশ এখনো কোনও কোনও ক্ষেত্রে কোনও কোনও ব্যাংক মেনে চলতে পারছে না, সেটিও বিএবির গোচরে থাকার কথা। ব্যাংকিং সেক্টরের বিভিন্ন 'কমন' সমস্যা রয়েছে যা সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে পারলে ব্যাংক খাত এবং মালিকপক্ষ ও লাভবান হবেন। এ প্রেক্ষিতে ব্যাংকারদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বোনাস ইত্যাদি কমানোর আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে যাবার পরিবর্তে বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকের আয় বাড়িয়ে প্রফিটেবিলিটি অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে কতিপয় সুপারিশ করছি যা বাস্তবায়নে সকল ব্যাংকের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন হবে।
১. ট্যাক্স-ভ্যাট সহ ব্যাংক কর্তৃক আদায়কৃত সকল সরকারি আদায়ের উপর কমিশন আদায়: ব্যাংকগুলো প্রতিবছর উৎসে কর, ভ্যাট, এক্সাইজ ডিউটি এবং অন্যান্য সরকারি পাওনা আদায় করে নিজ দায়িত্বে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বিবরণী প্রস্তুত করে সরবরাহ করতে হয়। সরকার কোনও লোকবল, স্টেশনারি বা অন্য কোনও খরচ ছাড়াই ব্যাংকের মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব আদায় করে। ট্রেজারি কার্যক্রমের সরকারি আদায় পদ্ধতিতে কেবল সোনালী ব্যাংক কমিশন পেয়ে থাকে। কোনও সেবাই বিনামূল্যে হতে পারে না। বিএবি অতিসত্ত্বর ব্যাংক কর্তৃক আদায়কৃত সরকারি পাওনার ওপর একটি সার্ভিস চার্জ, শতকরা হারে কমিশন হিসেবে আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি সকল ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রেজারি কার্যক্রমের ব্যবস্থা করেও কমিশন আয় বাড়ানো সম্ভব।
২. সকল ইউটিলিটি বিল এবং সরকারি-বেসরকারি কালেকশনের ওপর কমিশন/চার্জ আদায়: বিদ্যুৎ, ওয়াসা, টেলিফোন ইত্যাদি ইউটিলিটি বিল, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিল, ফি এবং কিস্তি ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা চার্জ বা কমিশনে আদায় হয়। অনলাইন পোস্টিং এর মাধ্যমে গ্রাহকের হিসাবও হালনাগাদ হয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কালেকশন খরচ এবং তথ্য হালনাগাদ করনের খরচও বেচে যাচ্ছে। এতসব সেবার বিপরীতে অবশ্যই ব্যাংকের আয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন যা সকল ব্যাংককে একযোগে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. সরকারি, আধাসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান সমূহের আদায়কৃত অর্থ সমূহ আদায়কারী ব্যাংকে চলতি হিসেবে কমপক্ষে একমাস রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, তাতে ব্যাংকের কস্ট অব ডিপোজিট কমবে। বিভিন্ন ব্যাংক প্রতিযোগিতা করে ইতিপূর্বে বিভিন্ন প্রকার কালেকশন হিসাবে দিনভিত্তিক বা মাসভিত্তিক সুদ দেওয়ার ব্যবস্থা রহিত করে সকল কালেকশন অ্যাকাউন্টকে চলতি হিসাবে রূপান্তরিত করতে হবে ।
৪. অনলাইন, নেট ব্যাংকিং ইত্যাদি প্রযুক্তিগত সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা স্থানান্তর অত্যন্ত সহজসাধ্য এবং নিরাপদ হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে এ টাকা স্থানান্তরের খরচ প্রায় শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কোন সেবাই বিনামূল্যে হতে পারে না। তাই সকল ব্যাংক মিলে সমহারে অনলাইন চার্জ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
৫. একইভাবে ব্যাচ এর মাধ্যমে ক্লিয়ারিং, বিএফটিএন, আরটিজিএস ইত্যাদি সেবাও নামমাত্র মূল্যে দেওয়া হচ্ছে এবং ব্যাচ ক্লিয়ারিং চার্জের সিংহভাগই আবার বাংলাদেশ ব্যাংক পেয়ে থাকে। এ সব সেবামূল্য যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন।
সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং বিএবি এর যৌথ চিন্তাপ্রসূত আরও বিভিন্ন যৌক্তিক আয়বর্ধক কর্মসূচি নিয়ে এবং প্রতিযোগিতার কারণে ছাড় না দিয়ে সব ব্যাংক একযোগে বাস্তবায়ন করে ব্যাংক খাতের আয়প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সবার কাছে আহ্বান জানাচ্ছি। ব্যাংকারদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা কর্তনের যেকোনও প্রয়াস অবশ্যই শুভ ফল দেবে না।
