শক্তিশালী মশা মারার জন্য চাই শক্তিশালী মেয়র
ডেঙ্গুজ্বর এক আতংকের নাম! শহর জুড়ে এই জ্বরের প্রকোপ যেন প্রতিদিন বেড়েই চলছে। মহামারী আকারে পৌঁছেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে যে পৌঁছেছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। যদিও সিটি কর্পোরেশনের বলছে, সারা দেশে এবছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। যাদের মধ্যে দুই জন মারা গেছেন। ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে এক হাজার ৮৭৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩০০ জন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুলাই মাসের প্রথম ১০ দিনেই রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৩৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী। তবে সরকারি হিসাবে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে আসা রোগীর তথ্য কতটুকু আছে তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন!
আইইডিসিআর-এর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যে দেখা যায়, গেল পাঁচ বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩ জন। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারী হাসপাতালে রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাক্তার নিগার সুলতানা। বাকি দুজন মারা যান এপ্রিলে।
মৃত্যুঝুঁকি আছে বলেই সকলের মাঝে এই ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে এক আতঙ্ক বিরাজ করছে। মূলত, ভাইরাস বাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামের মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়। ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের, কিন্তু চারটি ভাইরাসের প্রতিরোধে কাজ করে, এমন ভ্যাক্সিন এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।তাই ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূলমন্ত্রই হলো এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা।
তবে এত কিছুর মধ্যেও বেশ নির্ভার আছেন আমাদের মেয়র মহোদয়রা। তারা কিন্তু জনগণকে আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেছেন। তাদের এই মহামূল্যবান উপদেশ বাণী শুনে মনে পরে সেই প্রবাদ বাক্য- "রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল"। যখন মাত্র ১০ দিনে এক হাজার ৮৪জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি, আরও কত রোগী বাসায় এই রোগের কারণে কাতরাচ্ছে তার হিসেব নেই- সেই সময় আমাদের মেয়র মহোদয়দের এমন অমৃতসম উপদেশ বাণী মানুষের মনে সেই প্রবাদ বাক্য মনে করিয়ে দেয়া ছাড়া কি-ই-বা করতে পারে?
মেয়র মহোদয়রা কিন্তু এই উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি তারা শুনিয়েছেন আরও এক যুগান্তকারী বাণী তা হল- মশার ওষুধ কার্যকর নয়। তারা আরও বলেছেন নতুন ওষুধ না আসা পর্যন্ত বর্তমান ওষুধই নগরে মশা নিধনে ব্যবহার করা হবে। এমন শ্রুতিমধুর বাণী শোনার পর শুধু বলতে ইচ্ছা হয়, "হে ধরণী দ্বিধা হও, আমি তন্মধ্যে প্রবেশ করি"! বলা ছাড়া নাগরিক হিসেবে আমাদের কি ই বা বলার আছে? নাগরিকরা কর দিবে সেই করের টাকায় নাগরিকদের জন্য অকার্যকর ওষুধ কিনবেন আমাদের মেয়র মহোদয়রা। জাতি হিসেবে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কি হতে পারে? জনগণের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কে দিয়েছে তাদের? বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে মেয়র মহোদয়রা জানতেন না এই অকার্যকারিতার কথা । বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা ১৪ মাস আগে বলেছিলেন, মশার ওষুধ কার্যকারিতা হারিয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ছিটানো ওষুধে মশা মরছে না। সব জেনেও কর্তৃপক্ষ মশা মারার ওষুধ পরিবর্তনে পদক্ষেপ নেয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ওষুধ অকার্যকর হওয়ার কথা সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিকল্প ওষুধের সুপারিশ করেনি। তাই আগের ওষুধই ব্যবহার করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ যদি এখনই ওষুধ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে নতুন ওষুধ ব্যবহার করতে অন্তত ছয় মাস লাগবে।
আচ্ছা এই ছয় মাসে যদি কারো ডেঙ্গুর কারণে প্রাণহানি ঘটে তার দায় কিভাবে এড়িয়ে যাবে আমাদের সিটি কর্পোরেশন? এই ছয় মাস কি সিটি কর্পোরেশন নাগরিকদের কাছ থেকে কর আদায় করবে না? যদি কর আদায় করে থাকে তাহলে একজন নাগরিক কেন অকার্যকর ওষুধ কেনার জন্য সিটি কর্পোরেশনকে কর দিবে?
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবসহ মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দুই সপ্তাহের মধ্যে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। শুনানিতে আদালত বলেছেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গেছে। শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এটা তো মহামারি আকার ধারণ করছে! আপনারা (সিটি করপোরেশন) কী ওষুধ দিচ্ছেন তাতে তো নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।
এমনকি সম্প্রতি এডিস মশা নিধনে ব্যর্থ হওয়ায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবী।
উপরোক্ত ঘটনাবলীর পর আমাদের মেয়র মহোদয়দের কতটুকু বোধোদয় ঘটবে তার উত্তর একমাত্র আমাদের মেয়র মহোদয়রাই দিতে পারবেন। তবে এই ডেঙ্গু মোকাবেলায় মেয়রদের দিকে না তাকিয়ে আমাদেরকেই তৎপর হতে হবে। কারণ আমরা দেখছি তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধের চেয়ে রিকশাওয়ালাদের চায়ের দাওয়াত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তাই অপব্যবহৃত গাড়ির টায়ার, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত চৌবাচ্চা, পরিত্যক্ত টিনের কৌটায় যাতে পানি জমে না থাকে, নগরবাসীকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ বেখেয়ালে এ সব পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। নগরবাসী যদি নিজ বাড়ি ও বাসার সামনে এ ধরনের পাত্রে পানি জমতে না দেয় তবে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ হবে।
সর্বোপরি মেয়রদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের দৃষ্টিতে এই তথাকথিত "শক্তিশালী" মশার বিরুদ্ধে তারা কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে শক্তিশালী মেয়র হতে পারবেন কিনা? তা না হলে জনগণকে এই শক্তিশালী মশার বিরুদ্ধে এক জন শক্তিশালী মেয়রের সন্ধানে বের হতে হবে। মনে রাখতে হবে জনগনের করের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই ।
