সহ্যসীমার পরীক্ষা নেওয়া ঘটনাবলি ও আবরার হত্যাকাণ্ড
Look up here, I'm in heaven
I've got scars that can't be seen
I've got drama, can't be stolen
Everybody knows me now
ডেভিড বোয়িইর এই গান শেলের মতো বিঁধছে বাংলার বুকে। না মেলানো গাণিতিক সূত্র (আবরারকে যখন ডেকে নিয়ে যায় তখন সে অংক করছিল) আর শেষ না হওয়া চিপসের প্যাকেট রেখে আবরার এখন অন্য কোথাও।আহা, ছেলেটা কেবল ভিন্নমত প্রকাশ করেছিল, তাও দেশকে মা মেনে। মায়ের আপূরণীয় দাবি তো সন্তানেরাই মেটাবে। আবরার জীবন দিয়ে মেটাল সে দাবি।
সম্প্রতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও কয়েকজনের জীবন ঝরেছে ছাত্র রাজনীতির বলি হয়ে। আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের রেষারেষিতে প্রাণ গিয়েছিল আবু বকরের। তাকে বাধ্য করা হয়েছিল অসুস্থ শরীরে রাতে হল পাহারা দিতে, যেন হলগুলো সব রেজিমেন্ট আর ছাত্ররা সব পদাতিক সৈন্য! সাধারণ ছাত্রদের এমন পদাবনত পরাধীন জীবন যেন সাধারণ ঘটনা এবং এর প্রতিকারহীন।
ক্যাম্পাসে এমন হত্যালীলা আগেও ঘটেছে কোনটারই দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি হয়নি। বিচারহীনতার ধারা অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলেছে। আজকে সাধারণভাবে ও আইনের চোখে অপরাধী বলে গ্রেপ্তার হয়েছে যারা, ২/৩ বছর আগেই ভালো রেজাল্ট করে বুয়েটে তুমুল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভর্তি হয়েছিল তারাই। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির আফিম এদের একেক জনকে দানবে পরিণত করেছে। এই সব ছাত্রদের দোষী ভাবার আগে কি ব্যবস্থার কারণে এমন পৈশাচিক পরিবর্তন হলো সেটা ভেবে দেখার সময় এখনই।
ক্যাম্পাসের উন্নয়ন কাজ থেকে টেন্ডারে চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, ছাত্রী হয়রানি, প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি না মেনে হলের সিট দখল করে রাখা, শিক্ষকদের ওপর চড়াও হওয়া ইত্যাদি থেকে শুরু করে যাবতীয় নেতিবাচক কাজের জন্য দায়ী করা হয় ছাত্রলীগকে। অনৈতিক কাজের অপরাধে কিছুদিন আগেই সভাপতি সাধারণ সম্পাদককে অপসারণ করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলনে ছাত্রলীগকে পাওয়া না গেলেও ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলনে হামলা চালিয়ে প্রশাসনের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করে সংগঠনটির কর্মীরা। কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের মতো আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হেনস্তার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে ছাত্র রাজনীতি তো বটেই, জাতীয় রাজনীতি সহ সমাজ ও রাষ্ট্রকেও চরম মূল্য দিতে হবে। আর কত বড় বিপর্যয় ঘটলে আমাদের নীতি নির্ধারকদের মনে হবে, যথেষ্ঠ হয়েছে।
আবরারের হত্যাকাণ্ড কয়েকটি বিষয়কে সামনে এনেছে তাদের অন্যতম ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রহীন ছাত্র রাজনীতি, মারা যাওয়ার দুদিন পরেও বুয়েটের উপাচার্যের অসহনীয় নিরবতা এবং মৃত্যুর পর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করেন। ফেইসবুকে আবরার লিখেছিলেন, 'দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্র বন্দর না থাকায় তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের অনুরোধ করেছিল। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। আর এখন ভারতকে সেই মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য বলতে হচ্ছে।' ভারতের দুই রাজ্যের মধ্যকার পানি নিয়ে বিরোধের কথা উল্লেখ করে আবরার লিখেছিলেন, 'যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না, সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়াই পানি দেব।' গ্যাস চুক্তিরও সমালোচনাও ছিল সে পোস্টে । এ সামান্য বিরুদ্ধ মতটাই সহ্য হয়নি হত্যকারীদের। হত্যার কারণ ভিন্নমত- প্রাথমিকভাবে এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
এপ্রিল ২০১৭-তে একটি ফেইসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সমালোচনা করা হয়। এই পোস্টে 'লাইক' দেয়ার জন্য তার দলের একজন সমর্থক শ্রীমঙ্গলের রাবার বাগানের শ্রমিক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই সমর্থক তার 'অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে এবং তিনি সংক্ষুব্ধ' বলে অভিযোগ করলে পুলিশ মনিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। সূত্র : https://www.hrw.org/bn/news/2018/05/09/317681
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর মতো সংগঠনগুলো কিছুদিন পর পরই 'ভিন্নমত প্রকাশকারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার পাশাপাশি বাক স্বাধীনতা খর্ব করতে নিপীড়ণ চালানো হচ্ছে' দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যথারীতি সরকার এর প্রতিবাদ করে, কিন্তু পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয় না।
'ভয় আর দমন-পীড়নের ফাঁদে বাংলাদেশে স্বাধীন মত প্রকাশকারীরা' অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর এই প্রতিবেদনের বলা হচ্ছে, "জঙ্গিদের হামলা আর হুমকির ভয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে বাংলাদেশে।" অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর এই প্রতিবেদন ছিল হামলা ও হুমকির মুখে পড়া ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিকদের সুরক্ষা বিষয়ে। মুক্তমত প্রকাশকারীরা ছিল কথিত ইসলামিক র্যাডিকেল গোষ্ঠির চিন্তা শত্রু। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের কোন কাজের সমালোচনাকারীকে আওয়ামী লীগের শত্রু বা কখনো দেশদ্রোহী বিবেচনায় নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-ই সরকারের ভুল ধরিয়ে দিতে গঠনমূলক সমালোচনার কথা মনে করিয়ে দেন।
নাগরিকের উপর খবরদারি-নজরদারির অভ্যাসটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রের মজ্জাগত। এই সময়ে নাগরিক জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার উপস্থিতি প্রায় অনিবার্যতা অর্জন করেছে। এই পরিসরটি এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক মত প্রকাশের বিকল্প মঞ্চ।
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাজ কেবল প্রেসনোট পাঠ করে সরকারের কাজগুলির সমালোচনা করার মধ্যে আবদ্ধ নয়। সরকারের স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠার প্রবণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সরকারি বিভিন্ন ভুল নীতির যথাযথ ব্যাখ্যাসহ জনগণের সামনে এনে বিক্ষোভ, প্রতিবাদের মাধ্যমে প্রতিবাদ জারি রাখা। কিন্তু আমাদের বিরোধীদলগুলো করছে কই? আর এই বাস্তবতায় সচেতন নাগরিক ও জনসমাজ পত্রিকায় লিখে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ করে নিজ নিজ অবস্থান জানিয়ে আসছে। কিন্তু বিরুদ্ধ মত, ভিন্ন বিশ্বাসকে কদর্য ভাষায় আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণ হয় অবাধে। কখনো তা নিধনের রূপও পায়।
পিংক ফ্লয়েড লন্ডনে গড়ে উঠা প্রগ্রেসিভ এবং সাইকেডেলিক সঙ্গীতের রক ব্যান্ড। দর্শন ছুঁয়ে যাওয়া কথা, চিন্তা উদ্রেককারী বাণী, শব্দের ও সুরের নিরীক্ষণ, আর কম্পোজিশন এর জন্য তাদের রক সঙ্গীতের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত করে। তাদের লাইভ শো গুলো ছিল একেবারে ভিন্ন মাত্রার। মূল গান শুরুর বিভিন্ন সাউন্ড ইফেক্টের সাথে সমন্বিত সুরের মিউজিক পিস বাজাতো এতে সমুদ্রের গর্জন পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ইত্যাদির মাধ্যমে সাইকেডেলিক ধরণার সাথে অভ্যস্ত করানোর ব্যবস্থা করতো।
আমরাও এখন দেশে চুড়িহাট্টার গনগনে আগুনে পুড়ে যাওয়া আহতের আর্ত চিৎকারের ভিতর, কোটা বিরোধী আন্দোলনের গগন বিদারী স্লোগান আর সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের পেটোয়া বাহিনীর হাতুড়ির আঘাতের বিক্ষত হতে থাকা সাধারণ ছাত্রের কুঁকড়ে যাওয়া (সর্বশেষ যোগ হলো বুয়েটের আবরারের নির্মম মৃত্যুর সাথে), দেশবাসীর গুমরে গুমরে কান্নার শব্দের মিশেলে এক সাইকেডেলিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি। আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে এই সব দুর্বিষহ অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা যাচ্ছি… যেতে হবে মুক্তির আগ পর্যন্ত। এসবই আমাদের চোখ কান বুজে সয়ে যাওয়ার ফলাফল। আমাদের সহ্যের সীমার পরীক্ষা নেয়া একেকটি ঘটনা।
ছবি: শেহাজ সিন্ধু
